
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতি জোরদার করেছে এবং তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-কে আরও গুরুত্ব দিয়ে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করছে বলে জানিয়েছেন দলটির তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান।
সম্প্রতি গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর সরকার গঠন করতে পারলে বিএনপি সরকারি খাত, বেসরকারি খাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় অংশীদারত্বকে অগ্রাধিকার দেবে। এর মাধ্যমে এআই গবেষণাগার, ডেটা সেন্টার ও উদ্ভাবন হাব গড়ে তোলা হবে।
তিনি বলেন, এআই বিশ্ব অর্থনীতিকে নতুনভাবে গড়ে দিচ্ছে, “কিন্তু বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে।” তবে বিএনপি চায় না কেবল প্রচার বা হাইপ তৈরি করতে। বরং তারা গুরুত্ব দিতে চায় মৌলিক প্রস্তুতিতে—ডেটা প্রস্তুতি, অবকাঠামো প্রস্তুতি এবং ব্যবহারিক প্রয়োগে। এইভাবেই টেকসইভাবে একটি এআই-সক্ষম দেশ গড়ে তোলা যায়, তিনি মন্তব্য করেন।
ডিজিটাল সাক্ষরতার বিষয়ে তিনি বলেন, বিএনপি বিভাজিত বা সেগমেন্টেড পদ্ধতি গ্রহণ করবে। তরুণদের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার থাকবে পরিচিতি তৈরি, শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে কাঠামোবদ্ধ দক্ষতা উন্নয়ন এবং দেশব্যাপী আপস্কিলিং কর্মসূচিতে। আর বয়স্ক নাগরিক ও প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞদের জন্য স্থানীয় ডিজিটাল সেন্টার ও আউটরিচ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে কমিউনিটি-ভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্যোগ নেওয়া হবে—শুধু প্রশিক্ষণের জন্য প্রশিক্ষণ নয়।
এআই চাকরি কেড়ে নেবে—এমন উদ্বেগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এআইকে প্রতিযোগী নয়, সহায়ক হিসেবে দেখা উচিত। কিছু পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ স্বয়ংক্রিয় হবে, কিন্তু সেখান থেকেই উৎপাদনশীলতা আসে।
সঠিকভাবে এআই ব্যবহারের দক্ষতা থাকলে শ্রমশক্তি আরও উচ্চমূল্য সংযোজনের স্তরে যেতে পারবে বলে তিনি মনে করেন। তার ভাষায়, বিএনপি এআইকে একটি ‘ক্রস-কাটিং ক্যাটালিস্ট’ হিসেবে দেখছে এবং স্লোগানের বদলে শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা ও সরকারি সেবায় বাস্তব প্রয়োগে গুরুত্ব দিতে চায়।
তিনি বলেন, বিএনপি একটি জাতীয় এআই দক্ষতা কাঠামো চালুর পরিকল্পনাও করেছে, যেখানে ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ থাকবে—সাধারণ মানুষের জন্য মৌলিক সচেতনতা, পেশাজীবীদের জন্য প্রয়োগভিত্তিক দক্ষতা এবং প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের জন্য উন্নত গবেষণা। আমরা সবাইকে এআই ইঞ্জিনিয়ার বানাতে চাই না। শিক্ষা সংস্কার শুরু হবে স্কুল পর্যায়ে এআই ও ডিজিটাল মৌলিক ধারণা অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে। এরপর উচ্চ চাহিদাসম্পন্ন খাতে পেশাগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিশেষায়িত গবেষণা ট্র্যাক চালু করা হবে।
তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই প্রয়োগভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও গবেষণায় নেতৃত্ব দেবে, আর ভবিষ্যতের একটি আইসিটি মন্ত্রণালয় প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা করবে।
অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে, বিশেষ করে প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞ মিলেনিয়াল ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য, তিনি বাংলা ভাষাভিত্তিক একটি লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) তৈরির ওপর জোর দেন, যাতে এআই ইন্টারফেস বাংলায় কাজ করে। ইংরেজি ভাষা বাধা হয়ে মানুষ যেন বাদ না পড়ে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বাংলা এলএলএম তৈরি করা কঠিন হবে এবং এর জন্য বিপুল পরিসরে বাংলা বই, আর্কাইভ ও জ্ঞানভান্ডার ডিজিটাল করতে হবে।
নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান ডিজিটাল আইনগুলো ত্রুটিপূর্ণ এবং আগের সরকার এগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গি হলো একটি জাতীয় এআই কৌশল প্রণয়ন করা, যা একটি এআই টাস্কফোর্সের তত্ত্বাবধানে থাকবে এবং এতে স্পষ্ট নৈতিক সুরক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, নীতিমালায় একটি এআই এথিকস কমিটি থাকবে, যা গোপনীয়তা, পক্ষপাত ও জবাবদিহির বিষয়গুলো দেখবে—OECD ও UNESCO–এর নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা অনুযায়ী। বিএনপি নাগরিক অধিকার সংগঠন, শিক্ষাবিদ, খাতভিত্তিক বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি খাত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম এবং রাজনৈতিক অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ করে দেশের প্রথম এআই নীতিমালা প্রণয়ন করতে চায়।
বিদেশি এআই টুলের ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতাও একটি উদ্বেগের বিষয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ ক্ষেত্রে বিএনপির উত্তর শুরু হবে অবকাঠামো দিয়ে—এআই-প্রস্তুত ডেটা সেন্টার, বিশেষায়িত কম্পিউটিং সক্ষমতা (জিপিইউ/টিপিইউ শ্রেণির), নির্ভরযোগ্য ডেটা পাইপলাইন এবং স্বল্প-বিলম্বের ক্লাউড সিস্টেম। তাদের “বাংলাদেশ রিইম্যাজিনড: দ্য টেক ডিকেড” ব্লুপ্রিন্টে দেশের প্রথম এআই-সক্ষম ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। সংযোগ বা কানেক্টিভিটিকে তিনি পূর্বশর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি প্রয়োজন হলে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে সংস্কার শুরু করতে চায়, এরপর সারা দেশে সাশ্রয়ী ও উচ্চমানের ইন্টারনেট নিশ্চিত করা হবে। দেশীয় এআই প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রথম লক্ষ্য থাকবে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত—এআই-সক্ষম সংযুক্ত স্কুল, লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে। ঠিকভাবে করতে পারলে এই খাতগুলোতেই সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলা সম্ভব।
উদ্ভাবনী পরিবেশ গড়ে তুলতে বিএনপি সরকারি-বেসরকারি-একাডেমিক অংশীদারত্বকে জোরালোভাবে সমর্থন করে। এখানে সরকার হবে সহায়ক, কেবল অনুদান বিতরণকারী নয়। টেকসই উদ্যোগ, যৌথ দায়িত্ব ও যৌথ ঝুঁকিই হবে মডেল—চাই তা উদ্ভাবন হাব, ডেটা সেন্টার কিংবা গবেষণাগারই হোক।
কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি বিষয়টিকে সামগ্রিকভাবে দেখছে। একীভূত বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ‘এআই বনাম নন-এআই’ এই দ্বৈততায় চাকরি সৃষ্টি মাপা যায় না। বিএনপির লক্ষ্য প্রথম মেয়াদে ডিজিটাল উদ্যোগ থেকে জিডিপিতে ২.০–৫.০ শতাংশ পয়েন্ট অবদান, সরাসরি ২ লাখ আইসিটি চাকরি এবং পরোক্ষভাবে আরও ৭–৮ লাখ চাকরি সৃষ্টি, যদি পরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়।
তার ভাষায়, আমাদের লক্ষ্য শব্দচয়ন নয়—স্কেল, টেকসইতা ও অর্থনৈতিক অবদান।
আরটিভি/এমএ




