
খুলনার পাইকগাছায় চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে দিনে-রাতে বিভিন্ন সময় মিলিয়ে মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়ার অভিযোগ করছেন উপজেলার বাসিন্দারা। এতে একদিকে যেমন স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বিদ্যুৎনির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য ও কলকারখানার কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।
তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা। রাতেও ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঘুম ও দৈনন্দিন কাজে বিঘ্ন ঘটছে। বাসাবাড়ির পাশাপাশি দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র শিল্প ও বিভিন্ন মিল-কলকারখানায়ও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পাইকগাছা জোন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় আবাসিক, বাণিজ্যিক, সেচ ও শিল্পসহ বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় এক লাখ বিদ্যুৎ গ্রাহক রয়েছেন। এর মধ্যে সচল গ্রাহক প্রায় ৮৫ হাজার। এসব গ্রাহকের জন্য প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৮ মেগাওয়াট। কিন্তু গত দুই দিন ধরে চাহিদার তুলনায় অনেক কম, মাত্র ৩ থেকে ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে।
ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ঘাটতি পূরণ করতে বিভিন্ন এলাকায় পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
পাইকগাছার অর্থনীতির একটি বড় অংশ মাছ চাষ, মাছের ব্যবসা ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুতের দীর্ঘস্থায়ী সংকটে এ খাতেও এর প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে বরফকলগুলোতে পর্যাপ্ত বরফ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহনে সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
পাইকগাছা মৎস্য আড়ৎদারী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বিল্লাল মোড়ল বলেন, মাছ সংরক্ষণের জন্য নিয়মিত বরফের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় বরফকলগুলো স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। ফলে সময়মতো বরফ পাওয়া যাচ্ছে না এবং সংরক্ষণ ও পরিবহনে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এতে মাছ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
স্থানীয় মাছ ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম জানান, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বরফের সংকট তৈরি হচ্ছে। একদিকে মাছ সংরক্ষণে সমস্যা হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়তি দামে বরফ কিনতে হচ্ছে। এতে তাদের ব্যবসায়িক খরচ বেড়ে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎনির্ভর বিভিন্ন মিল-কলকারখানার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। ধান, চাল ও তেল মাড়াইসহ বিভিন্ন ধরনের ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায় শ্রমিকদের বসে থাকতে হচ্ছে। এতে মালিকদের যেমন উৎপাদন ক্ষতির মুখে পড়ছে, তেমনি শ্রমিকেরাও কর্মঘণ্টা হারাচ্ছেন।
গোপালপুর এলাকার নাহিদ হাসান রাইস মিলের মালিক আমিনুর রহমান বলেন, বিদ্যুতের সমস্যার কারণে মিল ঠিকমতো চালাতে পারছি না। কখন বিদ্যুৎ আসবে, কখন চলে যাবে, তার কোনো ঠিক নেই। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় চালের দামেও প্রভাব পড়ছে।
মিলের শ্রমিক শফিকুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় মিল চলে না। মিল বন্ধ থাকলে আমাদেরও কাজ থাকে না। কাজ না থাকলে মালিকও ঠিকমতো বেতন দিতে পারেন না। এ অবস্থায় আমরা খুব অসহায় হয়ে পড়েছি।
লোডশেডিংয়ের কারণে পাইকগাছার বিভিন্ন বাজারের ব্যবসায়ীরাও সমস্যায় পড়েছেন। দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ না থাকায় বেচাকেনা কমে যাচ্ছে। কম্পিউটার, ফটোকপি, প্রিন্টিং, অনলাইন সেবা, মোবাইল ও ইলেকট্রনিকসের দোকানসহ বিদ্যুৎনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে জেনারেটর বা বিকল্প ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি জ্বালানি খরচ হচ্ছে। ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য এই বাড়তি ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া বিদ্যুতের অভাবে বাসাবাড়িতেও পানির মোটর চালানো, মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্র চার্জ দেওয়াসহ দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পাইকগাছা জোনের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) অঞ্জন কুমার সরকার বলেন, পাইকগাছা উপজেলায় প্রতিদিন প্রায় ১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু গত দুই দিন ধরে আমরা মাত্র ৩ থেকে ৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পেয়েছি। এ কারণে গ্রাহকদের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। সরবরাহ পর্যাপ্ত না হলে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কয়েক দিন ধরে যে মাত্রায় লোডশেডিং হচ্ছে, তা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে নজিরবিহীন। বিশেষ করে দিনে ও রাতে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে শুধু সাধারণ মানুষের দুর্ভোগই বাড়বে না, ক্ষতির মুখে পড়বে মাছ ব্যবসা, কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম, মিল-কলকারখানা ও ক্ষুদ্র ব্যবসা। এতে সামগ্রিকভাবে স্থানীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তাই দ্রুত বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়িয়ে লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে আনার দাবি জানিয়েছেন গ্রাহক, ব্যবসায়ী ও ক্ষুদ্র শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা। একইসঙ্গে বিদ্যুতের ঘাটতির স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ কামনা করেছেন তারা।
আরটিভি/এমএম



