
বিবাহবিচ্ছেদের ধাক্কা, মানসিক অস্থিরতা ও উদ্বেগ ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন সময় সামলাতে গিয়ে মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন ভারতের লেগ স্পিনার যুজবেন্দ্র চাহাল। তবে পরিবার ও বন্ধুদের সহযোগিতায় সেই আসক্তি কাটিয়ে এখন ভালো আছেন বলে জানিয়েছেন ৩৬ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার।
ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন অধ্যায় পেরিয়ে আবারও নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছেন যুজবেন্দ্র চাহাল। একসময় মানসিক চাপ ও প্যানিক অ্যাটাকের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে তাকে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, নিজের সবচেয়ে প্রিয় ক্রিকেটকেই হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল তার মনে। শেষ পর্যন্ত জীবনযাপনে পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নেন এই ভারতীয় স্পিনার।
চাহালের মতে, সেই সিদ্ধান্ত তার ব্যক্তিগত জীবন ও ক্রিকেটীয় পারফরম্যান্সে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মানসিক পরিপক্বতা বেড়েছে, আবেগ নিয়ন্ত্রণেও এসেছে ভারসাম্য। গত আইপিএলে নিজের শারীরিক সক্ষমতা ফিরে পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
চাহাল বলেন, ‘সেই সিদ্ধান্ত আমার ব্যক্তিগত জীবনে বিশাল পরিবর্তন এনেছে। আমার পরিপক্বতা বেড়েছে। এখন আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি। গত আইপিএলে আমার শরীরকে আবার ৩০ বছর বয়সের মতো মনে হয়েছে। জিম করেছি, ফিল্ডিংয়ের অনুশীলন করেছি এবং নিয়ম মেনে প্রশিক্ষণ নিয়েছি।’
চাহালের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে আইপিএলে খেলার সময় থেকেই মদ্যপানের অভ্যাস শুরু হয় তার। তখন বয়স কম থাকায় পার্টি ও আড্ডা ছিল জীবনের অংশ। তবে সময়ের সঙ্গে সেই অভ্যাস বাড়তে থাকে। বিবাহবিচ্ছেদের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এ প্রসঙ্গে চাহাল বলেন, শুরুর দিকে আমি তরুণ ছিলাম। পার্টি হতো। ২০১১ সালে প্রথম আইপিএল খেলি। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটার এবি ডি ভিলিয়ার্স একবার আমাকে বলেছিলেন, জীবনে ভারসাম্যটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কথাটা শুনতে সহজ, কিন্তু বাস্তবে তা ধরে রাখা সহজ নয়।
বিবাহবিচ্ছেদের পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন বলেও জানিয়েছেন চাহাল। একপর্যায়ে বুঝতে পারেন, এভাবে চলতে থাকলে ক্রিকেট ক্যারিয়ারই হুমকির মুখে পড়তে পারে। এরপর মদ্যপানের অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
চাহাল বলেন, ‘বিবাহবিচ্ছেদের পর বিষয়গুলো বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গিয়েছিল। মানসিক অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না। একসময় বুঝতে পারি, এভাবে চলতে থাকলে যে জিনিসটাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি, সেই ক্রিকেটকেই ধ্বংস করে ফেলব। তাই আমি এসবের ইতি টানার সিদ্ধান্ত নিই। এখন আমি অনেক বেশি সুখী এবং ভালো অবস্থায় আছি।’
ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনের পাশাপাশি জনপরিচিত ব্যক্তি হওয়ায় মানুষের সমালোচনাও সামলাতে হয়েছে চাহালকে। তার মতে, পরিচিত মুখ হওয়ার কারণে ব্যক্তিগত জীবনের নানা ঘটনা নিয়ে অন্যদের মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। এসব পরিস্থিতি মানসিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
চাহাল বলেন, ‘আপনি যখন একজন জনপরিচিত ব্যক্তি, তখন আপনার জীবনে যা কিছু ঘটে, তা নিয়েই মানুষ মন্তব্য করার সুযোগ পায়। আমার খারাপ লাগত, অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়েও যেতে হয়েছে।’
মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে একপর্যায়ে সাবেক বিসিসিআই কোষাধ্যক্ষ অনিরুদ্ধ চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলে বিরতি চেয়েছিলেন চাহাল। সেই কঠিন সময়ে অনিরুদ্ধের সহযোগিতাও পেয়েছেন বলে জানান তিনি। তবে উদ্বেগ ও প্যানিক অ্যাটাক তার জীবনে বড় প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে চাহাল বলেন, ‘আমি অনিরুদ্ধ স্যারের (চৌধুরী) সঙ্গে কথা বলে বিরতি চেয়েছিলাম। তিনি আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। একসময় নিজেকেই প্রশ্ন করি, আর কত দিন এই বোঝা বয়ে বেড়াব? আমার জীবনে উদ্বেগ ও প্যানিক অ্যাটাক শুরু হয়।’
প্যানিক অ্যাটাকের সময় শারীরিকভাবেও অসুস্থ বোধ করতেন এই স্পিনার। বেড়ে যেত হৃদস্পন্দন, মুখের পেশিতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিত, এমনকি কথা বলতেও সমস্যা হতো।
চাহাল বলেন, ‘উদ্বেগের সময় হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। আমার ক্ষেত্রে প্যানিক অ্যাটাক হলে মুখটা কেমন যেন সংকুচিত হয়ে যেত। কথা বলতেও পারতাম না। ঠোঁট শক্ত হয়ে একদিকে টেনে যেত। ফলে মানুষ বুঝতে পারত, আমার সঙ্গে কিছু একটা সমস্যা হচ্ছে।’
ব্যক্তিগত জীবনের কঠিন সময় পেরিয়ে এখন নতুনভাবে এগিয়ে যেতে চান চাহাল। মানসিক সুস্থতা, শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপন ও ক্রিকেটের প্রতি মনোযোগ ফিরিয়ে এনে আবারও নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করছেন ভারতের এই লেগ স্পিনার।
আরটিভি/এসকে




