ঢাকা বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

তাহিরপুরে বোরো আবাদে ব্যস্ত কৃষক, প্রণোদনার বীজ-সার নিয়ে ক্ষোভ

তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি, আরটিভি

প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ১২:২৮ পিএম
ছবি: আরটিভি

দেশের অন্যতম বৃহৎ হাওরাঞ্চল সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে শুরু হয়েছে বোরো মৌসুমের বীজতলা তৈরির কাজ। বর্ষায় পানিতে থইথই করা হাওরের বিস্তীর্ণ বুকে শুষ্ক মৌসুমে ফলবে সোনালি ধান। বছরের একমাত্র প্রধান ফসল বোরো ধানকে ঘিরেই আবর্তিত হয় এখানকার কৃষকদের জীবন জীবিকা। তবে গত মৌসুমে জলাবদ্ধতা ও ধানের গুণগত মানের অবনতিতে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছিলেন কৃষকরা। সেই ক্ষতি কাটিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যাশায় এবার আগেভাগেই বীজতলা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন তারা। তবে কৃষি প্রণোদনার আওতায় সঠিক সময়ে বীজ ও সার না পাওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে কৃষকদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, অনেক সময় বীজতলা তৈরির কাজ শেষ হওয়ার পর কৃষি অফিস থেকে বীজ ও সার দেওয়া হয়। ফলে এসব সরকারি সহায়তা কাজে না এসে নষ্ট হচ্ছে।

উপজেলার শনি ও মাটিয়ান হাওরসহ বিভিন্ন হাওরপাড় ঘুরে দেখা গেছে, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বীজতলা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। কেউ বীজতলায় পানি দিচ্ছেন, কেউ জমির আইল মেরামত করছেন, আবার কেউ কোদাল ও পাওয়ার টিলার দিয়ে মাটি প্রস্তুত করছেন। বীজতলায় ভিটামিন ও জৈবসার প্রয়োগসহ ধানের বীজ বপনের প্রতিটি ধাপ গুরুত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করছেন তারা।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর জলাবদ্ধতায় হাওরের অনেক জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি ব্র্যাকের শক্তি-২ ও ৭৭৭ জাতের ধানের উৎপাদন ও গুণগত মান নিয়েও হতাশ হতে হয়েছে অনেককে। কষ্ট করে ধান ঘরে তুললেও অপরিপক্বতা ও মানের অবনতির কারণে বাজারে ন্যায্যমূল্য পাননি তারা। প্রতি মণ ধান ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। অথচ এক মণ ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে এক হাজার টাকারও বেশি।

গত মৌসুমের ধান বিক্রি করতে না পারায় অনেক কৃষক এখনো আর্থিক সংকটে রয়েছেন। এরপরও বছরের একমাত্র বোরো মৌসুম হাতছাড়া করতে চান না তারা। ফলে ধারদেনা কিংবা বিভিন্নভাবে অর্থের জোগান দিয়ে নতুন মৌসুমের চাষাবাদের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে এবার ধানের জাত নির্বাচনে সতর্ক হয়েছেন কৃষকরা। গত বছর ক্ষতিগ্রস্ত শক্তি-২ ও ৭৭৭ জাতের পরিবর্তে বিএডিসির ৬৭ ও ৯২, ব্রি হাইব্রিড ধান-৮, সিনজেন্টার ১২০৩, শক্তি-৩, জনকরাজ, অগ্রণী-৭, হিরা-১৯ ও ২১ জাতের বীজের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে হাইব্রিড জাতের বীজ কিনতে ঝুঁকছেন অনেকে।

শনির হাওরপাড়ের কৃষক মিল্লাদ হোসেন বলেন, এ বছর দ্রুত হাওরের পানি কমে যাওয়ায় গত বছরের তুলনায় প্রায় এক মাস আগেই বোরো ধানের বীজতলা তৈরির কাজ শুরু করেছি। ৩০ কেয়ার জমির জন্য ৬০ কেজি বীজ কিনে বীজতলা তৈরি করেছি। এর মধ্যে বিএডিসির ৬৭ জাতের ৪০ কেজি, সিনজেন্টার ১২০৩ জাতের ১২ কেজি এবং জনকরাজ জাতের ৮ কেজি বীজ রয়েছে। গত বছরের উৎপাদিত ধান ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে না পেরে লোকসান গুনতে হয়েছে। তাই এবার ভালো ফলন ও ভালো দাম পাওয়ার আশায় জাত নির্বাচনে সতর্ক হয়েছি।

মাটিয়ান হাওরপাড়ের কৃষক আলম মিয়া বলেন, গত বছর ১০ কেয়ার জমির মধ্যে পাঁচ কেয়ারে ব্র্যাকের চিকন জাতের শক্তি-২ এবং বাকি পাঁচ কেয়ারে মোটা জাতের ধান চাষ করেছিলাম। শক্তি-২ জাতের ধান অপরিপক্ব হওয়ায় বাজারে চিকন ধানের স্বাভাবিক দামের চেয়ে মণপ্রতি ২০০ টাকা কম পেয়েছি। অন্যদিকে মোটা ধান বিক্রি করতে হয়েছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। এতে উৎপাদন খরচও ওঠেনি। তাই এবার ১০ কেয়ার জমির জন্য সিনজেন্টার ১২০৩ জাতের বীজ নিয়েছি। পাশাপাশি আরও দুই কেয়ার জমির জন্য মোটা জাতের জনকরাজ বীজ সংগ্রহ করেছি।

মাটিয়ান হাওরপাড়ের আরেক কৃষক আলী হোসেন বলেন, প্রতিবছর তিনি ৮ থেকে ১০ কেয়ার জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেন। এবারও আট কেয়ার জমির জন্য বীজ সংগ্রহ করেছেন। তিনি বলেন, দুই কেজি বীজ কিনতে দেড় মণ ধান বিক্রি করতে হয়। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, লাভবান হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিবছর কৃষি অফিস থেকে বীজ ও সার দেওয়া হলেও অনেক সময় তা কৃষকদের প্রয়োজনের সময় পাওয়া যায় না। অনেকের বীজ বপনের কাজ শেষ হওয়ার পর এসব সহায়তা দেওয়া হয়। তখন কৃষকরা সরকারি বীজ হাঁস-মুরগির খাবার হিসেবে ব্যবহার করতে বাধ্য হন। আমরা চাই, কৃষকদের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক সময়ে বীজ ও সার বিতরণ করা হোক।

ভাটি তাহিরপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল বাতেন সেন্টু বলেন, এ বছর ৫০০ মণ ধান উৎপাদন করেছিলেন। কিন্তু সারা বছর বাজারে ধানের দাম কম থাকায় ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারেননি। চিকন জাতের ধান কোনোমতে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেছেন। আর মোটা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত ধান বিক্রি করতে হয়েছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। অথচ প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে এক হাজার টাকার বেশি। তাই এবার ৩০ কেয়ার জমির বেশির ভাগ অংশে বিএডিসির ৬৭ ও ৯২, ব্রি হাইব্রিড ধান-৮ এবং সিনজেন্টার ১২০৩ জাতের বীজ নিয়েছেন। কিছু জমিতে জনকরাজ জাতের বীজও লাগাবেন।

তিনি আরও বলেন, এ সময় কৃষকরা বাজার থেকে প্রতি মণ ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা দরে বীজ সংগ্রহ করছেন। কৃষি প্রণোদনার আওতায় কৃষি অফিস থেকে সঠিক সময়ে বীজ ও সার দেওয়া হলে কৃষকদের আর্থিক চাপ ও হতাশা কিছুটা কমত।

তাহিরপুর বাজারের বীজ ডিলার সামায়ূন কবির বলেন, গত বছর শক্তি-২ ও ৭৭৭ জাতের ধানের দাম কম পাওয়ায় এবার কৃষকরা বিকল্প জাতের বীজের দিকে ঝুঁকছেন। বিএডিসির ৬৭ ও ৯২ জাতের বীজ এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫ থেকে ২০ টন বিক্রি হয়েছে। বাজারে নতুন আসা বিএডিসির ব্রি হাইব্রিড ধান-৮ জাতের চাহিদাও ভালো। এ জাতের প্রায় এক টন বীজ বিক্রি হয়েছে। এছাড়া সিনজেন্টার ১২০৩ জাতের বীজ প্রায় তিন টন বিক্রি হয়েছে। কৃষকদের মধ্যে এসব জাতের বীজের প্রতি ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে তাহিরপুর উপজেলার ২৩টি হাওরে ১৮ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বীজতলা তৈরির কাজ চলছে। ইতোমধ্যে প্রায় তিন থেকে চার হাজার হেক্টর জমিতে চারা উৎপাদনের চাহিদা অনুযায়ী বীজতলা তৈরির কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পুরো নভেম্বর মাসজুড়েই হাওরাঞ্চলে বীজতলা তৈরির কার্যক্রম চলবে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, এবার যথাসময়েই বোরো ধানের বীজতলা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, ধান রোপণের মৌসুমও যথাসময়ে শুরু হবে। প্রতিবছর কৃষি অফিস থেকে হাওরের বোরো চাষিদের মধ্যে বীজ ও সার বিতরণ করা হয়। তবে এ বছর বীজ ও সার বিতরণের বিষয়ে এখনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোনো নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হলে দ্রুত কৃষকদের হাতে বীজ ও সার পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
কলা কি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে!
জলবায়ু পরিবর্তন এবং মারাত্মক সব উদ্ভিদ রোগের আক্রমণে বিশ্বজুড়ে কলা চাষ এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। তবে গবেষকরা জানিয়েছেন, ক্যাভেন্ডিশ জাতের কলা এখন অস্তিত্বের লড়াই করলেও সংকট কাটিয়ে ফলটিকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এক নতুন আশার দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
কলা কি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে!
উৎপাদন বাড়লেও পুষ্টিমান হারাচ্ছে ফসল, যা বলছে গবেষকরা
আধুনিক নিবিড় কৃষি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মিলিত প্রভাবে বিশ্বব্যাপী খাদ্যশস্যের পুষ্টিগুণ দিন দিন কমতে কমতে ক্রমান্বয়ে তলানিতে ঠেকছে। গত কয়েক দশকে উৎপাদনমুখী চাষাবাদের কারণে শস্যের ফলন ও আকার বাড়লেও চাল, গম ও সবজিতে জিংক, আয়রন ও প্রোটিনের মতো জরুরি অণুপুষ্টির ঘনত্ব ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।  ফলে পেট ভরা খাবার পেয়েও প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের অভাবে কোটি কোটি মানুষ এক মারাত্মক ‘প্রচ্ছন্ন ক্ষুধা’ বা অদৃশ্য অপুষ্টির শিকার হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্য নীতিনির্ধারকদের সামনে এক নতুন বৈশ্বিক সংকট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। যুক্তরাজ্যের অলাভজনক বিজ্ঞান সংস্থা ডিপ সায়েন্স ভেঞ্চারস (ডিএসভি) এবং মার্ক লিওনার্ড ট্রাস্ট-এর যৌথ উদ্যোগে ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসের শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত ‘হলো হারভেস্ট’ (ফাঁপা ফসল) নামক একটি বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদনের পূর্ণ শিরোনাম হলো: ‘হলো হারভেস্ট: রিবিল্ডিং দ্য নিউট্রিশনাল ভ্যালু অব ক্রপস ইন অ্যান এজ অব আবান্ড্যান্ট ক্যালোরিজ’ (ফাঁপা ফসল: প্রচুর ক্যালোরির যুগে ফসলের পুষ্টিমান পুনর্গঠন)। নেদারল্যান্ডসের লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০২৬ সালের একটি সাম্প্রতিক মেটা-অ্যানালাইসিসে ৪৩টি খাদ্যশস্যের প্রায় ৬০ হাজারটি পুষ্টিগত পরিমাপ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বৃদ্ধির কারণে উদ্ভিদে শর্করা ও ক্যালোরির পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু প্রোটিন, জিংক ও আয়রনের মতো খনিজ গড়ে ৩.২ শতাংশ কমে যাচ্ছে। এমনকি কিছু বিশেষ ফসলে জিংকের পরিমাণ ৩৭.৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাওয়ার প্রমাণ মিলেছে।  সাম্প্রতিক এই গবেষণাগুলোর ভয়াবহ তথ্য কৃষি ও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক নিবিড় কৃষি পদ্ধতি, উচ্চ ফলনশীল জাতের একচেটিয়া চাষাবাদ এবং তীব্র জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্বব্যাপী প্রধান প্রধান খাদ্যশস্যের পুষ্টির মান ও ঘনত্ব (নিউট্রিয়েন্ট ডেনসিটি) আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। গত কয়েক দশকে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শস্যের গুণগত মানের চেয়ে পরিমাণের ওপর বেশি জোর দেওয়ায় উৎপাদন বাড়লেও উৎপাদিত খাদ্যের পুষ্টিগুণ ক্রমান্বয়ে তলানিতে ঠেকছে। ফলে পেট ভরার মতো পর্যাপ্ত খাবার বা ক্যালোরি পেলেও প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের অভাবে কোটি কোটি মানুষ ‘প্রচ্ছন্ন ক্ষুধা’ বা তীব্র অণুপুষ্টির ঘাটতির (মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ডেফিসিয়েন্সি) শিকার হচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুষ্টি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে এই সংকটের রূপ আরও স্পষ্ট। সর্বশেষ ‘জাতীয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সার্ভে’-র তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ শিশু এবং ৫৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নারী তীব্র জিংক বা দস্তার ঘাটতিতে ভুগছেন। প্রধান খাদ্য হিসেবে প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে চাল বা ভাত খাওয়া সত্ত্বেও মানুষের শরীরে জিংক ও আয়রনের মতো অত্যাবশ্যকীয় খনিজের এই ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। মূলত প্রথাগত উচ্চ ফলনশীল সাদা চালের পুষ্টি ঘনত্ব কমে যাওয়া এবং সুষম খাদ্যাভ্যাসের অভাবই এর অন্যতম প্রধান কারণ। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ)-এর দীর্ঘমেয়াদি তথ্য বিশ্লেষণ করে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. ডোনাল্ড ডেভিস ও তার দল ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক ঐতিহাসিক গবেষণায় দেখিয়েছিলেন, ১৯৫০ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে উৎপাদিত ৪৩টি বিভিন্ন ফসলে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, ভিটামিন সি এবং প্রোটিনের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। কৃষিবিজ্ঞানীরা একে ‘ডিলিউশন ইফেক্ট’ বলছেন; যেখানে আধুনিক শস্যের আকার ও ফলন বাড়লেও পুষ্টির ঘনত্ব আনুপাতিক হারে কমে যাচ্ছে। তাছাড়া রাসায়নিক সারের অত্যধিক ব্যবহার এবং নিবিড় চাষাবাদের ফলে মাটির গভীরে থাকা ‘মাইকোরাইজাল ছত্রাক’ ও উপকারী অণুজীবের নেটওয়ার্ক ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক মৃত্তিকা বিজ্ঞান সাময়িকীগুলোর গবেষণায় দেখা গেছে, এই অণুজীবগুলো উদ্ভিদের মূল বা শিকড়কে মাটি থেকে খনিজ পুষ্টি উপাদান শোষণে সরাসরি সাহায্য করে। এগুলো ক্ষতিগ্রস্ত থাকায় উদ্ভিদ তার প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান পাচ্ছে না। দেশের সরকারি সংস্থা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই)-এর বার্ষিক ও জাতীয় ভূমি অবক্ষয় প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিবিড় চাষাবাদের কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৭৬.২ শতাংশ আবাদি জমি মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার পুষ্টিহীনতার শিকার। সংস্থাটির দেশব্যাপী মৃত্তিকা পুষ্টি মানচিত্রের তথ্য বলছে, দেশের অর্ধেকেরও বেশি ফসলি জমির মাটিতে জৈব উপাদানের পরিমাণ আদর্শ মাত্রার চেয়ে কমে ১ থেকে ১.৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে এবং প্রায় সাড়ে ৫ মিলিয়ন হেক্টর চাষযোগ্য জমির মাটিতে দস্তা (জিঙ্ক), বোরন ও সালফারের মতো জরুরি অণুপুষ্টির তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এদিকে আন্তর্জাতিক পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, ১৯৬০ সালের পর উদ্ভাবিত রুটি তৈরির গম বা ব্রেড-হুইটের তিন-চতুর্থাংশেরও কম জাত জিংকের ন্যূনতম আদর্শ মাত্রা পূরণ করতে পারছে। এই পুষ্টিহানি মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসকে অকার্যকর করে তুলছে। যেমন, আজ থেকে ৬০ বছর আগের একটি গাজর থেকে যে পরিমাণ পটাশিয়াম পাওয়া যেত, এখনকার গাজরে তার অর্ধেক পাওয়া যাচ্ছে, অর্থাৎ একই পুষ্টি পেতে একজনকে এখন দ্বিগুণ পরিমাণ গাজর খেতে হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও বিভিন্ন পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, খাদ্যশস্যের পুষ্টিমান কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানবদেহে। এর ফলে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং সাব-সাহারা আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গর্ভবতী নারী ও শিশুদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা, হাড় ক্ষয় এবং অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগ বাড়ছে। পর্যাপ্ত খাবার খাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতের ওপর বিশাল আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে। এটি ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি-২) ‘ক্ষুধা মুক্তি ও পুষ্টি নিশ্চিতকরণ’ এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথে বড় অন্তরায়। এই অপুষ্টির সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ইতিমধ্যে বায়োফর্টিফাইড বা জিঙ্কসমৃদ্ধ চালের জাত (যেমন- ব্রি ধান-৭৪, ব্রি ধান-১০০) উদ্ভাবন করেছে, যা মানুষের শরীরে জিংকের দৈনিক চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করতে সক্ষম। তবে ব্রির বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, ভোক্তা পর্যায়ে অতিরিক্ত ছাঁটা ও চকচকে ‘মিনিকেট’ চাল খাওয়ার প্রবণতার কারণে চাল মিলিং ও পলিশিংয়ের সময় এর উপরিভাগে থাকা জিংক ও আয়রনের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। ফলে পুষ্টিসমৃদ্ধ জাত চাষের পাশাপাশি ভোক্তাদের আচরণ ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করাও জরুরি। ব্রির গবেষকরা এখন জিংক ও আয়রনের দ্বৈত সুবিধাযুক্ত আরও উন্নত জাতের ‘হেলদিয়ার রাইস’ উদ্ভাবনের লক্ষ্যে কাজ করছেন, যাতে একটি জাত থেকেই শরীরের অন্তত ৮০% জিংক এবং ৫০% আয়রনের চাহিদা মেটানো সম্ভব হয়। বিশেষজ্ঞ মহল এই সংকট মোকাবিলায় অবিলম্বে প্রচলিত কৃষি নীতিতে আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা শুধু মোট ফলন বা ওজনের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং ফসলের পুষ্টির ঘনত্বের ওপর ভিত্তি করে কৃষকদের মূল্যায়ন ও প্রণোদনা দেওয়ার কথা বলছেন। পাশাপাশি মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জৈব সার, অণুজীব ইনোকুল্যান্ট এবং শস্য পর্যায় পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছেন তারা। এছাড়া প্রথাগত হাইব্রিড ধান-গমের পাশাপাশি জিংক ও আয়রনসমৃদ্ধ স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী শস্য ও মিলেট চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন। নীতিনির্ধারকদের মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কেবল খাদ্যের সহজলভ্যতা বা ক্যালোরি নিশ্চিত করা নয়, বরং পুষ্টিকর ও গুণগত মানসম্পন্ন খাদ্য নিশ্চিত করাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। আরটিভি/এসআর
উৎপাদন বাড়লেও পুষ্টিমান হারাচ্ছে ফসল, যা বলছে গবেষকরা
আরও পড়ুন
সুনামগঞ্জে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৩ বাড়ি পুড়ে ছাই
পুলিশের ওপর হামলা ও ওসিকে হত্যার হুমকি, মা-বাবা-বন্ধুসহ কারাগারে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা প্রিন্স
পুলিশের ওপর হামলা, নিষিদ্ধ দলের নেতাসহ গ্রেপ্তার ৮
সুনামগঞ্জে প্রতিপক্ষের সুলফির আঘাতে বৃদ্ধ নিহত