খুব বেশিদিন আগের কথা না, অতএব বিশ্বাসযোগ্য। এখনও গ্রাম—বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিছু কিছু পরিবার হাজার বর্ষীয় অশ্বথ তরুর সঙ্গে জন্ম—মৃত্যু, বিবাহ—বিভ্রাট, রক্তপাত ইত্যাদি বিশেষায়িত ঘটনার সঙ্গে মাটির নিরীক্ষার মাধ্যমে বিদ্যমান, যাদেরকে জমিদার বলে খ্যাত করার অবকাশ নেই, আবার গ্রাম্য জীবনে সৃষ্টিকর্তার সাক্ষাৎ প্রতিনিধি হিসেবে সম্মান না করেও উপায় নেই। তেমনি—ই একটি পরিবার আজ সত্য—মিথ্যায় আভাষিত এবং কৃত্রিমতায় সজ্জিত রঙ্গমঞ্চে সঞ্চালিত পুত্তলিকার মাধ্যমে আমাদের দৃষ্টি বিভ্রম ঘটাতে যাচ্ছে, যার নাম সরকার পরিবার।
বগুড়ার ধুনট উপজেলার কালেরপাড়া গ্রামের বিশাল চাতালওয়ালা বাড়িটাই হলো সরকার বাড়ি। উপজেলা থেকে সচারচর কোনো রিক্সাওয়ালা তার ক্ষুধা—নিবারণের যন্ত্রতরীতে এই বাড়ির কোনো যাত্রী উঠায় না, ভাড়া না পাওয়ার একটা আতঙ্কিত চেহারা তার মধ্যে ফুটে ওঠে। প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক এত সম্মানিত একটা পরিবারের সদস্য সম্পর্কে এত হীন মন্তব্য? ব্যাপারটা খুলেই বলা দরকার, যতটুকু পৌরাণিক হিসেবে সরকার বংশ প্রসিদ্ধি লাভ করেছে, তার ছিটেফোঁটাও বর্তমানকে সামঞ্জস্যিত করে না।
ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে যে পোড়ামাটি, মস্ত বাগানসহ দাঁড়িয়ে থাকার কথা, সেখানে অবিশপ্ত সূর্যরশ্মিতে কুঞ্চিত মস্ত চাতালসহ সারি সারি মনুষ্য জীবের কুটিলতম হৃদযন্ত্রের নক্সা সম্বলিত টিনের ঘর। অথচ এ বাড়ির চাকর—বাকরদের মুখে স্ব—চক্ষে দেখা বর্ণিত কাহিনির সূত্রমতে, বাড়ির সামনে দিয়ে কোনো লোক পূর্বে কোনো বাহনে যেতে পারত না, এমনকি অসুস্থ কোনো লোককে হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও তাকে নামাতে হত। যদিও শতভাগ লোক কাহিনিটাকে অত্যুক্তি মনে করে, কারণ চাকর—বাকরদের মাথার চুল এখনও পাকেনি বলে; তবুও অবিশ্বাসের কপাল ভাঁজকরণ চিহ্নটাও কেউ দেখায় না।
সরকার বংশের সদস্যরা যথার্থই একান্নবর্তী। যথার্থ বিশেষণটা ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়েছে, কারণ, পরিবারের খাওয়া—নাওয়া, সুখ—দুঃখ, ঝগড়া—বিবাদ সবই হয়ে থাকে যৌথভাবে। যৌথভাবে না বলে সামাজিকভাবে বলাই ভালো। কারণ, সরকার বংশের বর্তমান স্তম্ভ জনাব মোহাম্মদ আলী আশরাফ পাঠান সরকারের একটা হাঁচি—ই এই গ্রামকে তছনছ করার জন্য যথেষ্ট। প্রিয় পাঠক, মাফ করবেন, এই লোকটির চরিত্রের সঠিক অবয়ব দান করা আমার সাধ্যতীত।
আফগানিস্তান থেকে তার পূর্বপুরুষরা অহংকার নামক চাপা আগুনের বাহ্যিক আচ্ছাদন স্বরূপ পাঠান উপাধিটি তাকে দান করেছেন। সেই সঙ্গে পিতামহের উন্মত্ত জমিদারিত্ব, কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজের বাবুপনা, প্রকৃতিকে বাধ্য করেছে তাকে দাবার একটি সম্পূর্ণ সেট উপহার দেওয়ার জন্য। যার প্রতিটি গুঁটি হচ্ছে আত্মীয় পরিবেষ্টিত জীবিত এবং ইচ্ছার স্বাধীনতায় মৃত এই গ্রামের মানুষ। যা হোক গ্রামের মানুষরা এই সব অতি জ্ঞান চর্চায় সৌখিন নয়। তারা এই অঘোষিত রাজার রাজত্বে সুখীও নয়— দুঃখীও নয়, আবার পরিবর্তনেরও আশা করে না। সব মিলে এই গ্রামটি মহাবিশ্বের ঐ ধূলিকণা, যার দিনে বা রাতে কোনো পরিবর্তন নেই, যে তার অসহায়ত্বের আবরণে এতই আবদ্ধ যে, বাইরের বাতাস তাকে নড়াচড়া করায় ঠিক—ই, কিন্তু স্থানচ্যুত করতে পারে না।
তবে গ্রামের মানুষের বিনোদনের কিন্তু অভাব নেই; আর ঐ বিনোদনের কেন্দ্রবিন্দু হলো চোর মজিদ বা মজিদ চোর। গ্রামের প্রতিটি মানুষের হৃদয়ের একটি ক্ষুদ্র অংশ মজিদের জন্য বরাদ্দ হলেও, চোর নামক লেজুড়টা যে অলঙ্ঘনীয়। কারণ, ওটা আলী আশরাফের মুখ নিঃসৃত শব্দ।
ঘটনাটা এরকম, সৃষ্টিকর্তার দেওয়া ক্ষুধার তাড়নায় কোনো এক বাড়িতে সিঁধ কাটার সময় মজিদ নামক এক যুবক ধরা পড়ে। সে যাত্রায় চুরি করার অভিজ্ঞতা না দেওয়ায় সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানানো স্বরূপ মজিদকে মেরে ফেলা হয়নি বা পুলিশে সোপর্দ করা হয়নি। তবে তাকে সম্পূর্ণ পূত—পবিত্র করা হয়েছে। প্রথমে, মুসলমান হওয়ায় পবিত্র কোরআন শরীফ ছুঁয়ে তাকে ওয়াদা করতে হয়েছে, টানা চল্লিশ দিন মসজিদে গমণকারী পাপীদের যে পাপগুলো ইবাদতের মাধ্যমে গা থেকে খসে গিয়ে পৃথিবীপৃষ্ঠে পড়ে, সেগুলো ধোয়া—মুছা করতে হয়েছে, অতএব পাপ পরিষ্কার করার সময়—ই সমস্ত পাপ মজিদের দেহে বাসা বাঁধলেও আমরা তাকে দোষ দিতে পারি না। ওই সময়—ই গ্রামের কিছু ভদ্র গোছের হিন্দু পরিবারের সুপরামর্শে মজিদকে সম্পূর্ণ পবিত্র করার উদ্দেশ্যে হিন্দু ধর্মে দীক্ষা দিয়ে এক মাসের জন্য মা দূর্গার চরণে উৎসর্গ করা হয়, ভুল বুঝবেন না, বলি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়, দেবীর সেবা করার জন্য। এরপর যথারীতি বৌদ্ধ ধর্ম এবং তারপর খ্রিস্টধর্ম। খ্রিস্টধর্মের ব্যাপারটা একটু খোলাসা করেই বলা দরকার। কারণ, এখানে একটু উত্তম—মাধ্যমের ঘনঘটা আছে বটে! পাদ্রী যখন জিজ্ঞেস করল,
‘বলো, বাছা, কি পাপ করিয়াছো তুমি?’
মজিদ : ‘হুজুর, হামি এ্যাই পিত্তিবীতে জন্মাইছি, এডাই সবচাইয়া বড় পাপ।’
তৎক্ষণাৎ আশেপাশের ধর্ম সচেতন ব্যক্তিরা ধর্মের জাত যাবার রব তুলে মজিদকে কিছুদিনের জন্য হলেও হাসপাতালে বিনে পয়সার উদরপূর্তির ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু তখনও পবিত্র হওয়ার একটা অধ্যায় বাকি থাকায় সুখের স্বর্গ থেকে ফেরত আসার পরপর—ই মজিদকে পরম পূজনীয় পাদ্রীর কাছে স্বীকার করতেই হয়েছিল যে, সে চোর। এর মাধ্যমে মজিদ এতই পবিত্র হলো যে, সে এখনও নতুন কাউকে পরিচয় দেওয়ার সময় বলে যে, ‘আমি চোর, মজিদ চোর’।
লোকে তার এ অকৃত্রিম সততাই বিনোদিত না হয়ে পারে না। ফলে মজিদ সকল ধর্মের হয়েও ধর্মহীন, সে তার সৃষ্টিকর্তাকে চেনে না, শুধু মনে মনে প্রকৃতির কোনো এক অজানা দেবতাকে ধন্যবাদ দেয় যে, এই গ্রামে আর কোনো ধর্মের বিকাশ হয়নি; নয়তো তার বদৌলতে বগুড়ায় এই ছোট্ট গ্রামও মমির দেখা পেত, যেটাকে সংরক্ষণ করে নতুন নতুন ধর্মে দীক্ষা দেওয়া হত এবং পবিত্র করা হত। যাই হোক, পবিত্র করার দীর্ঘ এই পবিত্র সময়টিতে একবারের জন্যেও কেউ দেখেনি যে, মজিদের ঘরের উনুন জ্বলেছিল কি না!
অবশ্য মজিদের জন্য এক দিক দিয়ে ভালোই হলো, তাকে আর নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের অনুশাসন মেনে চলতে হয় না। সে এক উচ্ছিষ্ট, তা ঈদ হোক, জন্মাষ্টমী হোক, বৌদ্ধ পূর্ণিমা আর বড়দিন—ই হোক। মজিদ এখন বাড়ি বাড়ি ফেরী করে ভূসি, মধু, তোকমা, বাচ্চাদের খেলনা ইত্যাদি বিক্রি করে আর গ্রামের মানুষের মনোরঞ্জন করে। এই যেমন— ফরিদের কাছে ইসুবগুলের ভূসি বিক্রি করে ওয়াজের সুরে গেয়ে ওঠে-
‘এই দিলাম ইসুবগুলের ভূসি,
চাচায় খাইলে থাকে চাচী খুশি।’
আবার, হরিশকে মধু দেওয়ার পর বলে ওঠে—
‘এই দিলাম খাঁটি মধু—
যা খাইলে খুশি থাকে ঘরের বধূ।’
কিংবা গৌতমের কাছে গিয়ে গেয়ে ওঠে—
‘এই দিলাম তোকমার দানা—
বেশি দিতে পারিলাম না।
মনে মনে রাগ করিবেন না।’
গ্রামের সবচেয়ে উচ্চ মিনার সম্বলিত মসজিদের দ্বিতীয় তলায় একটি অলিখিত দলিলের মাধ্যমে নিজের জন্য স্থায়ী বন্দোবস্ত করে নিয়েছে সামাদ মৌলভী। নোয়াখালীর এই লোকটিকে দেখলে পারস্য থেকে আগত কোনো ধর্মপরিসরকারী মনে হয়। ইতি তৃতীয়বারের মত সাদী মোবারকের স্বাদ পেয়েছেন এবং ইতোমধ্যে নবীজী রাসূল (সা.)—এর সুন্নত পালন করার জন্য মত পোষণ করেছেন, যদিও তার কোনো স্ত্রী বিধবা হয়নি এবং তারা সবাই সন্তানধারী। গ্রামের এই একটি লোক—ই মজিদের প্রতি বেশি আন্তরিক। গ্রাম্য আগমনের প্রথম পর্বে দরিদ্র মজিদ—ই যুবক সামাদকে তার কুঠিরে আশ্রয় দিয়েছিল, বিনিময়ে সামাদও মজিদের উপকার করতে ভুলে নাই, মজিদের পবিত্র হওয়ার দিনগুলোতে সামাদ তার নিজের মেদবহুল শরীরটাকে মজিদের কলঙ্কময় পা দ্বারা উপযুক্তভাবে দিনে তিনবার কর্ষণ করে নিত। তাই মজিদ মসজিদের পাশ দিয়ে গেলেই উচ্চ স্বরে গেয়ে ওঠে—
‘পাকিলে ডালিম ফল নিজেই ফেটে যায়—
ছোটলোক বড় হলে বন্ধুরে কাঁদায়।’
প্রথম প্রথম সামাদ মৌলভী ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে নিজের পায়ের চটিজোড়া ছুঁড়ে মারত, কিন্তু মজিদ সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে দৌড় দেওয়ায় মৌলভী সাহেব বিনা খরচে তার মুখে থুথুগুলো ছুঁড়ে মারেন। কিন্তু রমজান মাসে থুথুর কামানে অনেকটা স্থিতি পড়ে, কারণ গ্রীষ্মের ফাঁটা চৌটির করা মাঠের ধূলার কুয়াশার মত থুথুসমুহ সামাদ মৌলভীর প্রাণের সঞ্চার করে। গ্রামের স্তিমিত ছাউনিগুলোর অসভ্য কীটপতঙ্গের কাছে মৌলভী সাহেব একজন রোগ নিরাময়কারী মহাপুরুষও বটে।
শরীরের জন্মদাগের মতন মানুষগুলো তাদের পেটব্যথা থেকে শুরু করে শ্বাসকষ্ট পর্যন্ত যেকোনো রোগে মৌলভী সামাদের দেওয়া তাবিজ—কবজ্ বহন করে। অবশ্য মৌলভী সাহেব কোনো সাধুর মত ‘পড়িলে পাশ হইবে’- এ ধরনের কথায় তাবিজকে কপট করেন না, তার দেওয়া তাবিজগুলোর মধ্যে সত্যিই আরবি অক্ষর পাওয়া যায়। কিন্তু তার অর্থ বিশেষ গুরুত্বসহ বলে কোনো সহীহ কোরআন এবং হাদীসের বিশারদও নির্ণয় করতে পারে না। মজিদের একমাত্র গুণধর ছেলে জামালের প্রায়—ই -জ্বর—সর্দি হয়। তাই একজন আদর্শ মা হিসেবে জরিনা বেগম সামাদ মৌলভীর কাছ থেকে প্রায়—ই তাবিজ নিয়ে আসে।
ইদানীং অসুখ হোক আর না হোক জরিনার তাবিজ আনার কোনো বিরতি ঘটে না আর কপালগুণে ক্ষণিকের জন্য জরিনা বেগমের মৌলভী সাহেবের চতুর্থ পত্নী হতেও আপত্তি থাকে না। সেক্ষেত্রে মহানুভবতায় সিক্ত গ্রাম্য জানোয়ারগুলোর কোনো মাথা ব্যথা থাকে না। মৌলভী সাহেব তার এত ধর্মসেবার বিনিময়েও কোনো নগদ অর্থ নেন না, তিনি শুধু মহান আল্লাহর রহমতস্বরূপ কদু, সিম, কঁচি মুরগি, হাঁস ইত্যাদি হাদিয়া হিসেবে গ্রহণ করেন। অতএব তাকে কিছু বলা মানে ধর্মের অপমান। আর কোনো চোরের স্ত্রীর সতীত্ব রক্ষার চেয়ে ধর্মের মান রক্ষা করা অনেক বেশি শ্রেষ্ঠ কাজ।
মজিদ সব জেনেও না জানার ভান করে থাকে। কারণ সে জানে পৃথিবীতে ‘মেয়েরা সুখের জামাতা’ পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। জরিনার প্রতিও তার আর টান বোধ হয় না। ঐ যে, কথায় কয় না—
‘স্বামী আমার জানের জান,
স্বামী আমার প্রাণের প্রাণ—
কলসীতে পানি আছে,
হারামজাদা ভইরা খান।’
জরিনা যে ঐ ধরনের তা সে ভালোভাবেই অনুধাবন করে। কিন্তু যে সৃষ্টি মজিদের রক্তবিন্দু দিয়ে তিল তিল করে গড়ে তোলা, সে জামালের কাছে অপরাধ বোধ করে। সে জানে, জামালের শরীরে প্রবাহিত চোরের রক্ত, তাকে কখনও মানুষ জামাল হতে দিবে না, সে হবে চোর জামাল! রমজান মাসের শেষ জুমআর সন্ধ্যায় বসে মজিদ জেগে জেগে এসব দুঃস্বপ্ন দেখে। হঠাৎ কোথাকার কোনো জ্ঞানের দেবতা মজিদের চক্ষুদ্বয়ে প্রবেশ করে অগ্নি লোলুপ দৃষ্টির সঞ্চার করে। সে জামালের হাতে পাঁচ টাকা দিয়ে তাকে সদর মসজিদে চলে যেতে বলে। জীবনের প্রথম কিন্তু ভাবের আধারে শেষ চুম্বন ছেলের ওষ্ঠে বর্ষণ করে সে বলে,
‘হামি তোরে চোর হতে দিমু না। তোরে মানুষ বানামু। তুই যা বাজান, আমি আইত্যাছি’। বাবা তাকে কোথাও ঘোরাতে নিয়ে যাবে ভেবে জামাল নাচতে নাচতে চলে যায়। মজিদ জরিনার ঘরে প্রবেশ করে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়।
মসজিদের স্বর্গীয় স্পর্শে, কিছুক্ষণ আগে গ্রামের মানুষের মসজিদ নির্মাণের টাকা, ইমামের টাকা এবং এতিমখানার টাকা একত্রিত করে সামাদ মৌলভী সুখনিদ্রায় যাপিত হয়েছে। মজিদ তার জীবনের সফলতম চুরির স্বাদ নিয়ে মৌলভীর ঘর থেকে প্রায় বাইশ হাজার তিনশত তেষট্টি টাকা নিয়ে সদরের রাস্তায় হাঁটছে, কিন্তু মনে শান্তি পাচ্ছে না। গ্রামের মানুষ টাকা আত্মসাতের জন্য মৌলবীকে শাস্তি ঠিক—ই দিবে, কিন্তু তাতে তার কি লাভ? সামাদ নিজে অপরাধী। তাই চাদরের নিচে গরু জবাইয়ের বিশাল চুরি নিয়ে সে মসজিদের পথ ধরল। মসজিদের দ্বিতীয় তলায় প্রথম সিঁড়িতে পা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রায় জনাপঞ্চাশেক দু’দিক থেকে মজিদকে ধরল। মজিদের মাঝে স্থির হওয়া জ্ঞান দেবতাটি তো আর জানত না যে, মৌলভী কুদরতী ক্ষমতার বলে রাতে তিনবার তার তহবিল খানা তদারকি করেন।
সময় তখন রাত দুটো। আলী আশরাফ সরকারের ঘরের সামনে পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির ধূলো—মাখা কিছু একটা পড়ে আছে আর তার থেকে ধূলাবালি যুক্ত রক্তের সমুদ্রে বসা মাছিরা গ্রামবাসীর রাগকে ক্রোধে পরিণত করছে। মজিদের লাশের তো কিছু একটা করা দরকার। কিন্তু চোরকে গ্রামের পবিত্র মাটিতে দাফন করে গ্রামকে অপবিত্র করতে নারাজ সবাই। তাছাড়াও কপালপুরী—অভাগা, চোরের সংসারের শান্তির পায়রা জরিনাকেও সে নিজের হাতে খুন করেছে। একে তো ধর্মহীন, তাছাড়াও মসজিদে চুরি, এর লাশের অস্তিত্ব—ই মানে ধর্মের অস্তিত্বের বিনষ্ট। কিন্তু আলী আশরাফ ভাবছেন অন্য কথা।
খুনাখুনি—লাশ- এসব জানাজানি হলে গ্রামে পুলিশের কর্তৃক্ত প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে। তার পূর্বপুরুষের শৃঙ্খলিত দাবার সেট নষ্ট হয়ে যাবে। তিনি তার যোগ্য উত্তরসূরি জনাম মোহাম্মদ আলী আকবর ডাবলুকে লাশটাকে কেটে কেটে টুকরো টুকরো করতে বললেন। শুধু বলাই নয়, কাজ তখন—ই সমাপ্ত হল। হতে যে হবেই, এ যে ধর্মের রাস্তায় জিহাদ। পরে লাশের টুকরোগুলোকে মজিদের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে জরিনার লাশের পাশে রেখে, ঘরে আগুন দেওয়া হল।
আগুনের লেলিহান শিখা যেন সপ্ত আসমানকেও ছাপিয়ে গেল। কারণ এ তো আর সাধারণ আগুন নয়। এ আগুন চোরকে শাস্তি দেওয়ার আগুন, এ আগুন গ্রামের সব পাপকে পুড়ে ফেলার আগুন, এ আগুন গ্রামকে পবিত্র করার, এ আগুন ধর্ম প্রতিষ্ঠার আগুন।
পরদিন পাঁচজন পুলিশের টহলদার এসে ঘুরে ফিরে, দুপুরে নিজদের উদরপূর্তি করে ঘটনাটিকে নিছক আত্মহত্যা বলে চাউর করে দেয়।
[প্রিয় পাঠক, কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারীদের মনে আঘাত করা আমার উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু ধর্মের নামে ব্যবসাকারীদের আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক যেমন প্রশ্রয় দেয়নি, আশা করি আপনাদের মত বিদ্বানরাও তাকে প্রশ্রয় দেবেন না। আমি বিশ্বাস করি, মানবতার ধর্ম যেখানে বিলীন, সেখানে মহান সৃষ্টিকর্তার ধর্মের মহিমাও মুখ থুবড়ে পড়ে। ধন্যবাদ]
লেখক : ভাষাবিজ্ঞান, সাহিত্যিক ও শিক্ষা বিশ্লেষক
আরটিভি/এমএম
