দেশকে উন্নতির দ্বারপ্রান্তে নিতে একের পর এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করছে বর্তমান সরকার। ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নে নেওয়া হয়েছে মেগা প্রকল্প। প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে স্বস্তি ফিরেছে জনজীবনে। বিদায়ী ২০২৩ সালেও স্বপ্ন ছুঁয়েছে বেশ কিছু প্রকল্প। এসবের মধ্যে ছিল মেট্রোরেল, বঙ্গবন্ধু টানেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ, মাতারবাড়ী সমুদ্র বন্দর চ্যানেল, পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে, ঢাকা-কক্সবাজার রুটে রেল এবং সারাদেশে বহু মডেল মসজিদ নির্মাণসহ বেশ কিছু প্রকল্প।
মেট্রোরেল
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলতি বছরের ৪ নভেম্বর আগারগাঁও থেকে মতিঝিল পর্যন্ত বহুল প্রতীক্ষিত মেট্রোরেল সার্ভিসের দ্বিতীয় ধাপের উদ্বোধন করেন। এরপর ৫ নভেম্বর থেকে উত্তরা-মতিঝিল রুটে প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত চলছে মেট্রোরেল। বেলা সাড়ে ১১টার পর মতিঝিল-আগারগাঁও রুটে চলাচল বন্ধ থাকলেও উত্তরা-আগারগাঁও সেকশনে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত চলছে মেট্রোরেল।
২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রোরেলের প্রথম ধাপের উদ্বোধন করা হয়। মূলত যানজট নিরসনে রাজধানীজুড়ে মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মেট্রোরেলের সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ২০ টাকা আর সর্বোচ্চ ভাড়া ১০০ টাকা।
উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মোট ১৭টি স্টেশন চালু হলে এই ২১.২৬ কিলোমিটার পথ ভ্রমণ করতে মেট্রোরেলের মোট সময় লাগবে মাত্র ৪০ মিনিট। মেট্রোরেল প্রতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী এবং প্রতিদিন ৫ লাখ যাত্রী বহন করতে সক্ষম হবে এবং প্রতি চার মিনিটে প্রতিটি স্টেশনে একটি ট্রেন আসবে।
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) মেট্রোরেল নির্মাণ করছে। আর প্রকল্পে সহজ শর্তে ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। জাইকা প্রকল্পের জন্য ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা দিয়েছে।
উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার রেলপথ তৈরির পরিকল্পনা থাকলেও পরে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত আরও দেড় কিলোমিটারের বেশি দৈর্ঘ্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ফলে এর খরচ বেড়ে যায় প্রায় সাড়ে এগারো হাজার কোটি টাকা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এমআরটি-৬ লাইনের সংশোধিত প্রাক্কলিত ব্যয় ৩৩ হাজার ৪৭১ দশমিক ৯৯ কোটি টাকা।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল
চলতি বছরের ২৮ অক্টোবর বহুল প্রত্যাশিত চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত দেশের প্রথম যোগাযোগ পথ টানেলের ফলক উন্মোচন করা হয়। এটি উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নদীর তলদেশে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম সড়ক টানেল এটি।
২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি টানেলের খননকাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। নির্মাণকাজ শুরুর প্রায় সাড়ে চার বছর পর টানেলের উদ্বোধন করা হয়। টানেলের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উদ্বোধনের পর গাড়ি চলাচল শুরু হয় ২৯ অক্টোবর সকাল ৬টা থেকে।
দেশের প্রথম টানেলের সংযোগ সড়কসহ মোট দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ৩৯ কিলোমিটার। প্রধান টানেলের দৈর্ঘ্য ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার। এ ছাড়া সংযোগ সড়ক ৫ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার লম্বা। আনোয়ারা প্রান্তে থাকা একমাত্র ভায়াডাক্ট বা ওভারপাস ৭২৭ মিটার দীর্ঘ। টানেলের ভেতরে থাকা দুটি টিউব বা সুড়ঙ্গের প্রতিটির দৈর্ঘ্য ২ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার। প্রতিটি টিউবে দুটি করে মোট চারটি লেন রয়েছে।
দেশের প্রথম এ টানেল নির্মিত হয়েছে বাংলাদেশ এবং চীন সরকারের আর্থিক সহায়তায়। বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে খরচ হচ্ছে ১০ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার দিচ্ছে ৪ হাজার ৬১৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। আর চীন সরকার ৬ হাজার ৭০ কোটি টাকা। চীন সরকার এ সহায়তা ঋণ হিসেবে দিচ্ছে। এ ঋণ সুদসহ ফেরত দিতে হবে।
এ ছাড়া টানেলের আগামী পাঁচ বছরের জন্য রক্ষণাবেক্ষণ এবং টোল আদায়ের দায়িত্বও পেয়েছে প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিসিসিসি) লিমিটেড। তাই এ প্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে ৯৮৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে চারটি স্ক্যানার কেনা এবং স্থাপনের কাজে।
এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে
চলতি বছরের ২ সেপ্টেম্বর উদ্বোধন হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। ওইদিন বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক্সপ্রেসওয়ের ১১.৫ কিলোমিটার অর্থাৎ বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত অংশের উদ্বোধন করেন। দ্রুতগতির এই উড়ালসড়কের দৈর্ঘ্য ১৯.৭৩ কিলোমিটার।
উদ্বোধনের পর ৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টা থেকে কাওলা-তেজগাঁও পর্যন্ত অংশে সাধারণ যানবাহন চলাচল করতে খুলে দেওয়া হয়। এই সড়ক দিয়ে বিমানবন্দর থেকে ফার্মগেটে পৌঁছাতে সময় লাগবে মাত্র ১০ মিনিট। যা যানজটের কারণে এখন প্রায় ১ ঘণ্টার মতো লাগে।
শহরের যানজট নিরসন করতে প্রকল্প হাতে নেওয়ার এক দশকেরও বেশি সময় পরে এটির উদ্বোধন করা হয়। বিদেশি বিনিয়োগে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) অধীনে পরিবহন খাতে এটাই প্রথম প্রকল্প। সম্পূর্ণ এক্সপ্রেসওয়ে অর্থাৎ তেজগাঁও-কুতুবখালী পর্যন্ত ২০২৪ সালের জুনে চালু করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।
কাওলা থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত অংশে ওঠা নামার জন্য মোট ১৫ টি র্যাম্প থাকবে। এর মধ্যে ১৩টি র্যাম্প ৩ সেপ্টেম্বর যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। আর পুরো উড়ালসড়কে ৩১টি স্থান দিয়ে যানবাহন ওঠানামা (র্যাম্প) করতে পারবে।
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে শহরের যানজট কমাতে যে দুটি এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি করা হচ্ছে তার মধ্যে একটি। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, উড়ালসেতুর সম্পূর্ণ সুবিধা পেতে দুটি এক্সপ্রেসওয়ে চালু হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। দুটি এক্সপ্রেসওয়ে চালু হলে বাংলাদেশের উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল থেকে ঢাকা হয়ে যাতায়াতের সময় রাজধানীর যানজট এড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া ট্রাক এবং লরি, যা এখন দিনের বেলা শহরে প্রবেশ করতে পারে না, সেগুলোও এক্সপ্রেসওয়ে ব্যবহার করতে পারবে।
পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ
চলতি বছরের ১০ অক্টোবর পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-ভাঙ্গা রুটে নতুন ট্রেন সার্ভিস উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রকল্পের বিবরণ অনুযায়ী, বাংলাদেশ রেলওয়ে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন রেল ট্র্যাক নির্মাণ করছে। এর ৮২ কিলোমিটার অংশ ঢাকা ও ভাঙ্গাকে সংযুক্ত করে, যা ১০ অক্টোবর খুলে দেওয়া হয় এবং এর যশোর সংযোগকারী অবশিষ্ট অংশটি আগামী বছরের জুনে চালু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত বছরের জুনে যুগান্তকারী পদ্মা সেতু উদ্বোধনের এক বছর দুই মাস পর পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-ভাঙ্গা রেল সার্ভিস উদ্বোধন করা হয়। গত ৭ সেপ্টেম্বর পদ্মা সেতু দিয়ে ঢাকা-ভাঙ্গা রুটে বিশেষ ট্রেনের ট্রায়াল সম্পন্ন হয়।
এর আগে, পদ্মা সেতুতে পাথরহীন রেললাইনের কাজ শেষ হওয়ার পর গত ৪ এপ্রিল ভাঙ্গা থেকে পদ্মা সেতুর মাওয়া প্রান্ত পর্যন্ত ট্রায়াল ট্রেন চালায় বাংলাদেশ রেলওয়ে। গত বছরের ১৪ অক্টোবর ‘পদ্মা সেতু রেল সংযোগ নির্মাণ প্রকল্প’র আওতায় ঢাকা ও যশোরের মধ্যে রেল সংযোগ নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। এটি উদ্বোধন করেন প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এতে ২১ হাজার ৩৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা ঋণ দিচ্ছে চীনের এক্সিম ব্যাংক।
সমাপ্ত হওয়ার পর রেল যোগাযোগ পদ্মা সেতুর মাধ্যমে দেশের মধ্য এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী শহরের প্রবেশ পথ আরও বর্ধিত হবে—যা মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও নড়াইল জেলার নতুন এলাকাকে যুক্ত করবে বলে প্রকল্পের বিশদ বিবরণে উল্লেখ করা হয়। প্রকল্পটি ঢাকা-যশোর-খুলনাকে ২১২ দশমিক শূন্য পাঁচ কিলোমিটার সংক্ষিপ্ত রুট দিয়ে বিকল্প রেলপথ সংযোগ স্থাপন করবে।
মাতারবাড়ী সমুদ্র বন্দর চ্যানেল
এ বছরের ১১ নভেম্বর কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে বহুল প্রতীক্ষিত দেশের প্রথম গভীর সমুদ্র বন্দরের চ্যানেল উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সঙ্গে এই চ্যানেলে কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণ কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এই বন্দর বাংলাদেশের অর্থনীতির গেম চেঞ্জার হিসেবে ভূমিকা পালন করবে। জোয়ার-ভাটায় যেকোন সময়ে ৮হাজার টিইইউএস’র জাহাজ ভিড়তে পারবে এখানে। ফলে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলোর জন্য বাংলাদেশে জাহাজ নিয়োজিত করার সুবিধা বাড়বে। এতে পণ্য পরিবহনে খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে। এ বন্দরকে ঘিরে মাতারবাড়ী-মহেশখালী এলাকায় ব্যাপক শিল্পায়নসহ গড়ে উঠবে অর্থনৈতিক অঞ্চল। ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে, দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকসহ পেশাজীবীদের জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি হবে। দেশের বেকার সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রে এই বন্দর ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বন্দরের মাধ্যমে ২০২৬ সালের মধ্যে আনুমানিক ০.৬ থেকে ১.১ মিলিয়ন টিইইউস (বিশ ফুট দৈর্ঘ্যের কন্টেইনার) এবং ২০৪১ সালের মধ্যে আনুমানিক ২.২ হতে ২.৬ মিলিয়ন টিইইউস কন্টেইনার কার্গো হ্যান্ডেল করা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। মাতারবাড়ী বন্দরকে কেন্দ্র করে এখানে বাণিজ্যিক হাব গড়ে তোলা হবে। চট্টগ্রাম বন্দর যেমন দেশের অর্থনীতির লাইফ লাইন, তেমনি মাতারবাড়ী বন্দরও দেশের অর্থনীতির জন্য আরেকটি প্যারালাল লাইফ লাইনে পরিণত হবে বলেও আশা করা হচ্ছে।
পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে
চলতি বছরের ১৪ নভেম্বর উচ্চ গতির সড়ক পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের প্রথম ১৪ লেনের এ সড়কের নাম ‘শেখ হাসিনা সরণি’। এটি উদ্বোধনের মাধ্যমে ঢাকার পূর্ব থেকে পশ্চিমে নতুন সংযোগ তৈরি হয়। যদিও শতভাগ কাজ শেষ হওয়ার আগেই সাধারণের চলাচলের এ পথটা খুলে দেওয়া হয়।
পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে হলো, ঢাকার নতুন গেইটওয়ে। এটি দেশের প্রথম ১৪ লেনের মহাসড়ক। যার ৮টি এক্সপ্রেসওয়ে। এরই মধ্যে শতভাগ কাজ শেষ; কুড়িল থেকে কাঞ্চন সড়ক বাতির কাজও শেষ। মহাসড়কের দুপাশে রয়েছে ১০০ ফুট খাল। বিশেষ ব্যবস্থা থাকায় ভারি বৃষ্টিতেও এ পথে তৈরি হবে না কোনো জলাবদ্ধতা। এ ছাড়া শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন করতেও এই প্রকল্প বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে সড়ক ডিভাইডারে বসেছে ৩৩ হাজার নানা জাতের গাছ। রোড মার্কিংয়ের কাজ শেষ হওয়ায় যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। কুড়িল থেকে কাঞ্চন পর্যন্ত ১২.৩০ কিলোমিটার দেশের প্রথম ১৪ লেনের সড়ক এটি। এই পথে কুড়িল থেকে কাঞ্চন যাওয়া যাবে বিনা বাধায়।
কুড়িল থেকে বালু নদী পর্যন্ত বাকি পথটার দুপাশে আছে আট লেনের রাস্তা। যা আশপাশের এলাকাকে এই সড়কে যুক্ত করবে এবং সঙ্গে রয়েছে দুই পাশের খাল। এটি কেবল এই এলাকা না, ঢাকা উত্তরের একটি বড় অংশের জলাবদ্ধতা নিরসনে সহায়তা করবে।
ঢাকা-কক্সবাজার রুটে রেল
গত ১১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজার রেল সংযোগ উদ্বোধন করেন। এ সময় ডিসেম্বর থেকে দুটি ট্রেন চালুর নির্দেশ দেন তিনি। এরপর ১ ডিসেম্বর দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে ‘কক্সবাজার এক্সপ্রেস’ ঢাকার উদ্দেশ্যে কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে যায়। রাত ৯টা ১০ মিনিটে এই ট্রেন ঢাকায় পৌঁছায়। ফিরতি ট্রেন কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে ঢাকার কমলাপুর স্টেশন ছেড়ে যায় রাত সাড়ে ১০টায়।
এই রুটে ট্রেনের গতিসীমা ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১২০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। কয়েক দফা পরীক্ষামূলক ট্রেন চলাচলের সফল কার্যক্রম শেষে গত ১১ নভেম্বর কক্সবাজার রেল সংযোগ উদ্বোধন করা হয়। এই রুটে ট্রেন চলাচলকে কেন্দ্র করে পর্যটকসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ এবং উৎসাহ-উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। কক্সবাজারে পর্যটন শিল্পের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা।
এই রুটে আপাতত দুটি ট্রেন চলাচল করছে। ট্রেনের সর্বনিম্ন ভাড়া যেটি ধরা হয়েছে সেটি হচ্ছে ১৮৮ টাকা। আর এটি নন এসি মেইল ট্রেন। সর্বোচ্চ ভাড়া এসি বার্থে ১ হাজার ৭২৫ টাকা। বর্তমানে রেলের যে ভাড়ার হার আছে সেই অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, নতুন এই ট্রেনে মোট ১৬টি কোচ রয়েছে। আসন রয়েছে ৭৮০টি। ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত শোভন চেয়ারের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৯৫ টাকা। এসি চেয়ারের ভাড়া ১ হাজার ৩২৫ টাকা, এসি সিটের ভাড়া ১ হাজার ৫৯০ টাকা এবং এসি বার্থের ভাড়া (ঘুমিয়ে যাওয়ার আসন) ২ হাজার ৩৮০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত শোভন চেয়ারের ভাড়া ২০৫ টাকা, স্নিগ্ধা শ্রেণির ৩৮৬ টাকা, এসি সিটের ৪৬৬ এবং এসি বার্থের ভাড়া ৬৯৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
মডেল মসজিদ উদ্বোধন
এ বছরের ৩০ অক্টোবর দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় ষষ্ঠ পর্বে আরও ৫০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন সৌদি আরবের মদিনার পবিত্র মসজিদ-ই-নববীর ইমাম শায়খ ড. আবদুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান আল-বুয়াইজান। নতুন ৫০টি মসজিদ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এ পর্যন্ত সারাদেশে ৩০০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সংস্কৃতিকেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়।
এর আগে ২০২১ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রথম পর্যায়ে, চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি দ্বিতীয় পর্যায়ে, ১৬ মার্চ তৃতীয় পর্যায়ে, ১৭ এপ্রিল চতুর্থ পর্যায়ে এবং ৩০ জুলাই পঞ্চম পর্যায়ে ৫০টি করে মোট ২৫০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র উদ্বোধন করা হয়।
সঞ্চয় ভেঙে চালাতে হচ্ছে সংসার (ভিডিও)
অর্থনৈতিক মন্দা ও বাজারে পণ্যের মূল্যস্ফীতিতে কমছে মানুষের আয় সক্ষমতা। এমন পরিস্থিতির মধ্যে ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে রাজনৈতিক পরিবেশ। বিএনপির ডাকা হরতাল-অবরোধে বেকায়দায় পড়ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। এমন বাস্তবতায় সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাতে হচ্ছে দেশের অনেক মানুষের।
অবরোধের কারণে ঢাকার সঙ্গে বাইরের জেলার বাস চলাচল প্রায় বন্ধ। যাত্রী না থাকায় অনেকটাই অলস সময় পার করছেন টিকিট কাউন্টারের প্রতিনিধিরা।
বাসচালকদের পরিস্থিতি আরও করুণ। বাস চলাচল বন্ধ, তাই আয়ও শূন্য। বাসচালকরা বলেন, আমরা কাজ করলে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ডালভাত খেতে পারি। কিন্তু এখন কাজ না থাকায় আমাদের অনাহারে-অর্ধাহারে দিন পার হচ্ছে।
অবরোধে দোকান বন্ধ রেখেছেন অনেক ব্যবসায়ী। যারা খোলা রেখেছেন তাদের অনেকেই পাচ্ছেন না পর্যাপ্ত ক্রেতা। তারা বলেন, আগে দিনে প্রায় ১৫ হাজার টাকা বিক্রি হতো। কিন্তু আজকে মনে হয় না ১৫ শ’ থেকে দুই হাজার টাকা বিক্রি করতে পেরেছি। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্টাফদের বেতন দিতেই কষ্ট হচ্ছে।
মন্দা অর্থনীতির সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে ভোক্তাদের। খাবার কেনা কমিয়ে দিয়েছেন অনেকে।
দোকানিরা বলছেন, আগে আট লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হতো। এখন আট লিটার তেল বাজারে আসেই না। কারণ, এই তেল নেওয়ার মতো সক্ষমতা এখন কারও নেই।
তারা জানান, দোকানে সব পণ্যের সরবরাহ ভালো আছে। কোনো পণ্যের ঘাটতি নেই। কিন্তু বিক্রি আগে থেকে কমে গেছে। আগে যদি বিক্রি হতো ৫০ হাজার, এখন বিক্রি হচ্ছে ৩০ হাজার।
এমন পরিস্থিতিতে দেশের কর অঞ্চলগুলোতে চলছে মাসব্যাপী কর সেবা কর্মসূচি। রাজস্ব বোর্ডের প্রতিনিধিরা বলছেন, এবার অন্যান্য বছরের চেয়ে আয়কর রিটার্ন কম জমা পড়ছে।
অনেক করদাতার দাবি, আয়কর দেবেন কি, বরং জামানো সঞ্চয় ভেঙে খেতে হচ্ছে। তারা জানান, এখন মানুষ জমাতেই পারছেন না। ট্যাক্স দেবেন কোথা থেকে? এখন মানুষ পাঁচ টাকা বেশি ইনকাম করলেও পাঁচ টাকা বেশি খরচ হয়ে যাচ্ছে।
৪ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে ১৯ হাজার মানুষের (ভিডিও)
দেশে সড়ক নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হলেও নিরাপদ ব্যবস্থাপনার অভাবে দুর্ঘটনা বেড়েই চলেছে। গত চার বছরে সড়কে দুর্ঘটনা ঘটেছে প্রায় ২৬ হাজার। এতে প্রাণ গেছে ১৯ হাজার মানুষের। বিশেষজ্ঞদের মতে, চালকের অদক্ষতা আর পথচারীদের অসচেতনায় বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। তাই দ্রুত নিরাপদ সড়ক আইন কার্যকর করা প্রয়োজন।
দুর্ঘটনায় আপনজন হারিয়ে হাজারো পরিবারের স্বপ্ন আজ ধুলায় মিশে গেছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নিহতদের ৫১ শতাংশই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।
এমনই এক পরিবারের সদস্য আমেনা বেগম। তিনি এখন পথে পথে ঘোরেন। অথচ কদিন আগেও তার পরিবারে ছিল সচ্ছলতা। বছরের শুরুতে সড়ক দুর্ঘটনায় আমেনার স্বামী নিহত হলে সব তছনছ হয়ে যায়।
আমেনা বেগম বলেন, স্বামী যখন বেঁচে ছিল তখন কারও কাছে হাত পাততে হত না। এখন পরিবারে রুজি করার মতো কেউ নেই। আমি এখন অনেক অসহায়। আমাকে সাহায্য করার মতো কেউ নেই।
সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, চলতি বছর থেকে নিহতদের পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে। তবে তা পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করে যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, যেসব পদ্ধতির মাধ্যমে সড়ক নিরাপদ করা হয় তেমন কোনো কারিগরি মেকানিজম বাংলাদেশে নেই।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৫ হাজার ৯২৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ১৯ হাজার একজন। যাদের মধ্যে ৭ হাজার ৩৬৫ জন পথচারী। শুধু মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন ৯ হাজার ৩০৯ জন।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক মনে করেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাজধানীসহ সারাদেশে নানান উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ। তবে, দুর্বল ব্যবস্থাপনা আর সঠিক পরিকল্পনার অভাবে সড়ক নিরাপদ করা যায়নি।
তিনি বলেন, আমাদের রাস্তাঘাট হয়তো চমৎকার হয়ে যাচ্ছে, গাড়িও আধুনিক হয়ে যাচ্ছে কিন্তু চালক বা পরিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ থেকেই যাচ্ছে। এর ফলে আমরা দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে পারছি না।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় এয়ারবাস এ-৩৮০ সহ একসঙ্গে ৩৭টি উড়োজাহাজ পার্ক করা যাবে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে। ১২৮টি ইমিগ্রেশন কাউন্টার আর ১১৫টি চেক ইন কাউন্টারে যাত্রীরা সহজেই আনুষ্ঠানিকতা সারতে পারবেন। পণ্য আমদানি-রপ্তানির জন্য রয়েছে ৩৩ হাজার বর্গমিটারের স্বয়ংক্রিয় কার্গো টার্মিনাল।
শনিবার (৭ অক্টোবর) অত্যাধুনিক এ টার্মিনালের আংশিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মূল অবকাঠামো এখন প্রস্তুত, চলছে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ। দেশের প্রধান বিমানবন্দরের পুরোনো দুটি টার্মিনালের আয়তন ১ লাখ বর্গমিটার। আর তৃতীয় টার্মিনাল তৈরি হয়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটারজুড়ে।
নতুন এই টার্মিনালে একসঙ্গে পার্ক করা যাবে ৩৭টি উড়োজাহাজ, পুরোনো দুটিতে করা যায় ২৯টি। থাকছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ এয়ারবাস এ-৩৮০ এর উপযোগী দুইটিসহ মোট ২৬টি বোর্ডিং ব্রিজ।
নতুন এ টার্মিনালে রয়েছে অত্যাধুনিক ১৬টি ব্যাগেজ বেল্ট। স্বয়ংক্রিয় পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণ সুবিধাসহ বহির্গমন ও আগমনী ইমিগ্রেশন কাউন্টার ১২৮টি। নিরাপত্তা নিশ্চিতে থাকবে ৪০টি কেবিন এক্সরে মেশিন, ২৭টি ব্যাগেজ ও ১১টি বডি স্ক্যানার। বহির্গমনের জন্য সেলফ চেক-ইন কাউন্টারসহ মোট কাউন্টার ১১৫টি। ১৪টি স্পটে থাকবে ডিউটি ফ্রি শপ, সুপরিসর লাউঞ্জ ও বাণিজ্যিক স্পেস।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান বলেন, অটোমেটিক চেক হবে চারটি লেয়ারে। এখানে যাত্রীর ব্যাগ দেখার জন্য খোলা লাগবে না। যদি কোনো সন্দেহ হয় তাহলে চার লেভেলে ব্যাগগুলো স্ক্যান হবে।
সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে উড়োজাহাজ ও রানওয়েতে চলমান যানবহানের অবস্থান নির্ভুলভাবে নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণের সুবিধা রাখা হয়েছে।
বহুতল পার্কিংয়ে একসঙ্গে রাখা যাবে ১ হাজার ২৩০টি গাড়ি। পণ্য আমদানি ও রপ্তানির জন্য কার্গো টার্মিনালের আয়তন ৩৩ হাজার বর্গমিটার। যেখানে পুরো প্রক্রিয়া চলবে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে।
শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায় ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর। সে সময় এর নির্মাণব্যয় ধরা হয়েছিল ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। পরে আরও ৭ হাজার ৭৮৮ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বাড়িয়ে প্রকল্পের আকার দাঁড়ায় প্রায় ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটির নির্মাণ শুরু হয়।
প্রকল্পটির নির্মাণব্যয়ের বেশির ভাগ আসছে জাপানি সহযোগিতা সংস্থা জাইকার কাছ থেকে। সংস্থাটি ঋণ হিসেবে দিচ্ছে ১৬ হাজার ১৪১ কোটি ২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। আর বাকি ৫ হাজার ২৫৮ কোটি ৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার।
শেষ জীবনে কীভাবে বেঁচে আছেন বৃদ্ধাশ্রমের প্রবীণরা (ভিডিও)
সমাজে প্রবীণরা সাধারণত শেষ জীবনে এসে এমনকি পরিবারের কাছেও অনেকটা অবহেলার পাত্র হয়ে পড়ে। আর এ কারণে সন্তান-স্বজন-সম্পদ সব হারিয়ে এখন প্রবীণ নিবাসই তাদের অনেকের কাছে আপন ঠিকানা। জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা অনুযায়ী বাংলাদেশে সাধারণত ষাটোর্ধ্ব বয়সী ব্যক্তিরাই প্রবীণ হিসেবে স্বীকৃত। আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস উপলক্ষে স্বজনহীনতার যন্ত্রণায় অঙ্গার অগ্রজদের মনের আর্তনাদ নিয়ে আজকের প্রতিবেদন।
লন্ডন প্রবাসী পাঁচ সন্তান। আর তাদের এই বৃদ্ধ মা কল্যাণপুরের ওল্ড এজ হোমে। বয়সের ভারে কুঁচকানো মায়ের ললাট। তাতে বেদনার ছাপ স্পষ্ট। দিন যায়-মাস যায়-বছর যায়, নিয়ম করে ঋতু বদলায়। কিন্তু শীতল হয় না বুকের ভেতর থাকা প্রাণ পাখি। সবই আছে, আবার কিছুই নেই। মা নামক বোঝাটি, বিমানবন্দরে ফেলে দিয়ে গেছে সন্তানরা। এ যেনো স্বপ্নসাধের কবর রচনা।
বুকে জমা অভিমানের পাহাড় চাপা দিয়ে সেই মায়ের অভিযোগ- চারটা ছেলে, একটা মেয়ে। সবাই লন্ডনে, কেউ এখানে আসে না। শুধু একলা আমিই এখানে। কেউ ফোনও করে না, কথাও বলে না।
জীবনের অর্জিত সম্পদ দিয়ে একমাত্র ছেলে অপূর্ব হাসান চৌধুরীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী বিভাগ থেকে পাশ করার পর যুক্তরাষ্ট্রে পাঠান উচ্চতর ডিগ্রী নিতে। সমস্ত স্বপ্নসাধের কবর রচনা করে মিরা চৌধুরী আজ ঠাঁই নিয়েছেন আশ্রমের ৪১৫ নম্বর কক্ষে।
এই প্রতিবেদককে তিনি জানান, আশ্রমেই বেশ আছি। শুরু থেকেই মৃদু ভাষায় কথা বলছিলেন। নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলেন না। গলা ধরে এলো। নিমিষেই চোখের কোণ বেয়ে দু’ফোটা অশ্রু গালে গড়ালো। বয়সের ভারে কুচকানো গাল। তাতে বেদনার স্পষ্ট ছাপ। চশমা খুলে ওড়নায় চোখের পানি মুছতে মুছতে শোনালেন সংক্ষিপ্ত জীবনকথা।
শেষ জীবনে এভাবেই বেঁচে থাকার কথা জানালেন বৃদ্ধাশ্রমে থাকা প্রবীণরা। হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসা উজাড় করে যে বাবা-মা সন্তানকে গড়ে তুলতে তিলতিল করে সর্বস্ব বিকিয়েছেন, তারাই আজ বৃদ্ধ বয়সে নিষ্ঠুর নিয়তির শিকার। রয়েছে রাস্তায় ফেলে পালিয়ে যাওয়া, ডাক্তার দেখানোর কথা বলে অচেনা জায়গায় ফেলে যাওয়ার মত ঘৃণ্য দৃষ্টান্তও। সেসব স্বর্গের টুকরো কুড়িয়ে এনে নিজের কাছে আশ্রয় দিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছে অনেক সংগঠন।
চাইন্ড এন্ড ওল্ড এজ হোমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিল্টন সমাদ্দার বলেন, এখন পর্যন্ত আল্লাহ ভালো ভাবেই চালাচ্ছে আমাদের। আমার প্রচষ্টা হলো রাস্তায় কোনো অজ্ঞাত মানুষ থাকবে না।
সমাজ গবেষকরা বলছেন, দিন বদলের সাথে সাথে এই যান্ত্রিক সভ্যতায় পারিবারিক কাঠামোতে পরিবর্তন এসেছে। নৈতিক শিক্ষার অবক্ষয়ে মানুষের ভেতর থেকে মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে যাওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে অনেক।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সাবিনা শারমিন বলেন, প্রত্যেক ধর্মেই কিন্তু বাবা-মায়ের কথা বলা আছে। বিশেষ করে যদি ইসলাম ধর্মের কথাই বলি, সেখানে বলা আছে মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত। এই মূল্যবোধটাকে যদি আমরা আমাদের সন্তানদের দিতে পারি, তাহলে কিন্তু কোনো সন্তান তার বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে পারে না।
প্রবীণরা সমাজে সম্মানিত ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। তাই তাদের উদ্দেশ্যে ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর পহেলা অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ঘোষণা করে জাতিসংঘ। তখন থেকে দিনটি প্রবীণ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।
আরও পড়ুন
জামায়াত নেতা শফিকুল ইসলাম মাসুদের ৩ বছরের কারাদণ্ড
ঢাকার বাতাস আজও ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’, দূষণের তালিকায় তৃতীয়
থার্টি ফার্স্ট নাইট : রাজধানীর যেসব সড়ক বন্ধ থাকবে
ঢাকাস্থ মাদারীপুর সাংবাদিক সমিতির সভাপতি আশুতোষ, সম্পাদক মান্নান