
মসজিদ আল্লাহর ইবাদত, নামাজ, জিকির ও কোরআন তিলাওয়াতের পবিত্র স্থান। তাই অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে—মসজিদে দুনিয়াবি কথা বলা কি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ? বেশি কথা বললে কি নেক আমল নষ্ট হয়ে যায়? এ বিষয়ে প্রচলিত কিছু কথাকে হাদিস মনে করা হলেও নির্ভরযোগ্য সূত্রে সেগুলোর প্রমাণ পাওয়া যায় না।
রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন—
إِنَّمَا هِيَ لِذِكْرِ اللَّهِ وَالصَّلَاةِ وَقِرَاءَةِ الْقُرْآنِ
অর্থ: মসজিদ আল্লাহর জিকির, নামাজ ও কোরআন তিলাওয়াতের জন্য।
—সহিহ মুসলিম
তাই মসজিদকে দুনিয়াবি কাজকর্ম, হৈচৈ বা অপ্রয়োজনীয় আড্ডার স্থান বানানো ঠিক নয়। হাদিসে মসজিদে কেনাবেচা, হারানো জিনিসের ঘোষণা এবং এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে, যা মসজিদের মর্যাদা নষ্ট করে।
তবে মসজিদে সব ধরনের বৈধ কথাবার্তা সম্পূর্ণ হারাম—এমন কোনো সহিহ হাদিস নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে সাহাবিরা মসজিদে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতেন, জাহেলি যুগের ঘটনা আলোচনা করতেন, কবিতা পাঠ করতেন এবং কখনো হাসতেনও।
জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) ফজরের নামাজের পর সূর্য ওঠা পর্যন্ত নিজের নামাজের স্থানে বসে থাকতেন। এ সময় সাহাবিরা বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতেন, জাহেলি যুগের ঘটনা আলোচনা করতেন এবং কবিতা পাঠ করতেন। তাঁরা হাসলে রাসুলুল্লাহ (সা.) মুচকি হাসতেন।
—সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৭০
তবে শর্ত হলো, কথাবার্তা যেন উচ্চস্বরে না হয় এবং অন্য মুসল্লির নামাজ, জিকির বা কোরআন তিলাওয়াতে ব্যাঘাত না ঘটে।
এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
أَلَا إِنَّ كُلَّكُمْ مُنَاجٍ رَبَّهُ، فَلَا يُؤْذِيَنَّ بَعْضُكُمْ بَعْضًا
অর্থ: তোমাদের প্রত্যেকেই তার রবের সঙ্গে কথা বলছে। তাই তোমরা কেউ যেন কাউকে কষ্ট না দাও এবং একে ওপরের চেয়ে উঁচু আওয়াজ না করো।
—সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৩৩২
মসজিদে কথা বললেই চল্লিশ বছরের আমল নষ্ট?
লোকমুখে একটি কথা প্রচলিত আছে—
مَنْ تَكَلَّمَ بِكَلَامِ الدُّنْيَا فِي الْمَسْجِدِ أَحْبَطَ اللَّهُ أَعْمَالَهُ أَرْبَعِينَ سَنَةً
অর্থ: যে ব্যক্তি মসজিদে দুনিয়াবি কথা বলবে, আল্লাহ তার চল্লিশ বছরের আমল নষ্ট করে দেবেন।
তবে মুহাদ্দিসদের মতে, এটি সহিহ হাদিস নয়; বরং বানোয়াট বর্ণনা।
একইভাবে, ‘মসজিদে কথা বললে নেক আমল নষ্ট হয়ে যায়, যেমন পশু ঘাস খায়’—এ ধরনের কথাও নির্ভরযোগ্য হাদিস হিসেবে প্রমাণিত নয়।
আর ‘মসজিদে বেশি কথা বললে ফেরেশতারা প্রথমে তাকে আল্লাহর প্রিয় ব্যক্তি, পরে আল্লাহর অপছন্দের ব্যক্তি বলে চুপ করতে বলে এবং শেষে তার ওপর লানত দেয়’—এমন কথাও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সহিহ হাদিস নয়। নির্ভরযোগ্য কোনো সনদে এ বর্ণনার প্রমাণ পাওয়া যায় না।
ইসলামের শিক্ষা হলো, মসজিদের মর্যাদা রক্ষা করা এবং এটিকে ইবাদতের স্থান হিসেবে সম্মান করা। প্রয়োজন হলে বৈধ বিষয়ে কথা বলা যেতে পারে, তবে তা যেন আড্ডা, হৈচৈ বা অন্যের ইবাদতে বাধার কারণ না হয়। মসজিদে নীরবতা, শালীনতা ও অন্য মুসল্লির প্রতি সম্মান বজায় রাখাই একজন মুমিনের করণীয়।
আরটিভি/জেএমএ

