কক্সবাজারে দিনদুপুরে দুর্ধর্ষ ডাকাতি, গ্রেপ্তার ২

আরটিভি নিউজ

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬ , ১১:৩১ এএম


কক্সবাজারে দিনদুপুরে দুর্ধর্ষ ডাকাতি, গ্রেপ্তার ২
ছবি: সংগৃহীত

টেকনাফ-কক্সবাজার সড়কে দিনের বেলায় যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে ৫৭ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

সোমবার (৩ আগস্ট) রাতে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তবে ঘটনার চার দিন পরও লুট হওয়া টাকা উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।

গত ২ আগস্ট বেলা পৌনে একটার দিকে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের দমদমিয়া এলাকার ১৪ নম্বর সেতুর কাছে এ ঘটনা ঘটে। বাসটি টেকনাফ থেকে কক্সবাজারের দিকে যাচ্ছিল। বাসে ছিলেন প্রায় ৩০ যাত্রী।

জানা গেছে, টেকনাফ স্টেশন থেকে বাসটি ছাড়ার পর একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় থাকা বোরকা পরা এক নারী বাসটিকে অনুসরণ করছিলেন। তার দেওয়া সংকেতেই পাহাড় থেকে নেমে এসে সাত-আটজনের একটি ডাকাত দল সড়কে গাছের গুঁড়ি ও পেরেকযুক্ত কাঠ ফেলে বাসটির গতি রোধ করে। পরে অস্ত্রধারী চারজন বাসে উঠে দুই বিকাশ এজেন্টের কাছ থেকে ৫৭ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয়। এ সময় তাদের ছুরিকাঘাত ও মারধর করা হয়।

ঘটনার পর ডাকাতরা পাহাড়ের দিকে চলে যায়। বাসটি থামিয়ে টাকা লুটের পুরো ঘটনায় সময় লাগে ১৫ থেকে ২০ মিনিট। ব্যস্ত সড়কে দিনের বেলায় এভাবে টাকা লুটের ঘটনাকে পরিকল্পিত বলে মনে করছে পুলিশ। বাসের চালক, সহকারী ও যাত্রীদের কেউ এ ঘটনায় জড়িত ছিলেন কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জানা গেছে, ২ আগস্ট দুপুরে টেকনাফের দুটি ব্যাংক থেকে টাকা তুলে তিনজন বিকাশ এজেন্টের বিক্রয় প্রতিনিধি পালকি পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন। তাদের কাছে ছিল পৃথক তিনটি ব্যাগ। ওই টাকা হ্নীলা বাজারে বিকাশের গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণের কথা ছিল।

একরাম হোছেনের কাছে ছিল ৩৫ লাখ টাকা, আল আরমানের কাছে ২২ লাখ টাকা এবং আবদুল করিমের কাছে ছিল ২৫ লাখ টাকা। তিনজনের কাছে মোট ৮২ লাখ টাকা ছিল। বাসে একরাম ও আরমান পাশাপাশি বসেছিলেন। তাদের সামনের আসনে ছিলেন করিম। বাসটি টেকনাফ বাসস্টেশন ছাড়ার পর যাত্রীরা একটি অটোরিকশাকে পেছনে দেখতে পান। এতে কালো বোরকা পরা এক নারী ছিলেন। তিনি মুঠোফোনে বারবার কারও সঙ্গে কথা বলছিলেন বলে বাসের কয়েকজন যাত্রী জানান।

বেলা একটার দিকে বাসটি দমদমিয়া এলাকার ১৪ নম্বর সেতুর কাছে পৌঁছালে সড়কের ওপর গাছের গুঁড়ি ও পেরেকযুক্ত কাঠের বাটাম ফেলে ব্যারিকেড দেওয়া হয়। চালক বাস থামালে পাহাড় থেকে সাত-আটজন মুখোশধারী অস্ত্রধারী ব্যক্তি নেমে এসে বাসটি ঘিরে ফেলেন। তারা কয়েকটি ফাঁকা গুলি ছুড়ে যাত্রীদের ভয় দেখান।

এরপর চারজন বাসে ওঠেন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বাসে যাত্রীবেশে থাকা একজন ব্যক্তি একরাম ও আরমানকে দেখিয়ে দেন। এরপর ডাকাত দলের একজন আরমানের কাছে থাকা টাকার ব্যাগ টানাহেঁচড়া শুরু করেন। ব্যাগ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে পিঠের ডান পাশে ছুরিকাঘাত করা হয়। পরে তার কাছ থেকে ২২ লাখ টাকা নিয়ে নেওয়া হয়।

একরামকেও মারধর করে তার কাছে থাকা ৩৫ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এরপর ডাকাতেরা দ্রুত বাস থেকে নেমে পাহাড়ের দিকে চলে যায়। একই সময়ে ওই নারী অটোরিকশা নিয়ে কক্সবাজারের দিকে চলে যান বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য।

বাসের যাত্রীরা জানান, ডাকাতেরা সরাসরি বিকাশ এজেন্টের বিক্রয় প্রতিনিধিদের কাছে গিয়ে টাকার ব্যাগের জন্য টানাহেঁচড়া শুরু করেন। এতে পুলিশের ধারণা, ডাকাত দলের সদস্যদের কেউ আগে থেকেই ওই বিক্রয় প্রতিনিধিদের চিনতেন, অথবা বাসে থাকা কারও কাছ থেকে তাদের পরিচয় ও টাকার ব্যাগের তথ্য পেয়েছিলেন।

ডাকাতির ঘটনায় ৩ আগস্ট টেকনাফ মডেল থানায় মামলা করেন বিকাশ এজেন্টের বিক্রয় প্রতিনিধি একরাম হোছেন। মামলায় সাত-আটজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।

ঘটনার পর বিজিবি, র‍্যাব ও পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। ছুরিকাঘাতে আহত আল আরমান ও একরাম হোছেনকে উদ্ধার করে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে আরমানকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়।

বিকাশের টেকনাফের এজেন্ট আবদুল করিম জানান, প্রতিদিনের মতো ২ আগস্ট তিনজন বিক্রয় প্রতিনিধি হ্নীলা বাজারে গ্রাহকদের টাকা দেওয়ার জন্য যাচ্ছিলেন। তাদের কাছে ব্যাংক থেকে তোলা মোট ৮২ লাখ টাকা ছিল। এর মধ্যে দুইজনের কাছ থেকে ৫৭ লাখ টাকা লুট হয়েছে।

আবদুল করিম বলেন, বাসটির আগে আগে একটি অটোরিকশায় একজন নারী অনুসরণ করছিলেন। ওই নারীর সংকেতেই ডাকাতেরা পাহাড় থেকে নেমে এসে লুট করেছে বলে এলাকায় আলোচনা হচ্ছে। তবে ওই নারীর পরিচয় এখনো শনাক্ত হয়নি।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ডাকাত দলের সদস্যরা কক্সবাজারের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিলেন। তাদের বয়স ২৫ থেকে ৩৫ বছর। কারও গায়ের রং শ্যামলা, কারও কালো। তাদের পরনে ছিল হাফ ও ফুল প্যান্ট, গেঞ্জি ও টি-শার্ট।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, ডাকাতির নেপথ্যে নানা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বাসটিকে একজন নারীর অনুসরণ করার বিষয়টি অনুসন্ধান করা হচ্ছে। বাসের চালক, সহকারী কিংবা কোনো যাত্রীর সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ জানায়, ৫৭ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় জড়িত সন্দেহে সোমবার রাতে হ্নীলা ইউনিয়নের লেদা রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির–সংলগ্ন নুরালীপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে আকতার হোসেন ও নজরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়। দুজনই লেদা এলাকার বাসিন্দা। ঘটনাস্থল থেকে তাদের এলাকার দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার।

আরও পড়ুন

পুলিশের দাবি, বাস থামিয়ে টাকা লুটের ঘটনায় এই দুজনের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আকতার হোসেনের বিরুদ্ধে মাদক, হত্যা, ডাকাতিসহ একাধিক মামলা রয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ডাকাতির ঘটনায় আকতার হোসেন, তার ভাই ইমান হোসেন, ভাগনে কামাল হোসেন, আজিজুর রহমান, মিজানুর রহমান, মোহাম্মদ আলম, রাসেল, খালেকসহ কয়েকজন জড়িত থাকতে পারেন। তাদের মধ্যে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরাও থাকতে পারেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।

ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তার দুজনকে ডাকাতি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বুধবার (৫ আগস্ট) ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে। আদালতে রিমান্ড আবেদনের শুনানি হয়নি। লুট হওয়া টাকা উদ্ধারের পাশাপাশি ডাকাতির সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission