
ময়মনসিংহ জেলা শিল্পকলা একাডেমিকে ঘিরে ওঠেছে নানান অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। কালচারাল অফিসারকে জিম্মি করে ইচ্ছেমতো কাজ করানো, নারী কেলেঙ্কারি, সদস্য বানানোর নামে দুর্নীতি, আদিবাসীদের টাকা আত্মসাৎসহ নানান গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরিষদ সদস্য সারওয়ার জাহানের বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি সরকারি ভবন ভাড়া দিয়ে অর্থ আত্মসাৎ, শিল্পীদের টাকা আত্মসাৎ, মৃত মানুষকে জীবিত দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন ও দুর্নীতিসহ নানান অভিযোগে প্রত্যাহার করা হয় কালচারাল অফিসার হামিদুর রহমানকে। কিন্তু অভিযুক্ত ওই কালচারাল অফিসারের দাবি, শিল্পকলা একাডেমির প্রভাবশালী পরিষদ সদস্য সারোয়ার জাহানের নানান অন্যায় আবদার না রাখায় ফাঁসানো হয় তাকে। হামলা, নির্যাতন ও নারী দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে অবশেষে নানান মিথ্যে অপবাদ দিয়ে পথের কাঁটা সরানোর চেষ্টা করেন সারোয়ার জাহান, আসলাম, মনসুর, মানস তালুকদারসহ স্থানীয় সাংস্কৃতিক সিন্ডিকেটের সদস্যরা।
এ ব্যাপারে ইতোমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে কিছু অডিও রেকর্ড ও স্ক্রিনশট। ভাইরাল হওয়া অডিওটি মূলত একটি গোপন বৈঠকের রেকর্ড। যেখানে হামিদুর রহমানকে শায়েস্তা করতে নারী দিয়ে ফাসানোর পরিকল্পনা। তাতে কাজ না হলে হামলা নির্যাতনের পরিকল্পনার প্রমাণ পাওয়া যায়। জানতে চাইলে হামিদুর রহমান জানান ময়মনসিংহে দায়িত্বরত অবস্থায় সারোয়ার জাহান নানান সময়ে তার ইচ্ছেমতো বিভিন্ন বিল ভাউচারে স্বাক্ষর দেওয়ার জন্য হামিদুরকে চাপ দিতেন। এমনকি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শিল্পীদের সম্মানি দেওয়ার বিষয়টিও নিয়ন্ত্রণ করতেন তিনিই। একপর্যায়ে সারোয়ার জাহানের বেশকিছু অনৈতিক দাবির বিরুদ্ধে কথা বললে অফিসকক্ষেই হামলা চালানো হয় তার ওপরে।
এরপর নানান সময়ে অর্থ দাবি করাসহ বিভিন্নভাবে হুমকি ও নির্যাতনের শিকারও হন তিনি।
হামিদুর রহমানের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরাও। ময়মনসিংহের কয়েকজন নাট্যশিল্পী জানান সারোয়ার জাহান ও তার চক্রের দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাড়ানোই কাল হয় কালচারাল অফিসার হামিদুর রহমানের জন্য।
জেলা আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিকবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ ভাষানী বক্তব্যেও উঠে আসে সারোয়ার জাহান সিন্ডিকেটের নানান অপকর্মের দলিল। তিনি জানান নির্বাচন ও সদস্য বানানোর নামে সারোয়ার জাহান চক্র প্রায় সাত-আট লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছে।
অন্যদিকে সারোয়ার জাহানের যে অভিযোগের ভিত্তিতে হামিদুর রহমানকে জেলা শিল্পকলা একাডেমির দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়। যেমন মৃত ব্যক্তির নামে অর্থ উত্তোলন ও বিনা অনুমতিতে ভবন ভাড়া দেওয়ার মতো অভিযোগগুলো মিথ্যা। বরং সারোয়ার জাহান, মনসুর, মানস সিন্ডিকেটের চক্ররা শিল্পী আকরাম ও মইনকে মৃত বলে প্রচার গুজব ছরিয়েছিলেন। সেই শিল্পীরা জানান তারা জীবিত এবং শিল্পকলার কাজ করে পেয়েছেন উপযুক্ত সম্মানিও। সেইসঙ্গে শিল্পকলা একাডেমির তদন্ত কমিটির জানায় যথাযথ প্রক্রিয়াতেই ভাড়া দেওয়া হয়েছিল একাডেমির পরিত্যক্ত ভবন। ভাড়ার টাকাও জমা হয়েছে সরকারি রাজস্ব ফান্ডে।
শহরের গুণী সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে সারোয়ার জাহান সিন্ডিকেটের অপতৎপরতার কারণে শিল্পকলা বিমুখ হচ্ছে সাংস্কৃতিক কর্মীরা। কালচারাল অফিসারের প্রত্যাহার কোনো সমাধান নয়। বরং এই চক্রকে প্রতিরোধ না করা গেলে ময়মনসিংহ শিল্পকলার সুনাম পুনরুদ্ধার সম্ভব নয় বলেও দাবি জানান তারা।
ময়মনসিংহ শিল্পকলা একাডেমির এডহক কমিটির সিনিয়র সদস্য আনোয়ারা সুলতানার দাবি, সারোয়ার জাহান ও তার চক্রের সদস্যদের কারণে বিপন্ন হয়ে পড়েছে জেলা শিল্পকলা একাডেমি। শিল্পকলা একাডেমিকে নারী কেলেঙ্কারীর ঘাঁটি বানিয়ে ফেলেছে সারোয়ার জাহানরা। এমনকি সারোয়ার জাহান জেলা শিল্পকলা একাডেমির রেস্ট হাউজকে মধুচক্রের ঘাটি বানিয়ে ফেলেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে সারোয়ার জাহান চক্রের বিরুদ্ধে রয়েছে একাডেমির সদস্য বানানোর নামে বহুজনের টাকা নিয়ে আত্মসাতের মতো গুরুতর অভিযোগও। স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মী রনি মিয়ার অভিযোগ সারোয়ার জাহানের কথায় মুক্তাগাছার গারো আদিবাসীদের প্রায় ১০০ মানুষের শিল্পকলা একাডেমির সদস্য ফরম ফিলআপ করান তিনি। এরপর সেইসব ফরম ও ফরম ফি জমা দেন পরিষদ সদস্য সারোয়ার জাহানকে। কিন্ত সেইটাকা আত্মসাৎ করেন সারোয়ার জাহান।
ময়মনসিংহ চেম্বার অব কমার্সের সহসভাপতি শংকর সাহার বক্তব্যেও উঠে আসে একই রকম অভিযোগ। তিনি জানান ১০ বছর আগে আজীবন সদস্য বানানোর নামে বহুজনের কাছে জনপ্রতি এক হাজার টাকা ফি নিয়েছিলেন সারোয়ার জাহান সিন্ডিকেট। কিন্ত ১০ বছর পরও তাদের নাম ওঠেনি আজীবন সদস্যের তালিকায়।
জানা যায় ময়মনসিংহ পুলিশ লাইনস স্কুলের শিক্ষক ছিলেন সারোয়ার জাহান। তবে সার্টিফিকেট জালিয়াতি ও নারী কেলেঙ্কারীর কারণে চাকরি থেকে বরখাস্ত হন তিনি। মূলত, বিএনপি আমলে স্থানীয় সাংস্কৃতিক বলয়ে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন সারোয়ার। শুরু থেকেই নানান অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও গত দেড় যুগে বহু গুণী সাংস্কৃতিক কর্মীদের পেছনে ফেলেমাত্র এসএসসি পাস সারোয়ার হয়েছেন শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় কমিটির পরিষদ সদস্য। রাজনীতির পট পরিবর্তন ও সরকার বদল কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি সারোয়ার জাহানের উত্থানে। প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় শিল্পকলা একাডেমিকে কুক্ষিগত করে নানান অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এমনকি শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় কমিটির পরিষদ সদস্য সারোয়ার জাহান শিল্প সাহিত্যের কোনো শাখায় পারদর্শীও নন। তবে স্থানীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন তিনি।
সেইসঙ্গে তার নেই কোনো দৃশ্যমান আয়ের উৎসও।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতে মূলত শিল্পকলা একাডেমিকেই আয়ের উৎস বানিয়েছেন সারওয়ার জাহান। যে কালচারাল অফিসারই আসুক না কেন, সারওয়ার জাহানকে খুশি রাখতে না পারলে ময়মনসিংহে টিকতে পারবেন না তিনি।
সবমিলিয়ে এই সাংস্কৃতিক দুর্বৃত্ত চক্রের কবল থেকে জেলা শিল্পকলা একাডেমিকে রক্ষা করা এবং নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছে জেলার সাংস্কৃতিক কর্মীরা।




