দ্বিতীয় বিয়ের আগে ইসলামের ৭ শর্ত

ধর্ম ডেস্ক

বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬ , ১২:০৭ এএম


দ্বিতীয় বিয়ের আগে ইসলামের ৭ শর্ত
ছবি প্রতীকী

বিবাহ একটি পবিত্র ইবাদত, দায়িত্ব এবং আমানত। তাই ইসলামি শরিয়তে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে একজন মুসলিম পুরুষকে একই সময়ে সর্বোচ্চ চারজন স্ত্রী পর্যন্ত রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এই অনুমতি শর্তহীন নয়। পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ একাধিক বিয়ের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, দায়িত্ববোধ এবং প্রত্যেক স্ত্রীর অধিকার যথাযথভাবে আদায়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। অতএব দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রত্যেক মুসলিমের উচিত কুরআন-সুন্নাহর আলোকে নিজের সক্ষমতা ও দায়িত্ব সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করা।

১. আর্থিক ও দাম্পত্য সক্ষমতা থাকতে হবে

দ্বিতীয় বিয়ের আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আর্থিক ও শারীরিক সক্ষমতা। প্রত্যেক স্ত্রীর ভরণপোষণ, বাসস্থান, চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ব্যয়ভার বহন করা স্বামীর দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা বলেন—

الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنْفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ

‘পুরুষরা নারীদের অভিভাবক, কারণ আল্লাহ তাদের একদলকে অন্যদলের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন এবং তারা নিজেদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ৩৪)

আরও পড়ুন

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ

‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (বুখারি ৮৯৩, মুসলিম ১৮২৯)

২. স্ত্রীদের মধ্যে ন্যায়বিচার করা অপরিহার্য

একাধিক বিয়ের সবচেয়ে বড় শর্ত হলো ন্যায়বিচার। সময় বণ্টন, ভরণপোষণ, বাসস্থান এবং বাহ্যিক আচরণে কোনো স্ত্রীর প্রতি অবিচার করা বৈধ নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

مَنْ كَانَتْ لَهُ امْرَأَتَانِ فَمَالَ إِلَىٰ إِحْدَاهُمَا جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَشِقُّهُ مَائِلٌ

‘যার দুইজন স্ত্রী রয়েছে, কিন্তু সে একজনের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়ে, কিয়ামতের দিন সে শরীরের এক পাশ হেলে পড়া অবস্থায় উপস্থিত হবে।’ (আবু দাউদ ২১৩৩, তিরমিজি ১১৪১)

৩. ন্যায়বিচারের আশঙ্কা থাকলে এক স্ত্রীই যথেষ্ট

যদি কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয় বিয়ে করলে উভয় স্ত্রীর প্রতি ন্যায়বিচার করার সক্ষমতা না রাখে তবে তার জন্য এক স্ত্রীই যথেষ্ট। আল্লাহ তাআলা বলেন—

فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً

‘যদি আশঙ্কা কর যে তোমরা ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একজন স্ত্রীতেই সীমাবদ্ধ থাক।’ (সুরা আন-নিসা আয়াত ৩)

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন—

وَلَنْ تَسْتَطِيعُوا أَنْ تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ

‘তোমরা যতই চেষ্টা কর না কেন, স্ত্রীদের প্রতি অন্তরের ভালোবাসায় পুরোপুরি সমতা আনতে কখনো সক্ষম হবে না।’ (সুরা আন-নিসা: আয়াত ১২৯)

তাফসিরবিদদের মতে, এখানে হৃদয়ের ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে। তবে ভরণপোষণ, সময় ও অধিকার বণ্টনে সমতা বজায় রাখা অবশ্যই ফরজ।

আরও পড়ুন

৪. প্রত্যেক স্ত্রীর স্বতন্ত্র বাসস্থানের অধিকার রয়েছে

ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী, স্ত্রীরা যদি স্বেচ্ছায় একসঙ্গে থাকতে রাজি না হন, তাহলে প্রত্যেকের জন্য আলাদা ও নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা স্বামীর দায়িত্ব। এতে তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সম্মান ও পারিবারিক অধিকার নিশ্চিত হয়।

৫. প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে সততা ও উত্তম আচরণ

দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি শরিয়তের শর্ত নয়। তবে প্রতারণা, গোপনীয়তা বা অযথা কষ্ট দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ইসলামের নৈতিকতার পরিপন্থী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي

‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।’ (তিরমিজি ৩৮৯৫, ইবন মাজাহ ১৯৭৭)

৬. দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতির সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে

ইসলামে একাধিক বিয়ের অনুমতি ব্যক্তিগত ভোগবিলাসের জন্য নয়; বরং সামাজিক ও মানবিক প্রয়োজন, ন্যায়বিচার এবং দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই দ্বিতীয় বিয়ের সিদ্ধান্ত আবেগ বা প্রবৃত্তির বশে নয়, বরং আল্লাহর ভয়, ন্যায়বোধ এবং আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নেওয়া উচিত।

৭. রাষ্ট্রীয় আইন মেনে চলাও দায়িত্ব

ইসলামী শরিয়তের পাশাপাশি একজন নাগরিক হিসেবে দেশের আইন মানাও দায়িত্বের অংশ। বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সালিশি কাউন্সিলের অনুমতি গ্রহণসহ নির্ধারিত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। শরিয়তের বিধান পালনের পাশাপাশি প্রচলিত আইন মেনে চলাও একজন দায়িত্বশীল মুসলিমের কর্তব্য।

ইসলাম একাধিক বিয়ের অনুমতি দিয়েছে, কিন্তু তা কখনোই শর্তহীন নয়। আর্থিক সামর্থ্য, ন্যায়বিচার, দায়িত্ববোধ, পারিবারিক অধিকার রক্ষা এবং আল্লাহভীতি— এসব শর্ত পূরণ না হলে দ্বিতীয় বিয়ে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের জন্য কল্যাণের পরিবর্তে সংকটের কারণ হতে পারে। তাই একজন মুমিনের উচিত একাধিক বিয়েকে শুধু নিজের অধিকার হিসেবে না দেখে, বরং একটি বড় আমানত ও জবাবদিহির বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা। 

আরটিভি/এমএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission