
মৃত্যু অবধারিত। পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীকেই একদিন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। প্রিয়জনের মৃত্যুতে স্বজনরা যেমন শোকাহত হন, তেমনি অনেকেই কবর জিয়ারত করতে গিয়ে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া ও সালাম করেন। এ সময় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সালাম দিলে মৃত ব্যক্তি কি তা শুনতে বা অনুভব করতে পারেন?
ইসলামি শরিয়তের ব্যাখ্যায়, এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশ সালাফ, নির্ভরযোগ্য আলেম ও ফকিহের মত হলো মৃত ব্যক্তি কবর জিয়ারতকারীর সালাম শুনতে পারেন এবং আল্লাহর ইচ্ছায় তার সালামের জবাবও দেন। তবে সেই জবাব জীবিত মানুষ সাধারণত শুনতে পান না।
হাদিসে এসেছে, কোনো মুসলিম ব্যক্তি দুনিয়ায় পরিচিত মৃত ভাইয়ের কবরের পাশ দিয়ে গিয়ে তাকে সালাম দিলে আল্লাহ তার রুহকে সালামের জবাব দেওয়ার জন্য ফিরিয়ে দেন। এ হাদিসের ভিত্তিতে আলেমরা বলেন, মৃত ব্যক্তি জিয়ারতকারীকে চিনতে এবং তার সালামের জবাব দিতে পারেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) কবরবাসীদের সালাম দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছেন। কবর জিয়ারতের সময় তাদের উদ্দেশে সালাম ও দোয়া করা সুন্নত। এ থেকে বোঝা যায়, কবরবাসীদের সঙ্গে জীবিতদের এক ধরনের সম্পর্ক ও যোগাযোগের বিষয় ইসলামি সূত্রে স্বীকৃত।
ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বরাতে বলা হয়েছে, কেউ তার কোনো নিকটাত্মীয়ের কবর জিয়ারত করে সেখানে বসে তার জন্য দোয়া করলে মৃত ব্যক্তি তা বুঝতে পারেন এবং এতে আনন্দিত হন। ইমাম কুরতুবি (রহ.)-ও উল্লেখ করেছেন, মৃতরা জীবিতদের কণ্ঠস্বর শুনতে এবং তাদের পদচারণা অনুভব করতে পারেন।
ইমাম ইবনে তাইমিয়া ও ইবনে কাইয়িমের মতেও, আল্লাহ তাআলা মৃতদের এমন কিছু উপলব্ধির ক্ষমতা দিতে পারেন, যার মাধ্যমে তারা দুনিয়ার নির্দিষ্ট কিছু বিষয় সম্পর্কে অবগত হন। তবে মৃতরা ঠিক কতটুকু শুনতে বা জানতে পারেন, তা আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।
এ বিষয়ে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, কবরের পাশে দাঁড়িয়ে মৃত ব্যক্তিকে সালাম দিলে তিনি তা অনুভব করেন। বারজাখের জীবনে আল্লাহ মৃত ব্যক্তিকে এমন এক ধরনের উপলব্ধি দান করেন, যার মাধ্যমে আল্লাহ যেসব বিষয় তাকে অনুভব করাতে চান, সেগুলো তিনি অনুভব করতে পারেন।
তবে তিনি এও উল্লেখ করেন, অধিকাংশ সালাফের মতে মৃত ব্যক্তিকে কবরের পাশে দাঁড়িয়ে সালাম দেওয়া হলে তিনি সালামের উত্তর দেন, যদিও জীবিতরা সেই উত্তর শুনতে পান না। আবার সমকালীন কিছু আলেমের মতে, মৃতরা সালাম শুনতে পান বা কবর জিয়ারতকারীর উপস্থিতি অনুভব করেন—এ বিষয়টি হাদিসের মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্পষ্টভাবে প্রমাণিত নয়।
কবর জিয়ারতের গুরুত্ব
কবর জিয়ারত মহানবী (সা.)-এর সুন্নত। কবর জিয়ারত মানুষের অন্তর নরম করে, মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং আখেরাতের প্রস্তুতির কথা মনে করিয়ে দেয়।
ইসলামের শুরুর দিকে কবর জিয়ারত থেকে নিষেধ করা হলেও পরে রাসুলুল্লাহ (সা.) তা অনুমোদন করেন। হাদিসে তিনি বলেছেন, আগে তিনি কবর জিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলেন; পরে কবর জিয়ারতের অনুমতি দিয়ে বলেন, এটি দুনিয়াবিমুখতা তৈরি করে এবং আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ১৫৭১)
তাই কবর জিয়ারতে গিয়ে মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা, সালাম দেওয়া এবং নিজের আখেরাতের কথা স্মরণ করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। মৃতরা আমাদের সালাম ঠিক কীভাবে অনুভব করেন—এর পূর্ণ বাস্তবতা মানুষের জ্ঞানের বাইরে। তবে আল্লাহর ইচ্ছায় তারা সালামের জবাব দেন—এ মতই অধিকাংশ আলেমের কাছে গ্রহণযোগ্য।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার কবরবাসীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এই দোয়া পড়েন, উচ্চারণ: আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর, ইয়াগফিরুল্লাহু লানা ওয়ালাকুম। আংতুম সালাফুনা, ওয়া নাহনু বিল আসার।
অর্থ: হে কবরবাসী, তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের ক্ষমা করুন, তোমরা আমাদের আগে কবরে গিয়েছ এবং আমরা পরে আসছি। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১০৫৩)
আরটিভি/এসকে


