
ইরানে রাজনৈতিক নিপীড়নের আশঙ্কায় দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিয়েছিলেন নিকা নামের এক তরুণী। কিন্তু নিরাপত্তার আশায় যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পরও শেষ পর্যন্ত স্বস্তি মেলেনি তার। ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তে তাকে এমন একটি দেশে ডিপোর্ট করা হয়েছে, যেখানে তিনি আগে কখনো যাননি এবং যার সঙ্গে তার কোনো পারিবারিক বা সামাজিক সম্পর্কও নেই।
নিরাপত্তার কারণে নিজের আসল নাম প্রকাশ না করে ‘নিকা’ ছদ্মনামে কথা বলা এই ইরানি নারী বর্তমানে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের রাজধানী বাঙ্গুইয়ে অবস্থান করছেন। তিনি জানিয়েছেন, ইরানে ফিরে গেলে তার জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় তিনি একজন মার্কিন ইমিগ্রেশন জজের কাছ থেকে এমন একটি সুরক্ষা আদেশও পেয়েছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল তাকে এমন দেশে ফেরত পাঠানো ঠেকানো, যেখানে নির্যাতন বা মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে।
সিএনএনের পর্যালোচনা করা নথি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে সীমান্তে আটক হওয়ার পর নিকা কয়েক মাস আইসিই হেফাজতে ছিলেন। পরে ক্যালিফোর্নিয়ায় তাকে সাময়িকভাবে স্বাধীনভাবে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। জুনে ডিপার্টমেন্ট অব হোমল্যান্ড সিকিউরিটি থেকে একটি নোটিশ পেয়ে তিনি নিয়মিত বৈঠক মনে করে সেখানে যান। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এর তিন দিন পর, ১১ জুন সন্ধ্যায় হাতকড়া ও পায়ে শিকল পরিয়ে তাকে একটি ডিপোর্টেশন ফ্লাইটে তোলা হয়। একই ফ্লাইটে আফগানিস্তান, ইরাক ও জর্জিয়াসহ বিভিন্ন দেশের আরও ১৭ জন অভিবাসী ছিলেন। নিকার দাবি, বিমানে ওঠার আগে তিনি জানতেন না তাকে কোথায় নেওয়া হচ্ছে। বিমানের আসনের সামনে থাকা ছোট স্ক্রিনে গন্তব্য দেখার পর তিনি জানতে পারেন, তাকে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পাঠানো হচ্ছে।
নিকার ইমিগ্রেশন আইনজীবী সাহার জালিলি পাওয়েলস্কি শেষ মুহূর্তে তাকে ওই ফ্লাইট থেকে নামানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে তা সম্ভব হয়নি।
বাঙ্গুইয়ে পৌঁছানোর পরও নিকার জীবন স্বাভাবিক হয়নি। তিনি জানিয়েছেন, নিরাপত্তার আশঙ্কায় বেশিরভাগ সময় অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরেই থাকেন। প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে বাইরে গেলে স্থানীয় পুলিশ তাকে থামিয়ে ঘুষ দাবি ও গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। তবে স্থানীয় পুলিশ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এ ছাড়া নিকা ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে অপরাধ, অপহরণ, রোগব্যাধি ও সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকির কারণে দেশটিতে ভ্রমণের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ মাত্রার সতর্কতা জারি করেছে।
নিকার মতো অভিবাসীদের তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তি করছে। নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে আদালতের বাধা থাকলে তৃতীয় দেশে পাঠানোর এই নীতিই এখন বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।
মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ অবশ্য এসব ডিপোর্টেশনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিভাগটির দাবি, যাদের পাঠানো হয়েছে তারা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অপসারণের আদেশ ছিল।
মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই ডিপোর্টেশন ব্যবস্থার বিস্তারিত চুক্তি প্রকাশ্যে আসেনি। এদিকে নিকা ও তার সঙ্গে পাঠানো অন্য অভিবাসীদের বলা হয়েছিল, তারা সেখানে প্রাথমিকভাবে তিন মাসের জন্য থাকতে পারবেন। ৩১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র থেকে দ্বিতীয় একটি ডিপোর্টেশন ফ্লাইটে আরও ৩১ জনকে মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রে পাঠানো হয়।
এখন নিকার সবচেয়ে বড় আশঙ্কা, অস্থায়ী থাকার সুযোগ শেষ হলে তাকে শেষ পর্যন্ত আবার ইরানে ফেরত পাঠানো হতে পারে। তার আইনজীবী যুক্তরাষ্ট্রে একটি ফেডারেল মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যাতে নিকাকে আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে এনে তার অ্যাসাইলাম আবেদন পুনরায় চালুর সুযোগ দেওয়া যায়।
ইরান থেকে নিরাপত্তার আশায় যুক্তরাষ্ট্রে আসা নিকার জীবনের এই পরিণতি তৃতীয় দেশে ডিপোর্টেশন নীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। যে দেশটিকে তিনি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ভেবেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই দেশ থেকেই তাকে এমন এক জায়গায় পাঠানো হয়েছে, যেখানে তার নিজের ভাষায়, ভবিষ্যৎ এখন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত।
সূত্র: সিএনএন
আরটিভি/ এসকেডি


