
দেশের বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান ১০৩তম জন্মবার্ষিকী আজ। চিত্রকর্মের ভিন্নধর্মী বিষয় ও ভাবনা, ব্যতিক্রমী জীবনযাপন, দেশে-বিদেশে বিপুল জনপ্রিয়তা—সব মিলিয়ে জীবদ্দশায়ই কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। তার শিল্পের বিষয় ও জীবনদর্শন তাকে সমকালীন শিল্পীদের চেয়ে আলাদা পরিচয় দিয়েছিল।
মৃত্যুর পর তার শিল্পকর্ম ও জীবনচর্চা স্বতন্ত্র শিল্প-আন্দোলনে আরো বিস্তৃত হয়েছে। আজ ১০ আগস্ট সুলতানের ১০৩তম জন্মদিন। জন্মস্থান নড়াইল, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নানা আয়োজনে বাংলার মাটি ও মানুষের গুণী এই শিল্পীকে স্মরণ করা হবে।
১৯২৩ সালের এই দিনে নড়াইলের মাছিমদিয়া গ্রামে জন্ম নেন শেখ মোহাম্মদ সুলতান।
শৈশবে পরিবারের মানুষ তাকে ‘লাল মিয়া’ নামে ডাকতেন। বাবা শেখ মেছের আলী ছিলেন রাজমিস্ত্রি। বাবার সঙ্গে নির্মাণকাজে যেতে যেতে ছোটবেলায় ভবন, মানুষের শরীর ও শ্রমের দৃশ্য আঁকার প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে পাঁচ বছর পড়াশোনার পর তিনি বাবার কাজে যুক্ত হন।
শিল্পশিক্ষার আকাঙ্ক্ষা তাকে ১৯৩৮ সালে কলকাতায় নিয়ে যায়। স্থানীয় জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ রায়ের আর্থিক সহায়তায় সেখানে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও শিল্পসমালোচক শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সহযোগিতায় গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টে পড়ার সুযোগ পান। তবে তিন বছর পর সেই শিক্ষা অসমাপ্ত রেখেই বেরিয়ে আসেন। শুরু হয় তার স্বাধীনভাবে শিল্পচর্চা ও ভ্রমণের জীবন।
১৯৪৬ সালে সিমলায় তার প্রথম প্রদর্শনী হয়।
দেশভাগের পর কিছুদিন কাশ্মীরে থেকেছেন। ১৯৫১ সালে যান করাচিতে এবং সেখানে একটি স্কুলে শিল্পশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। এর আগে ১৯৫০ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগো ও বস্টনে তার কাজ প্রদর্শন করেন। পরে লন্ডনেও তার ছবি প্রদর্শিত হয়।
বিশ্বশিল্পের সেই বিস্তৃত পরিসর শেষ পর্যন্ত তাকে নিজের মাটি থেকে দূরে সরাতে পারেনি। ১৯৫৩ সালে নড়াইলে ফিরে এসে চিত্রা নদীর তীরের জীবনকেই নিজের শিল্প ও অস্তিত্বের কেন্দ্র করে নেন। শিশুদের জন্য শিক্ষা ও সৃজনশীলতার পরিবেশ তৈরিতেও তিনি উদ্যোগী হন। শেষ জীবনে নড়াইলে ‘শিশুস্বর্গ’ ও ‘চারুপীঠ’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তার সেই স্বপ্নের কিছুটা বাস্তব রূপ পায়। সুলতানের কৃষক বাস্তবের অনুলিপি নয়। তার শিল্পে তা এক ধরনের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার রূপ। তার বিশাল পেশিবহুল কৃষক-চরিত্রকে বাস্তবের ক্ষীণকায় কৃষক-জেলের বিপরীতে প্রতীকী এক স্বপ্নের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়। একই সঙ্গে গ্রামীণ জীবনের শোষণ, সহিংসতা ও বঞ্চনার বাস্তবতাও তার শিল্পে অনুপস্থিত নয়। এই ভাবনার শক্তিশালী উদাহরণ তার আঁকা ‘প্রথম বৃক্ষরোপণ’ (১৯৭৫) ও ‘চরদখল’ (১৯৭৬)। পরবর্তী সময়ের উল্লেখযোগ্য কাজ ‘ফসল কাটা’ (১৯৮৬) এবং ‘Fishing-3’ (১৯৯১) শিল্পকর্মে কৃষক, শ্রম, প্রকৃতি ও জীবনের সম্পর্ক ফিরে এসেছে।
১৯৭৬ সালে ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে তার প্রথম একক প্রদর্শনী হয়। এর পরই দেশের শিল্পমহলে তার কাজ নতুন করে আলোচনায় আসে। স্বীকৃতিও আসে ধারাবাহিকভাবে-১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার। তবু খ্যাতি তাকে শহুরে শিল্পজগতের স্থায়ী বাসিন্দা করে তুলতে পারেনি। নড়াইল, চিত্রা নদী, শিশু, পশুপাখি এবং সাধারণ মানুষকে ঘিরেই থেকেছে তার জীবন। ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোরে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
আরটিভি/ এসকেডি




