
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যে ২৩ বছর বয়সী সান্দ্রা বার্চমোরের মৃত্যুর ঘটনায় সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা ম্যাথিউ ফারওয়েলের বিচার শুরু হয়েছে। পাঁচ বছর আগে বোস্টনের উপশহর ক্যান্টনে নিজের অ্যাপার্টমেন্টে সান্দ্রার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই তরুণীকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ফারওয়েল অবশ্য নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বোস্টনের আদালতে বিচার শুরুর প্রথম দিনেই সান্দ্রার মৃত্যুর আগের দিনগুলো নিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বর্ণনা তুলে ধরেন সরকারি আইনজীবী ও আসামিপক্ষের আইনজীবী।
সরকারি আইনজীবী টোরি বি. কামিংসের দাবি, সান্দ্রার অভিভাবকসুলভ পরামর্শদাতা হওয়ার কথা ছিল ফারওয়েলের। কিন্তু সান্দ্রার বয়স ১৫ বছর এবং ফারওয়েলের বয়স ২৭ বছর থাকতেই তাদের মধ্যে যৌন বা শারীরিক সম্পর্ক শুরু হয়। এরপর প্রায় আট বছর ধরে ওই সম্পর্ক চলে। এ সময় ফারওয়েল নিজের অবস্থানের সুযোগ নিয়ে সান্দ্রাকে শোষণ করেন। এমনকি দায়িত্ব পালনরত অবস্থায়ও কখনো কখনো তার সঙ্গে দেখা করতেন বলে অভিযোগ করেন আইনজীবী।
কামিংসের ভাষ্য, সান্দ্রা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার পর তাদের গোপন সম্পর্ক প্রকাশ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সান্দ্রা তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলতে পারেন—এমন আশঙ্কা থেকেই ফারওয়েল তাকে হত্যা করেন বলে দাবি করেন সরকারি আইনজীবী।
সরকারি আইনজীবী বলেন, ফারওয়েল ভেবেছিলেন, তাদের সম্পর্কের তথ্য প্রকাশ পেলে তার জীবন ও পেশাগত অবস্থান বিপন্ন হতে পারে। তাই সান্দ্রা তাকে বিপদে ফেলার আগেই তাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবী কিম্বার্লি স্টিভেন্স এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ফারওয়েল ও সান্দ্রার মধ্যে বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল এবং ফারওয়েল ভুল করেছেন। কিন্তু তিনি সান্দ্রাকে হত্যা করেননি। বরং সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর হতাশা ও মানসিক চাপে সান্দ্রা নিজেই আত্মহত্যা করেন বলে দাবি করেন আইনজীবী।
স্টিভেন্স আদালতে বলেন, সান্দ্রা উদ্বেগ ও একাকিত্বে ভুগছিলেন। তার ব্যাংক হিসাবে তিন ডলারেরও কম অর্থ ছিল এবং বাড়িভাড়া পরিশোধ নিয়েও দুশ্চিন্তায় ছিলেন। মৃত্যুর দিনও তিনি ফারওয়েলকে একের পর এক বার্তা পাঠিয়েছিলেন বলে আদালতে উল্লেখ করেন আইনজীবী। এসব বার্তাকে তিনি সান্দ্রার মানসিক অস্থিরতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন।
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ম্যাসাচুসেটসের ক্যান্টনে নিজের শোবার ঘরের মেঝেতে সান্দ্রাকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তার গলায় একটি ব্যাগের ফিতা পেঁচানো ছিল, যা আলমারির দরজার হাতলের সঙ্গে বাঁধা ছিল। স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ের কর্তৃপক্ষ প্রথমে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছিল।
কিন্তু সান্দ্রার পরিবার এ সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তাদের দাবি, সান্দ্রা তখন ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করছিলেন এবং মা হতে পেরে আনন্দিত ছিলেন। পরিবার ও স্বজনদের চাপের পর বিষয়টি নতুন করে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
২০২৪ সালে ফারওয়েলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারীরা। পরে চলতি বছরের এপ্রিলে চিকিৎসা পরীক্ষকের কার্যালয় সান্দ্রার মৃত্যুর ধরন ‘অনির্ধারিত’ বলে সংশোধন করে। অর্থাৎ, মৃত্যুটি আত্মহত্যা নাকি অন্য কোনো কারণে হয়েছে, তা নিশ্চিত করা যায়নি।
সরকারি আইনজীবীরা আদালতে জানান, সান্দ্রার গলায় পেঁচানো ব্যাগের ফিতায় ফারওয়েলের ডিএনএ পাওয়া গেছে। তাদের দাবি, ঘটনাটিকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি। তবে আসামিপক্ষ বলেছে, ফিতায় একাধিক ব্যক্তির ডিএনএ ছিল এবং সান্দ্রার নখের নিচে ফারওয়েলের ডিএনএ পাওয়া যায়নি। এসব তথ্যের ভিত্তিতে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয় না বলে দাবি করেছেন তার আইনজীবী।
সান্দ্রার সঙ্গে ফারওয়েলের সম্পর্কের বিষয়ে তদন্তকারীরা তার বৈদ্যুতিক যন্ত্রে প্রায় ৪০ হাজার বার্তা পান। সরকারি আইনজীবীর দাবি, এসব বার্তা তাদের সম্পর্কের দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরে। সান্দ্রা ১৫ বছর বয়সে প্রথম যৌন সম্পর্কে জড়ানোর সময় যে অপরাধের শিকার হয়েছিলেন, সেটিও আদালতে উল্লেখ করেন আইনজীবী।
সান্দ্রা অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর ফারওয়েল শিশুটিকে নিজের সন্তান বলে বিশ্বাস করতেন বলে অভিযোগ করেছে সরকারি পক্ষ। তবে পরবর্তী ডিএনএ পরীক্ষায় ফারওয়েলকে অনাগত শিশুটির বাবা হিসেবে বাদ দেওয়া হয়।
ফারওয়েলের বিরুদ্ধে সাক্ষী বা ভুক্তভোগীকে সম্ভাব্য অপরাধের তথ্য প্রকাশ থেকে বিরত রাখতে হত্যা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি অনাগত শিশুর সুরক্ষাসংক্রান্ত একটি কেন্দ্রীয় আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও রয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
৪০ বছর বয়সী ফারওয়েলকে ইতিমধ্যে পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে কাজের অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে এবং ম্যাসাচুসেটসে আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় কাজ করা থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্টে গ্রেপ্তারের পর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। প্রায় এক মাস ধরে চলতে পারে এই বিচার।
সূত্র: সিএনএন
আরটিভি/জেএমএ


