
শীতের ভোর। কুয়াশা কেটে সূর্যের মিষ্টি রোদের আভাটা সবে শরীরে লাগতে শুরু করেছে। ধোঁয়া উঠতে শুরু করেছে গ্রামীণ মাটির চুলায়। তা ঘিরে বসে পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা। বলছিলাম নোয়াখালির সূবর্ণচরের চরবাটা গ্রামের কথা। এখানে শীতের সকালগুলো এমনই। আধুনিকতার ছোয়া লাগলেও শীতের সময় গ্রামীণ আবহটা বেশ ভালো টের পাওয়া যায় এখানে। বাড়ির মুরুব্বি থেকে শিশুরা সবাই একসাথ হয়ে ধোয়া উঠা চুলার পাশে বসে অপক্ষায় থাকে গরম চিতই পিঠার জন্য। অবশ্য যে আধুনিকতার কথা বলছিলাম সেই আধুনিকতায় যৌথ পরিবারের এমন দৃশ্যগুলো এখন খুব একটা দেখা যায় না। জীবন, জীবিকার টানে পরিবারগুলো খণ্ড খণ্ড। কখনও দেখা হয় কখনও দেখা হয় না। পাশের বাড়ির আত্মীয়র খোঁজটাও এখন আর নেওয়া হয় না ব্যস্ত জীবনে।
সেই ব্যস্ত জীবনের পাশ কাটিয়ে দারুণ এক উদাহরণ এই গ্রামেই মিলেছে। এই গ্রামেরই হাজী নজির আহম্মদের বংশধররা ধরে রেখেছে দারুণ এক সংস্কৃতি। বিচ্ছিন্নতার এই যুগে এটিকে আপনি দারণ এক পারিবারিক মেলবন্ধন বলতে পারেন। বছরের একটা দিন ঘটা করে আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই বংশের সবাই একত্রিত হন একই স্থানে।
দূর দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন শত কর্ম ব্যস্ত মানুষটাও। প্রিয়জনদের সাথে খোশ গল্প আড্ডায় কাটিয়ে দেন একটা দিন। হয় নানান স্মৃতি রোমন্থন। সেখানে বার বারই ফিরে আসে ফেলা আসা সেসব ঐতিহ্যের কথা। শিশু কিশোররা নানানভাবে জানতে পারে তাদের শিকড়ের কথা। পরিচিত হয় নিজেদের চাচাতো, খালাতো কিংবা ফুফাতো ভাই-বোনদের সাথে। এমন আয়োজনেই গিয়েছিলাম। সচোখে দেখা মিলেছে খুব কাছের আত্মীয়দের এখানে এসে নতুন করে পরিচিত হতে। পুরনো স্মৃতি রোমন্থনে চোখের কোনে পানি জমতে।

আয়োজনের সকালটা শুরু হয় শীতের পিঠা-পুলির মধ্য দিয়ে। এরপর চলে পরিচয় পর্ব। বংশের নতুন সদস্যদের একে একে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয় স্টেজে আমন্ত্রণ জানিয়ে। থাকে মজার সব খেলা। নারীদের জন্য যেমন থাকে মিউজিক্যাল চেয়ার খেলা কিংব বালিশ খেলা, পুরুষদের জন্য থাকে হাড়ি ভাঙ্গার মত মজার খেলা। শিশুদের জন্য থাকে বিস্কিট খেলা। দিনশেষে থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ ছাড়াও বংশ পরিক্রমার ইতিহাস জানতে ছাপানো হয় বই। যেখানে বংশ পরিচয়ের সাথে কে কোথায় আছেন সেটিও দেওয়া থাকে বিস্তরভাবে।
বিচ্চিন্নতার এই যুগে প্রায় তিন থেকে চারশো মানুষ যখন একসাথে হয়, সেটিকে দারুণ কিছু না বলে উপায় কি। নোয়াখালির সূবর্ণচরের চরবাটা গ্রামের এমন আয়োজন উদাহরণ হতে পারে বাংলাদেশের অন্য সব পরিবারের জন্য। এখান থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে পরের বছর অন্তত আরও দুটি পরিবার নিজেদের শেকড়ের জানান দিতে একসাথে হবে বছরের অনন্ত একটা দিনে, এমনটাই প্রত্যাশা।




