ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৭ আশ্বিন ১৪৩৩

ইয়েমেনের সুফি সাধক থেকে অটোমান দরবার, যেভাবে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল কফি

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

প্রতিদিন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের সকাল শুরু হয় কফির গাঢ় সুবাসে। কর্মব্যস্ত জীবনে এক কাপ কফি যেমন এনে দেয় সতেজতা, তেমনি আধুনিক নগরজীবনের সামাজিকতা ও আড্ডারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে পানীয়টি। তবে কফির এই জনপ্রিয়তার ইতিহাস ইউরোপের ক্যাফে থেকে নয় এর শিকড় ছড়িয়ে আছে ইয়েমেনের সুফি সাধনা, ইসলামী জ্ঞানচর্চা এবং অটোমান সাম্রাজ্যের সামাজিক সংস্কৃতিতে।

কফির ইতিহাস নিয়ে প্রচলিত এক কাহিনিতে ইথিওপিয়ার ছাগলপালক কালদির কথা বলা হয়। বলা হয়, বুনো লাল ফল খাওয়ার পর তার ছাগলগুলো অস্বাভাবিকভাবে চঞ্চল হয়ে ওঠে। তবে কফির বীজকে ভেজে গরম পানীয় তৈরির প্রচলন গড়ে ওঠে লোহিত সাগরের ওপারে ইয়েমেনের উচ্চভূমিতে।

পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইয়েমেনের জাবিদসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক শহর ও মোক্কার আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় সুফি সাধকেরা কফির বীজ ভেজে ও ফুটিয়ে পান করতে শুরু করেন। দীর্ঘ সময় রাত জেগে ইবাদত, জিকির ও কোরআন তিলাওয়াতের সময় সজাগ থাকতে কফি তাদের কাছে সহায়ক পানীয় হয়ে ওঠে।

সুফি সাধকদের কাছে কাহওয়া নামে পরিচিত এই পানীয় বিশেষ করে তাহাজ্জুদ ও ফজরের আগের আধ্যাত্মিক সাধনায় ব্যবহৃত হতো। ইবাদতের আগে বা মাঝে তারা একসঙ্গে বসে কফি পান করতেন। কফির বীজের প্রচলনের আগে ইয়েমেনে কফি ফলের শুকনো খোসা দিয়ে ‘কিশর’ নামে এক ধরনের পানীয় তৈরির চল ছিল। এতে আদা ও দারুচিনি মেশানো হতো।

ধীরে ধীরে কফির জনপ্রিয়তা আরব উপদ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ইয়েমেনের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের আল-মোক্কা বন্দর কফি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। আধুনিক ‘মোচা’ শব্দটির উৎপত্তিও এই বন্দরনগরীর নাম থেকে।

দীর্ঘ সময় ইয়েমেন কফি বাণিজ্যে প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। মূল্যবান ফসলটির গুরুত্ব বিবেচনায় জীবন্ত কফি গাছ বা অঙ্কুরোদ্গমে সক্ষম বীজ বিদেশে নেওয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। কফি বিন বিদেশে পাঠানোর আগে সেগুলো সেদ্ধ, ঝলসে বা পুড়িয়ে দেওয়া হতো, যাতে অন্যত্র সহজে নতুন গাছ জন্মাতে না পারে।

বাণিজ্যপথ ও হজযাত্রার মাধ্যমে কফি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মক্কা-মদিনাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে। ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে পানীয়টি পৌঁছে যায় কায়রোতেও। আল-আজহারকে ঘিরে থাকা শিক্ষার্থীদের আবাসিক এলাকায় কফি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ইয়েমেনি শিক্ষার্থীরা রাত জেগে ইসলামী আইন ও কোরআন অধ্যয়নের সময় কাহওয়া পান করতেন।

তবে কফির জনপ্রিয়তার সঙ্গে বিতর্কও শুরু হয়। কফি শরীরের জন্য ক্ষতিকর কি না এবং ধর্মীয়ভাবে এটি বৈধ কি না এ নিয়ে আলেম ও ফকিহদের মধ্যে আলোচনা হয়। পরবর্তী সময়ে ধর্মীয় ও চিকিৎসাবিষয়ক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে কফি মুসলিম সমাজে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।

ষোড়শ শতাব্দীতে অটোমান সাম্রাজ্যের প্রভাব আরব ভূখণ্ডে বিস্তৃত হলে কফি পৌঁছে যায় ইস্তাম্বুলের রাজদরবারে। সুলতান সুলেমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের সময় কফি প্রস্তুত করা এক ধরনের আনুষ্ঠানিক শিল্পে পরিণত হয়। দক্ষ কফি প্রস্তুতকারীরা কফি বিন ভেজে গুঁড়া করে তামার লম্বা হাতলযুক্ত পাত্র ‘সেজভে’তে ফুটিয়ে পরিবেশন করতেন।

তবে কফির ইতিহাসে অটোমানদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল ‘কাহভেহানে’ বা গণকফিঘরের বিকাশ। এসব জায়গা শুধু কফি পান করার স্থান ছিল না বরং হয়ে ওঠে সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগাযোগের কেন্দ্র। সেখানে দাবা খেলা, কবিতা আবৃত্তি, দর্শন ও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা চলত। সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একই জায়গায় মিলিত হওয়ার সুযোগ পেতেন।

পরবর্তীতে অটোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের সূত্রে ভেনিসের ব্যবসায়ীরা কফির সঙ্গে পরিচিত হন। সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে ভাজা কফি বিন ইতালিতে আমদানি শুরু হয়। ভেনিস থেকে দ্রুত ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ে কফি ও কফিঘরের সংস্কৃতি।

১৬৫২ সালে গ্রিক ও অটোমান বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী পাসকোয়া রোজি লন্ডনে একটি কফিঘর চালু করেন। এরপর প্যারিস, ভিয়েনা ও আমস্টারডামেও কফিঘর গড়ে ওঠে।

ইউরোপে এসব কফিঘরও ধীরে ধীরে সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। লন্ডনে মাত্র এক পেনিতে এক কাপ কফি কিনে দীর্ঘ সময় আলোচনা করার সুযোগ থাকায় এসব স্থান ‘পেনি ইউনিভার্সিটি’ নামেও পরিচিতি পায়। বাণিজ্য, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও রাজনৈতিক চিন্তাচর্চার বিকাশেও ইউরোপের কফিঘরগুলোর ভূমিকার কথা ইতিহাসে উল্লেখ করা হয়।

সুফি সাধকদের রাতের ইবাদত থেকে অটোমান দরবার, সেখান থেকে ইউরোপের কফিঘর দীর্ঘ এই যাত্রায় কফি শুধু একটি পানীয় হিসেবে নয়, বরং সামাজিকতা, জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতিরও অংশ হয়ে উঠেছে।

সূত্র : হালাল ট্রিপ

আরটিভি/এসকে

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
আজকের নামাজের সময়সূচি
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ-
আজকের নামাজের সময়সূচি
পড়তে-লিখতে না জেনেও ৭১ বছর বয়সে হাফেজা হলেন মিশরীয় নারী
পড়তে বা লিখতে জানেন না। তবে ছোটবেলা থেকেই রেডিওতে কোরআন তিলাওয়াত শুনে পবিত্র কোরআনের প্রতি তৈরি হয়েছিল গভীর ভালোবাসা। সেই ভালোবাসা থেকেই শুরু করেছিলেন কোরআন মুখস্থ করার চেষ্টা।
পড়তে-লিখতে না জেনেও ৭১ বছর বয়সে হাফেজা হলেন মিশরীয় নারী
মসজিদুল হারামের মুয়াজ্জিন শায়খ ইবরাহিম আল-মাদানির মৃত্যু 
পবিত্র মসজিদুল হারামের সুপরিচিত মুয়াজ্জিন শায়খ ইবরাহিম বিন আদেল আল-মাদানি আর নেই। 
মসজিদুল হারামের মুয়াজ্জিন শায়খ ইবরাহিম আল-মাদানির মৃত্যু 
আজকের নামাজের সময়সূচি
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ঢাকা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার নামাজের সময়সূচি নিম্নরূপ-
আজকের নামাজের সময়সূচি
শিশুর জানাজায় যে দোয়া পড়বেন
মৃত্যু সবার জন্যই অবশ্যম্ভাবী। তবে কোনো অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু মারা গেলে তার জানাজার নামাজের দোয়া প্রাপ্তবয়স্ক মৃত ব্যক্তির জানাজার দোয়া থেকে আলাদা।
শিশুর জানাজায় যে দোয়া পড়বেন
আরও পড়ুন
গরম গরম চা-কফি পান করছেন? ভয়ংকর ঝুঁকির কথা জানাল গবেষণা
কফিতে দুধ মিশিয়ে খেলে শরীরে যে পরিবর্তন ঘটে
কফি ছেড়ে এক বিশেষ পানীয় খাচ্ছেন সোহা, কী আছে এতে?
বাবা আসবে ভেবেছিল ৩ মেয়ে, ফিরলেন কফিনে