ঢাকা বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

ধুমধাম করে ১১২তম মেয়ের বিয়ে

নাটোর প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫১ পিএম
নববধূ সুমাইয়া আক্তার তিথি ও বর তরিকুল ইসলাম। ছবি: আরটিভি

বাবা নেই প্রায় এক দশক। অভাবের সংসারে অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়েকে বড় করেছেন মা। জীবনের নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে মেয়েকে মানুষ করলেও বিয়ের বয়সে এসে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়ায় তার বিয়ে। সামর্থ্য না থাকায় বড় কোনো আয়োজনের কথা ভাবতেই পারেননি মা।

ঠিক তখনই পাশে দাঁড়ালেন একজন মানবিক মানুষ। শুধু বিয়ের খরচ বহনই নয়, নিজের মেয়ের মতো করে আয়োজন করলেন ধুমধাম করে বিয়ের অনুষ্ঠান। বরযাত্রী আপ্যায়ন থেকে শুরু করে খাবারের আয়োজন, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা—কোনো কিছুতেই ছিল না কমতি।

এভাবেই গত ২৪ বছরে ১১২ জন অসহায়, হতদরিদ্র ও এতিম মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন নাটোরের বড়াইগ্রামের রুহুল আমিন রুবেল। তার উদ্যোগে এবার রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বালাদিয়া গ্রামের ১৯ বছরের সুমাইয়া আক্তার তিথির বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।

শুক্রবার বালাদিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই পুরো বাড়িতে উৎসবের আমেজ। বাড়ির সামনে বিয়ের কারুকাজ করা গেট। অতিথি ও বরযাত্রীদের আপ্যায়নের জন্য চেয়ার-টেবিল সাজানো। বাড়ির এক পাশে চলছে রান্নার ব্যস্ততা। গরু, খাসি, মুরগি, ডিম ও পোলাওসহ নানা পদের খাবার প্রস্তুত করা হচ্ছে।

চারপাশের এই আয়োজন দেখে বোঝার উপায় ছিল না—এটি একজন বাবা হারানো অসহায় মেয়ের বিয়ে।

বাড়ির জরাজীর্ণ একটি কক্ষের ভেতরে তখন বউ সাজানো হচ্ছিল তিথিকে। একদল নারী ব্যস্ত তাকে সাজাতে। বাইরে উৎসবের ব্যস্ততা, ভেতরে কনের সাজ—সব মিলিয়ে মুখর পুরো বাড়ি।

প্রায় ১০ বছর আগে বাবাকে হারান সুমাইয়া আক্তার তিথি। এরপর মা জহুরা খাতুনই হয়ে ওঠেন তার একমাত্র অবলম্বন। অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়েকে পড়াশোনা করিয়েছেন, সংসার চালিয়েছেন। অভাবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করলেও মেয়েকে আগলে রেখেছেন নিজের মতো করে।

কিন্তু মেয়ের বিয়ের বয়স এলে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েন জহুরা খাতুন। মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও বড় আয়োজনের সামর্থ্য ছিল না তার।

এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুহুল আমিন রুবেলের অসহায় ও এতিম মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার কার্যক্রম দেখতে পান তিনি। এরপর যোগাযোগ করেন রুবেলের সঙ্গে। তিথির পরিবারের পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার পর বিয়ের দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানান রুবেল।

এরপর ঠিক হয় দিন-তারিখ। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হয় গায়ে হলুদের আয়োজন। শুক্রবার দিনভর চলে বিয়ের নানা আনুষ্ঠানিকতা।

জুমার নামাজের পর কনে বাড়িতে আসেন বর তরিকুল ইসলাম ও তার বরযাত্রীরা। পাশের রাজশাহীর তালাইমারী এলাকার বাসিন্দা তরিকুলকে সোনার আংটি দিয়ে বরণ করেন রুহুল আমিন রুবেল। এরপর সম্পন্ন হয় বাঙালি বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা।

একটি সাধারণ ঘর সেদিন যেন পরিণত হয় আনন্দের ঠিকানায়। যে বাড়িতে এতদিন অভাবের ছাপ ছিল, সেই বাড়িতেই বেজে ওঠে বিয়ের সানাই। মায়ের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তি ও আনন্দ।

তিথির মা জহুরা খাতুন বলেন, মেয়ের বিয়ে নিয়ে তিনি অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলেন। রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর তিনি সব দায়িত্ব নেন। নিজের মেয়ের মতো করে বিয়ের আয়োজন করেছেন তিনি। এমন আয়োজন তাদের পরিবারের কাছে ছিল কল্পনারও বাইরে।

নববধূ সুমাইয়া আক্তার তিথি ও বর তরিকুল ইসলামও রুবেলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিথি জানান, বাবা না থাকলেও বিয়ের দিন বাবার অভাব তেমনভাবে অনুভব করতে পারেননি। এত বড় আয়োজন দেখে তিনি নিজেই অবাক হয়েছেন।

বর তরিকুল ইসলামও জানান, কনে বাড়ির আতিথেয়তা ও বিয়ের আয়োজন তাকে মুগ্ধ করেছে। নবদম্পতি তাদের নতুন জীবনের জন্য সবার কাছে দোয়া চান।

আরও পড়ুন

স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও এলাকাবাসীও রুবেলের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তাদের মতে, অসহায় ও এতিম মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়ে বছরের পর বছর বিয়ের দায়িত্ব পালন করা নিঃসন্দেহে একটি মহৎ ও মানবিক কাজ। সমাজের বিত্তবানরা এমন কাজে এগিয়ে এলে আরও অনেক অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফুটবে।

তবে রুহুল আমিন রুবেলের কাছে এসব যেন কোনো প্রচারের বিষয় নয়। তার ভাষ্য, কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, পরকালের জন্যই তিনি গত ২৪ বছর ধরে অসহায়, হতদরিদ্র ও এতিম মেয়েদের বিয়ে দিয়ে আসছেন।

রুবেল বলেন, এটি তার ১১২তম মেয়ের বিয়ে। বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে কেউ যোগাযোগ করলে তিনি খোঁজখবর নেন। সত্যিই অসহায় হলে নিজের তহবিল থেকে বিয়ের যাবতীয় খরচ বহন করেন। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে তিনি নিজের দায়িত্ব ও সৌভাগ্য মনে করেন।

একজন বাবা তার মেয়ের বিয়েতে যে দায়িত্ব পালন করেন, তিথির বেলায় সেই দায়িত্বই যেন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন রুবেল। রক্তের সম্পর্ক নেই, তবুও মেয়ের বিয়েতে বাবার মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।

তিথির জীবনে বাবার শূন্যতা হয়তো কখনো পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু বিয়ের এই দিনটিতে একজন মানুষ তাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন—রক্তের সম্পর্কের বাইরেও কিছু সম্পর্ক তৈরি হয় ভালোবাসা, দায়িত্ব আর মানবিকতা দিয়ে।

১১২টি বিয়ে তাই শুধু একটি সংখ্যার হিসাব নয়, এটি ১১২টি পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর গল্প। এটি এমন এক মানুষের গল্প, যিনি নিজের সামর্থ্য দিয়ে অন্যের ঘরে আনন্দের আলো জ্বালিয়ে চলেছেন বছরের পর বছর।

আরটিভি/টিআর

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
সুন্দরবনে দস্যুদের দৌরাত্ম্য: অপরাধীর তালিকায় এবার দুই নারী
সুন্দরবনে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারের ঘটনা দীর্ঘদিনের। কীটনাশক ও বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করে মাছ ধরছে একটি অসাধু চক্র। সময়ের সঙ্গে বনের বিভিন্ন নদী ও খালে ছড়িয়ে পড়েছে তাদের তৎপরতা।
সুন্দরবনে দস্যুদের দৌরাত্ম্য: অপরাধীর তালিকায় এবার দুই নারী
এবার ব্রহ্মপুত্রের বুকে নৌকায় জন্ম নিল যমজ দুই শিশু
গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায় ব্রহ্মপুত্রের মাঝনদীতে নৌকার মধ্যেই যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন এক গর্ভবতী নারী।
এবার ব্রহ্মপুত্রের বুকে নৌকায় জন্ম নিল যমজ দুই শিশু
রুমিকে আদালতে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ
গাজীপুরের টঙ্গীতে সাত বছর বয়সি এক শিশুকে যৌন হয়রানির অভিযোগের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাদরাসায় হামলা ও ভাঙচুরের মামলায় শাহজালাল রুমিকে চার সপ্তাহের মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
রুমিকে আদালতে আত্মসমর্পণ করার নির্দেশ
ভাঙারি ব্যবসায়ীকে বেধড়ক পিটিয়ে ৯ লাখ টাকা ছিনতাই
নওগাঁর মহাদেবপুরে ভাঙারি ব্যবসার ৯ লাখ ১৩ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় বাধা দেওয়ায় দুর্বৃত্তদের মারধরে দুজন আহত হয়েছেন। 
ভাঙারি ব্যবসায়ীকে বেধড়ক পিটিয়ে ৯ লাখ টাকা ছিনতাই
গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো দুই ইটভাটা, জরিমানা সাড়ে ৬ লাখ টাকা
ঢাকার ধামরাইয়ে অবৈধ দুটি ইটভাটায় অভিযান চালিয়ে ভাটাগুলোর অবকাঠামো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। এ সময় ভাটা দুটির মালিককে মোট ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো দুই ইটভাটা, জরিমানা সাড়ে ৬ লাখ টাকা
আরও পড়ুন
নাটোরে ছাত্রদল নেতা হত্যা মামলায় এমপি পুত্র মিন্টু আবারও রিমান্ডে
নাটোরের পুকুরে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু
আজ দেশের যেসব এলাকায় সকাল থেকে টানা ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না
শনিবার ১১ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায়