ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী ও আত্মজা সুবর্ণচর

নূরুল হক

প্রকাশ : ১৩ মে ২০২৬, ১১:০৮ পিএম
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী উদযাপনে কবি সাহিত্যিকগণ : ছবি আরটিভি

চট্টগ্রাম শহর ছাড়ার আগে সেদিন বিকেলের আকাশটা ছিল অদ্ভুত রকমের নরম। পাহাড় আর সমুদ্রঘেরা শহরটির ওপর যেন এক ধরনের অদৃশ্য বিষণ্নতা ভাসছিল। অথচ আমার ভেতরে তখন ঠিক উল্টো অনুভূতি। মনে হচ্ছিল, বহুদিন পর কোনো অচেনা আলোর দিকে যাত্রা করছি। গন্তব্য নোয়াখালী, আরও নির্দিষ্ট করে বললে সুবর্ণচর। উদ্দেশ্য একটাই, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মজয়ন্তী উদযাপন।

ভ্রমণের আনন্দ অনেকখানি বেড়ে যায় যখন পাশে একজন হৃদয়বান সহযাত্রী থাকেন। আমার সেই সফরের ষোল কলা পূর্ণতা পেয়েছিল প্রাচীন বন্ধু কবি আন্না পুনমকে সঙ্গে পেয়ে।

আন্না পুনম।
তাকে নিয়ে কী আর লেখা যায় এখানে, যেখানে প্রতিদিন অজস্র মানব হৃদয়ের মধ্যখানে রচিত হয় এক একটা কবিতা এবং তার হৃদয়ে চিত্রিত হয় মানবতার শিলালিপি।
প্রকৃত নাম ইসরাত নাসিমা হাবিব। নোয়াখালী জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন তিনি। সরকারি এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নিতে দুদিনের জন্য চট্টগ্রামে এসেছিলেন। সেই ব্যস্ততার মাঝেও তাঁর কণ্ঠে ছিল অদ্ভুত উচ্ছ্বাস। যেন তিনি নোয়াখালীর মত একটি প্রতিকূল স্থানে কেবল একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করছেন না, বরং কোনো সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের স্বপ্ন বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এ স্বপ্নটি দীর্ঘদিন ধরে তার মানসপটে লালিত হচ্ছিল। একটু একটু করে স্বপ্নগুলো বড় হচ্ছিল।
রোদ্দুরের ব্যানারে এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তত্ত্বাবধানে সুবর্ণচরে অনুষ্ঠিত হবে তার সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন, রবীন্দ্রজয়ন্তী। মূলত তাঁর আমন্ত্রণেই আমার এ যাত্রা।

বিকেলে তিনটায় আমরা চট্টগ্রাম থেকে রওনা হলাম। শহরের যানজট পেছনে ফেলে গাড়ি যখন মহাসড়কে উঠল, জানালার বাইরে দ্রুত বদলে যেতে লাগল দৃশ্যপট। পাহাড়ের শরীর ধীরে ধীরে সমতলে মিশে গেল। কোথাও বিস্তীর্ণ সবুজ, কোথাও ধানের ক্ষেতে শেষ বিকেলের আলো, কোথাও নদীর শীর্ণ শরীরে অপরাহ্ণের ক্লান্ত ছায়া। আন্না পুনম জানালার পাশে বসে ছিলেন। তাঁর চোখে তখন যেন এক ধরনের তৃপ্তি। মাঝে মাঝে তিনি অনুষ্ঠান নিয়ে কথা বলছিলেন, আবার হঠাৎ চুপ হয়ে দূরে তাকিয়ে থাকছিলেন। মনে হচ্ছিল, আমরা কোনো এক গভীর সাংস্কৃতিক অভিযাত্রায় পা বাড়িয়েছি।

আরও পড়ুন

সন্ধ্যার আলো নিভে এলে আমরা নোয়াখালী পৌঁছাই। তার একটু পরেই ঢাকা থেকে এসে পৌঁছালেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক মনি হায়দার , মোখলেস মুকুল ও সরকার আব্দুল মান্নান। চিত্রশিল্পী শিশির মল্লিক পূর্বাহ্নেই পৌঁছেছিলেন সেখানে । এত পরিচিত সাহিত্যিক ও শিল্পী একসঙ্গে হলে স্বাভাবিকভাবেই পরিবেশ অন্যরকম হয়ে ওঠে। মনে হয়, শব্দ, রঙ আর কল্পনারা একই টেবিলে এসে বসেছে।

আমাদের আবাসস্থল হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল গ্রীন হাইট নামের একটি তিন তারকা মানের আবাসিক হোটেল। দীর্ঘপথের ক্লান্তি সত্ত্বেও কারও চোখে ঘুম ছিল না। কারণ ভ্রমণের আসল সৌন্দর্য অনেক সময় গন্তব্যে নয়, বরং মানুষে মানুষে তৈরি হওয়া সম্পর্কের ভেতর লুকিয়ে থাকে।
রাত নামার আগেই স্থানীয় প্রধান শিক্ষক ও আলোচিত কবি ফিরোজ শাহ আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন। সুবর্ণচর থেকেই তিনি ছুটে এসেছেন। তাঁর চোখেমুখে ছিল অতিথিদের প্রতি আন্তরিক দায়িত্ববোধ। তার প্রস্তাবেই গাড়ি চালক আমাদের নিয়ে যায় সোনাইমুড়ি উপজেলায় অবস্থিত ঐতিহাসিক বজরা শাহী মসজিদে।

নোয়াখালীর নরম রাতের ভেতর দিয়ে যখন গাড়ি এগোচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল সময় যেন ধীরে ধীরে উল্টো দিকে হাঁটছে। কিছুক্ষণ পর সামনে উদ্ভাসিত হলো সেই ঐতিহাসিক স্থাপনা, বজরা শাহী মসজিদ। ১৭৪১ খ্রিষ্টাব্দে জমিদার আমানউল্লাহ নির্মাণ করেছিলেন মসজিদটি। মুঘল স্থাপত্যের অনুপম সৌন্দর্যে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ইমারত যেন কালের সাক্ষী।
মসজিদের গম্বুজগুলো অন্ধকারের আলোয় ধূসর-সোনালি হয়ে উঠেছিল। পুরনো দেয়ালে সময়ের ক্ষতচিহ্ন থাকলেও তার ভেতরে এক ধরনের রাজকীয় নীরবতা বিরাজ করছিল। আমরা ভেতরে প্রবেশ করতেই শীতল বাতাস মুখে এসে লাগল। মনে হলো, কয়েকশো বছরের ইতিহাস এখনও নিঃশব্দে শ্বাস নিচ্ছে।

মনি হায়দার মসজিদের খিলান ছুঁয়ে বললেন, ‘ নূরুল, ইতিহাস কখনও মরে না, শুধু মানুষের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকে।’
কথাটি শুনে আমাদের সবার ভেতর এক ধরনের নিস্তব্ধতা নেমে এলো। এর মধ্যে আন্না পুনমের গাড়ি চালক আমাদের অনেকগুলো ছবি উঠালেন।
রাতে গ্রীন হাইটে ফিরে দীর্ঘ আড্ডা জমে উঠল। কবিতা, রাজনীতি, স্মৃতি, গ্রামবাংলা, রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, সমকালীন সাহিত্য, এমনকি হারিয়ে যাওয়া শৈশবও উঠে এলো আলোচনায়। বাইরে তখন নিস্তব্ধ রাত। কিন্তু আমাদের টেবিলে যেন একের পর এক শব্দের প্রদীপ জ্বলছিল।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই দ্রুত প্রাতরাশ শেষ করে আমরা প্রস্তুত হলাম সুবর্ণচরের উদ্দেশে। আন্না পুনম সত্যিকার অর্থেই আমাদের একজন দলনেতা। তাঁর চোখেমুখে ছিল ব্যস্ততা, কিন্তু সেই ব্যস্ততার ভেতরেও এক ধরনের শান্ত দীপ্তি।
গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের সেই বিস্ময়কর ভূখণ্ডের দিকে। বাংলাদেশের সুবর্ণভূমি, সুবর্ণচর।
এর মধ্যে আমি লিখে ফেললাম সুবর্ণচর নিয়ে একটি কবিতা।

পলিমাটি ঝাড়বন সুবিন্যস্ত সবুজ প্রান্তর,
সমুদ্রমোহনা ঘেঁষা আত্মজা হে সুবর্ণচর!

আরও পড়ুন

নামের মধ্যেই যেন সোনালি বাতাসের গন্ধ আছে। রাস্তার দুই পাশে বিস্তীর্ণ চরভূমি। কোথাও সবুজ ধানক্ষেত, কোথাও নারকেলগাছের সারি। বাতাসে লবণাক্ত সমুদ্রের গন্ধ। যেনো পৃথিবীর শেষ প্রান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। গাড়ির অভ্যন্তরে বসা কথা সাহিত্যিক মুখলেস মুকুলের দরাজ কণ্ঠে ভেসে আসছিল রবীন্দ্র সংগীত। মুকুল যে এত সুন্দর রবীন্দ্র সংগীত পরিবেশন করতে পারে সেটা আমার বোধগম্য ছিলনা। সরকার আব্দুল মান্নান মাঝে মধ্যে জীবনানন্দ দাশ আবৃত্তি করছিল। গাড়ির একেবারে পিছনে বসা ছিলেন আমাদের আরেক মধ্যমণি সঞ্চিতা দাস। আন্না পুনমের কাছে শুনেছিলাম সঞ্চিতা দাসের রবীন্দ্র সংগীত প্রেমের কথা। তিনি নাকি খুব ভালো রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী, এক কথায় রবীন্দ্র সংগীত বিশেষজ্ঞ বটে। অনুরোধ করলাম রবীন্দ্র সংগীত শোনানোর জন্য। বললেন, গলা বসে গেছে তাই গান পরিবেশন সম্ভব নয় এ কন্ঠে। তারপরও যে একটি রবীন্দ্র সংগীত তিনি শোনালেন, তা ছিল এক কথায় অপূর্ব। সঞ্চিতা দাসও এডিপিইও নোয়াখালী জেলা।

অনুষ্ঠান শুরু হতে তখনও অনেক দেরি। তাই আমরা প্রথমে চলে গেলাম বিএডিসি এলাকায়। সুবর্ণচরের সেই বিস্তীর্ণ কৃষিজমি, নারকেল বাগান আর ঝাউবন শোভা সত্যিই ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন। বাতাসে দুলতে থাকা গাছগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিল তারা সমুদ্রের গোপন ভাষায় কথা বলছে পরস্পর। সেখানে দাঁড়িয়ে আমি অনুভব করলাম, প্রকৃতি আসলে মানুষের চেয়ে অনেক বড় শিল্পী।

অদূরে অজস্র শুভ্র হাঁস ভেসে বেড়াচ্ছিলেন সরোবরে । তাদের জলকেলির শব্দ বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছিল। এমন দৃশ্য শহুরে জীবনে কল্পনাও করা যায় না।

সুবর্ণচরের গর্ব ‘সাগরিকা’ নামের একটি উন্নতমানের এনজিও, তারাও নেমেছিলেন আমাদের সেবায়। সেখানেই আমাদের দুপুরের আহারের ব্যবস্থা করেছিলেন বিশিষ্ট সমাজসেবক রাশেদ ইকবাল। গ্রামীণ স্বাদের খাবার, আন্তরিক পরিবেশনা আর তার নির্মল হাসি পুরো পরিবেশকে অন্যরকম করে তুলেছিল। রাশেদ ভাই আগের দিন থেকেই সার্বক্ষণিক আমাদেরকে ছায়ার মত ঘিরে রেখেছিলেন। বর্তমানে এ আকাল বার্ধক্য সময়ে ভ্রাতৃত্ববোধের যে অভাব সেটা অনেকটা পূরণ হয়েছে রাশেদ ভাইয়ের আন্তরিকতায়। আরো অনেকের মধ্যেই সেই ভ্রাতৃত্ব সুবর্ণচরে আমরা দেখতে পেয়েছি। বিকেল চারটার কিছু আগে আমরা পৌঁছে গেলাম সুবর্ণচর সৈকত কলেজ অডিটোরিয়ামে।

সেখানে তখন উৎসবের আবহ। শিশুরা রবীন্দ্রসংগীতের মহড়া দিচ্ছে। কেউ আবৃত্তি করছে। কারও হাতে আলপনার রঙ। লাল-সাদা শাড়িতে সজ্জিত তরুণীরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুরো পরিবেশে এক ধরনের পবিত্র সাংস্কৃতিক আবেশ। আমি হঠাৎ ভাবলাম, রবীন্দ্রনাথ কখনও সুবর্ণচরে আসেননি। অথচ তাঁর সৃষ্টি, তাঁর ভাষা, তাঁর দর্শন আজ এই প্রত্যন্ত চরাঞ্চলের শিশুদের হৃদয়ে আলো জ্বালাচ্ছে। এটাই তো একজন মহাকালের কবির প্রকৃত বিজয়। আর সুবর্ণচরের জন্য একটা ঐতিহাসিক ঘটনার তো বটেই।
অনুষ্ঠান শুরু হলে একে একে বক্তব্য, আবৃত্তি, গান, আলোচনা চলতে থাকে। শিশুরা যখন সমবেত কণ্ঠে গাইল, ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে’, তখন সত্যিই মনে হচ্ছিল এই গান শুধু সংগীত নয়, এটি বাঙালির আত্মার আহ্বান।

আমার বক্তব্য দেওয়ার সময় আমি চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা গভীর মনোযোগে শুনছে। তাদের চোখে বিস্ময়, কৌতূহল, স্বপ্ন। আমি যখন বলেছিলাম, আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে। সমস্বরে শিশুরা বাকি অংশটুকু হয়ে পড়তে থাকলেন দরাজ গলায়। বলেছিলাম, ‘রবীন্দ্রনাথ কেবল একজন কবি নন। তিনি আমাদের ভাষার আলো, আমাদের মানবতার শিক্ষক।’

কথাগুলো বলার সময় নিজেকেও যেন নতুন করে আবিষ্কার করছিলাম। সন্ধ্যার দিকে অনুষ্ঠান শেষ হলো। কিন্তু আমাদের ভেতরে যে আলো জ্বলে উঠেছিল, তা নিভে যায়নি।

তারপর ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। সন্ধ্যার আকাশে হঠাৎ দেখা গেল এক রহস্যময় আলোকবর্তিকা। প্রথমে মনে হলো উল্কাপিণ্ড। পরে সেটি ধীরে ধীরে দীর্ঘ আলোকরেখায় পরিণত হলো। পুরো আকাশ জুড়ে যেন আগুনের সরু নদী বয়ে যাচ্ছে।

আমরা সবাই বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম। কেউ কথা বলছিল না। আলোকরেখাটি ধীরে ধীরে কক্সবাজারের দিক বরাবর অগ্রসর হয়ে মুহূর্তের মধ্যে মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। জীবনে প্রথম এমন দৃশ্য দেখলাম। আমার বন্ধু মোখলেস মুকুল আমার কানে কানে বললেন, এটা এক গভীর ষড়যন্ত্রের আলো হতে পারে।

আরও পড়ুন

পরে শুনলাম উপকূলীয় প্রায় সব জেলার মানুষই সেই রহস্যময় আলো দেখেছে। কেউ বলল মহাজাগতিক ঘটনা, কেউ বলল উপগ্রহের ধ্বংসাবশেষ, কেউ বলল আল্লাহর অদ্ভুত নিদর্শন। কিন্তু আমাদের কাছে সেটি হয়ে রইল ভ্রমণের এক অলৌকিক সমাপ্তি।
রাতের ফেরার পথে আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম।
আমার লেখা সেই কবিতার শেষ দুটি লাইন নিন্মে দেওয়া হলো

মোহন মেঘনাকুল অন্ধকার পথভোলা জল
কতিপয় কাব্যপ্রেমী কৃতিমুখ ভীষণ চঞ্চল।।

দূরে চরাঞ্চলের অন্ধকার। কোথাও ক্ষীণ আলো। কোথাও নদীর বুক। কোথাও বাতাসে দুলছে গাছের ছায়া। মনে হচ্ছিল, এই সফর কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়। এটি ছিল মানুষের কাছে ফিরে যাওয়ার যাত্রা। সংস্কৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার যাত্রা। রবীন্দ্রনাথের মানবিক চেতনার কাছে ফিরে যাওয়ার যাত্রা।
আমরা অতিথি হয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু ফিরে এলাম আত্মীয় হয়ে।

সুবর্ণচরের মানুষ যে আন্তরিকতা, সম্মান ও ভালোবাসা দিয়ে আমাদের বরণ করে নিয়েছে, তা সহজে ভোলার নয়। আর কবি ফিরোজ শাহ। যার কথা আমাকে কবি আন্না পুনম আগেই বলেছিলেন। আমার বিবেচনায় কবিরাই প্রকৃত অর্থে মানবিক হয়। সেটা আবারও প্রমাণ হল ফিরোজ শাহ এর নিখাদ আন্তরিকতা স্পর্শে।
সেখানে আমরা শুধু রবীন্দ্রজয়ন্তী উদযাপন করিনি, বরং প্রত্যক্ষ করেছি সংস্কৃতির সেই অনির্বাণ শক্তিকে, যা প্রান্তিক জনপদকেও আলোকিত করে তুলতে পারে।

এখনও চোখ বন্ধ করলে দেখি, সুবর্ণচরের বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে রবীন্দ্রসংগীত। নারকেলবাগানের ফাঁক দিয়ে সন্ধ্যার আলো নেমে আসছে। দূরে শিশুদের কণ্ঠে কবিতা। আর আকাশের বুক চিরে ভেসে যাচ্ছে সেই রহস্যময় আলোকরেখা।

মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য হয়তো ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মানুষের হৃদয়ে জেগে থাকা সংস্কৃতি ও স্মৃতির আলো কখনও নিভে যায় না।

লেখক: কবি ও সম্পাদক

আরটিভি/এমএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার অ্যান কারসন
সাহসী ও উদ্ভাবনী সাতিহ্যকর্মের জন্য এ বছর নোবেলে পেয়েছেন কানাডার লেখক অ্যান কারসন। সৃজনশীল সংলাপের মাধ্যমে সমসাময়িক সাহিত্যে প্রাচীন ঐতিহ্যকে নতুন করে ফুটিয়ে তোলা এবং তার উদ্ভাবনী ও বৈচিত্র্যময় লেখার আধুনিক সাহিত্যে নতুন মাত্রা যোগ করায় তাকে এ বছর নোবেল দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সুইডিশ একাডেমি।
সাহিত্যে নোবেল পেলেন কানাডার অ্যান কারসন
নজরুলের দর্শন আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক অবক্ষয়ের মহৌষধ: মার্কিন গবেষক
কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য ও রাজনৈতিক দর্শনকে আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক খণ্ডন এবং কাঠামোগত নৈতিক অবক্ষয় নিরাময়ের এক চূড়ান্ত রূপরেখা হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রখ্যাত মার্কিন রাজনীতিবিজ্ঞানী ও ইমেরিটাস অধ্যাপক উইনস্টন ই. ল্যাংলি। দীর্ঘ তিন দশকের গভীর গবেষণার ওপর ভিত্তি করে তিনি নজরুলের এই বৈশ্বিক উপযোগিতা তুলে ধরেন।
নজরুলের দর্শন আধুনিক ভূ-রাজনৈতিক অবক্ষয়ের মহৌষধ: মার্কিন গবেষক
‘বাংলা একাডেমি ফন্ট’-এর উদ্বোধন
‘তথ্য-প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধকরণ’ প্রকল্পের আওতায় প্রস্তুতকৃত ‘বাংলা একাডেমি ফন্ট’-এর উদ্বোধন করা হয়েছে।
‘বাংলা একাডেমি ফন্ট’-এর উদ্বোধন
বাংলাদেশ নজরুল আবৃত্তি পরিষদ-এর নতুন কমিটি ঘোষণা
বাংলাদেশ নজরুল আবৃত্তি পরিষদ-এর নতুন নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে সভাপতি শায়লা আহমেদ ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সৈয়দ আল জাবের নির্বাচিত হয়েছেন। পরবর্তী দুই বছর অর্থাৎ ২০২৬–২০২৮ মেয়াদে এ নির্বাহী কমিটি গঠন করা হয়।
বাংলাদেশ নজরুল আবৃত্তি পরিষদ-এর নতুন কমিটি ঘোষণা
নজরুলের অমর সৃষ্টি নিয়ে বিশেষ আয়োজন ‘চিরন্তন: আমারে দেব না ভুলিতে’ 
কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে রোববার (৪ অক্টোবর) মেলবোর্নের ড্যানডেনংয়ের ড্রাম থিয়েটারে ‘চিরন্তন: আমারে দেব না ভুলিতে’ নামে একটি স্মরণানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। মেলবোর্ন সময় বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত (বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২টা থেকে ০২:৩০টা পর্যন্ত) আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রায় ৩৬০জন দর্শক উপস্থিত ছিলেন। মেলবোর্নপ্রবাসী নজরুলসংগীতশিল্পী ও সাংস্কৃতিক কিউরেটর আদিলা নূরের পরিকল্পনা ও সৃজনশীল নির্দেশনায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে গান, কবিতা, নৃত্য ও নাটকের মাধ্যমে বিদ্রোহী কবির সৃষ্টিশীলতা ও মানবিক দর্শনকে তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানটির অন্যতম আকর্ষণ ছিল নজরুল রচিত নাটক ‘ঝিলিমিলি’ ও গীতিনাট্য ‘কাবেরী তীরে’-এর মঞ্চায়ন। অস্ট্রেলিয়ায় এই প্রথমবারের মতো নাটক দুটির মঞ্চায়ন হলো। এর মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটি বিশেষ তাৎপর্য অর্জন করে। অনুষ্ঠানের সংগীত পরিচালক আদিলা নূর বলেন, এই আয়োজনের মাধ্যমে আমরা নজরুলের সৃষ্টিশীলতার বহুমাত্রিক দিকগুলো তুলে ধরতে চেয়েছি। আমাদের প্রত্যাশা, এই উদ্যোগের মাধ্যমে তার সাম্য, ভালোবাসা ও মানবতার চিরন্তন বার্তা নতুন প্রজন্মকে আলোড়িত করবে। সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রাখা এবং তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ। শেকড় থেকে দূরে বসবাসের কারণে আমাদের জন্য সেটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব শুরু হয় ‘সুর ও বাণীর অর্ঘ্য’ দিয়ে। এতে নজরুলের নির্বাচিত চারটি গান, কবিতা ও নৃত্য পরিবেশিত হয়। স্থানীয় নৃত্যশিল্পী ক্রিস ও অনিলের দ্বৈত নৃত্যের মধ্য দিয়ে পর্বটি শুরু হয়। এ পর্বের বিশেষ আকর্ষণ ছিল নজরুলের কবিতা ‘অভিশাপ’ ও গান ‘শূন্য এ বুকে’-এর সমন্বয়ে একটি বিশেষ পরিবেশনা, যেখানে তন্বীপ্রিয়া আবৃত্তি এবং আদিলা নূর সংগীত পরিবেশন করেন। ‘ফুলের জলসায় নীরব কেন কবি’ গানের মধ্য দিয়ে পর্বটির সমাপ্তি ঘটে। ২০২৩ সালের নজরুল পুরষ্কারপ্রাপ্ত অধ্যাপক ইরশাদ আহমেদ শাহীন অনুষ্ঠানে নজরুলের জীবন, সাহিত্য ও দর্শনের ওপর মূল বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, নজরুল শুধু বিদ্রোহী কবি ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানবতা, সাম্য ও সামাজিক সম্প্রীতিরও শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। বাংলাদেশের বাইরে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর দর্শন পৌঁছে দিতে ‘চিরন্তন’-এর মতো আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে মঞ্চস্থ হয় নজরুলের গীতিনাট্য ‘ঝিলিমিলি’। বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব বৃন্দাবন দাসের নির্দেশনায় এতে অভিনয় করেন বৃন্দাবন দাস, শাহানাজ খুশী, দিব্য জ্যোতি ও সৌতি মালবিকা। মেলবোর্নপ্রবাসী সংগীতশিল্পী অর্পণ ও আদিলা নূরের সংগীত পরিবেশনা নাট্য পরিবেশনাটিকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে মঞ্চস্থ হয় ‘কাবেরী তীরে’ কাবেরী নদীর তীরে গড়ে ওঠা এক প্রেমের গল্পকে কেন্দ্র করে রচিত নজরুলের গীতিনাট্য এটি। মেলবোর্নপ্রবাসী পূরবী চৌধুরীর নির্দেশনা ও কোরিওগ্রাফিতে পরিবেশিত এ আয়োজনে অংশ নেন একদল নৃত্যশিল্পী। একইসাথে, নজরুলসংগীতশিল্পী অজয় রায় ও আদিলা নূর সংগীত পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠান উপলক্ষে একটি স্মারক সংকলনও প্রকাশিত হয়। এতে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের লেখা স্থান পায়। তাদের মধ্যে রয়েছেন সংগীতশিল্পী, শিক্ষক ও সংগঠক খায়রুল আনাম শাকিল; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের চেয়ারপারসন ও সহযোগী অধ্যাপক ড. প্রিয়াঙ্কা গোপ; সংগীতশিল্পী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. লীনা তাপসী খান; ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়ার কলা ও সংস্কৃতি অনুষদের ডিন এবং ২০২৩ সালের নজরুল পুরষ্কারপ্রাপ্ত অধ্যাপক ইরশাদ আহমেদ শাহীন; আন্তর্জাতিক উন্নয়নকর্মী, শিক্ষাবিদ ও রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী ড. চঞ্চল খান; এবং ছায়ানটের শিক্ষক ও সংগীতশিল্পী শারমিন সাথী ময়না। অনুষ্ঠানটি দর্শকদের উচ্ছ্বসিত করতালি ও স্ট্যান্ডিং ওভেশনের মাধ্যমে প্রশংসিত হয়। নজরুলের সৃষ্টির চিরকালীন প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরার পাশাপাশি প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের বাঙালিদের সঙ্গে তাদের সাংস্কৃতিক শেকড়ের সংযোগ আরও দৃঢ় করার বার্তাও উঠে আসে। আরটিভি/এসকে
নজরুলের অমর সৃষ্টি নিয়ে বিশেষ আয়োজন ‘চিরন্তন: আমারে দেব না ভুলিতে’ 
আরও পড়ুন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবিতে কালি দিতে গিয়ে নারীসহ আটক ৪
আজ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম প্রয়াণবার্ষিকী
‘আমাদের এমন সমাজ গড়তে হবে, যেখানে মাদক, অপশক্তি ও ফ্যাসিবাদ থাকবে না’
সাহিত্যের সর্বক্ষেত্রে বিশ্বকবির বিচরণ ছিল দৃঢ়: মির্জা ফখরুল