ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

ধুমধাম করে ১১২তম মেয়ের বিয়ে

নাটোর প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫১ পিএম
নববধূ সুমাইয়া আক্তার তিথি ও বর তরিকুল ইসলাম। ছবি: আরটিভি

বাবা নেই প্রায় এক দশক। অভাবের সংসারে অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়েকে বড় করেছেন মা। জীবনের নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে মেয়েকে মানুষ করলেও বিয়ের বয়সে এসে সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়ায় তার বিয়ে। সামর্থ্য না থাকায় বড় কোনো আয়োজনের কথা ভাবতেই পারেননি মা।

ঠিক তখনই পাশে দাঁড়ালেন একজন মানবিক মানুষ। শুধু বিয়ের খরচ বহনই নয়, নিজের মেয়ের মতো করে আয়োজন করলেন ধুমধাম করে বিয়ের অনুষ্ঠান। বরযাত্রী আপ্যায়ন থেকে শুরু করে খাবারের আয়োজন, বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা—কোনো কিছুতেই ছিল না কমতি।

এভাবেই গত ২৪ বছরে ১১২ জন অসহায়, হতদরিদ্র ও এতিম মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন নাটোরের বড়াইগ্রামের রুহুল আমিন রুবেল। তার উদ্যোগে এবার রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বালাদিয়া গ্রামের ১৯ বছরের সুমাইয়া আক্তার তিথির বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।

শুক্রবার বালাদিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই পুরো বাড়িতে উৎসবের আমেজ। বাড়ির সামনে বিয়ের কারুকাজ করা গেট। অতিথি ও বরযাত্রীদের আপ্যায়নের জন্য চেয়ার-টেবিল সাজানো। বাড়ির এক পাশে চলছে রান্নার ব্যস্ততা। গরু, খাসি, মুরগি, ডিম ও পোলাওসহ নানা পদের খাবার প্রস্তুত করা হচ্ছে।

চারপাশের এই আয়োজন দেখে বোঝার উপায় ছিল না—এটি একজন বাবা হারানো অসহায় মেয়ের বিয়ে।

বাড়ির জরাজীর্ণ একটি কক্ষের ভেতরে তখন বউ সাজানো হচ্ছিল তিথিকে। একদল নারী ব্যস্ত তাকে সাজাতে। বাইরে উৎসবের ব্যস্ততা, ভেতরে কনের সাজ—সব মিলিয়ে মুখর পুরো বাড়ি।

প্রায় ১০ বছর আগে বাবাকে হারান সুমাইয়া আক্তার তিথি। এরপর মা জহুরা খাতুনই হয়ে ওঠেন তার একমাত্র অবলম্বন। অন্যের বাড়িতে কাজ করে মেয়েকে পড়াশোনা করিয়েছেন, সংসার চালিয়েছেন। অভাবের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করলেও মেয়েকে আগলে রেখেছেন নিজের মতো করে।

কিন্তু মেয়ের বিয়ের বয়স এলে নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েন জহুরা খাতুন। মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও বড় আয়োজনের সামর্থ্য ছিল না তার।

এর মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুহুল আমিন রুবেলের অসহায় ও এতিম মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার কার্যক্রম দেখতে পান তিনি। এরপর যোগাযোগ করেন রুবেলের সঙ্গে। তিথির পরিবারের পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার পর বিয়ের দায়িত্ব নেওয়ার কথা জানান রুবেল।

এরপর ঠিক হয় দিন-তারিখ। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হয় গায়ে হলুদের আয়োজন। শুক্রবার দিনভর চলে বিয়ের নানা আনুষ্ঠানিকতা।

জুমার নামাজের পর কনে বাড়িতে আসেন বর তরিকুল ইসলাম ও তার বরযাত্রীরা। পাশের রাজশাহীর তালাইমারী এলাকার বাসিন্দা তরিকুলকে সোনার আংটি দিয়ে বরণ করেন রুহুল আমিন রুবেল। এরপর সম্পন্ন হয় বাঙালি বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা।

একটি সাধারণ ঘর সেদিন যেন পরিণত হয় আনন্দের ঠিকানায়। যে বাড়িতে এতদিন অভাবের ছাপ ছিল, সেই বাড়িতেই বেজে ওঠে বিয়ের সানাই। মায়ের চোখে-মুখে ফুটে ওঠে স্বস্তি ও আনন্দ।

তিথির মা জহুরা খাতুন বলেন, মেয়ের বিয়ে নিয়ে তিনি অনেক দুশ্চিন্তায় ছিলেন। রুবেলের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর তিনি সব দায়িত্ব নেন। নিজের মেয়ের মতো করে বিয়ের আয়োজন করেছেন তিনি। এমন আয়োজন তাদের পরিবারের কাছে ছিল কল্পনারও বাইরে।

নববধূ সুমাইয়া আক্তার তিথি ও বর তরিকুল ইসলামও রুবেলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিথি জানান, বাবা না থাকলেও বিয়ের দিন বাবার অভাব তেমনভাবে অনুভব করতে পারেননি। এত বড় আয়োজন দেখে তিনি নিজেই অবাক হয়েছেন।

বর তরিকুল ইসলামও জানান, কনে বাড়ির আতিথেয়তা ও বিয়ের আয়োজন তাকে মুগ্ধ করেছে। নবদম্পতি তাদের নতুন জীবনের জন্য সবার কাছে দোয়া চান।

আরও পড়ুন

স্থানীয় মসজিদের ইমাম ও এলাকাবাসীও রুবেলের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেন। তাদের মতে, অসহায় ও এতিম মেয়েদের পাশে দাঁড়িয়ে বছরের পর বছর বিয়ের দায়িত্ব পালন করা নিঃসন্দেহে একটি মহৎ ও মানবিক কাজ। সমাজের বিত্তবানরা এমন কাজে এগিয়ে এলে আরও অনেক অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফুটবে।

তবে রুহুল আমিন রুবেলের কাছে এসব যেন কোনো প্রচারের বিষয় নয়। তার ভাষ্য, কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে নয়, পরকালের জন্যই তিনি গত ২৪ বছর ধরে অসহায়, হতদরিদ্র ও এতিম মেয়েদের বিয়ে দিয়ে আসছেন।

রুবেল বলেন, এটি তার ১১২তম মেয়ের বিয়ে। বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে কেউ যোগাযোগ করলে তিনি খোঁজখবর নেন। সত্যিই অসহায় হলে নিজের তহবিল থেকে বিয়ের যাবতীয় খরচ বহন করেন। পেশায় ব্যবসায়ী হলেও মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে তিনি নিজের দায়িত্ব ও সৌভাগ্য মনে করেন।

একজন বাবা তার মেয়ের বিয়েতে যে দায়িত্ব পালন করেন, তিথির বেলায় সেই দায়িত্বই যেন নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন রুবেল। রক্তের সম্পর্ক নেই, তবুও মেয়ের বিয়েতে বাবার মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।

তিথির জীবনে বাবার শূন্যতা হয়তো কখনো পূরণ হওয়ার নয়। কিন্তু বিয়ের এই দিনটিতে একজন মানুষ তাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন—রক্তের সম্পর্কের বাইরেও কিছু সম্পর্ক তৈরি হয় ভালোবাসা, দায়িত্ব আর মানবিকতা দিয়ে।

১১২টি বিয়ে তাই শুধু একটি সংখ্যার হিসাব নয়, এটি ১১২টি পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর গল্প। এটি এমন এক মানুষের গল্প, যিনি নিজের সামর্থ্য দিয়ে অন্যের ঘরে আনন্দের আলো জ্বালিয়ে চলেছেন বছরের পর বছর।

আরটিভি/টিআর

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় মা, চিকিৎসার টাকা নিয়ে উধাও ছেলে
হাসপাতালে যখন মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছেন মা, ঠিক সেই মুহূর্তে চিকিৎসার জন্য ব্যাংকে জমানো দেড় লাখ টাকা তুলে নিয়ে সটকে পড়েছেন তার বড় ছেলে।  সম্প্রতি লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার করুণানগর এলাকায় ঘটা এই অমানবিক ঘটনাটি এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। অর্থের অভাবে রাজধানীর শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই মায়ের জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে। ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক বছর আগে ওই নারীর স্বামী মারা যান। দুই ছেলে ও দুই মেয়ের সংসারে মা তার বাবার বাড়ির ওয়ারিশি সম্পত্তি বিক্রির ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দুই ছেলে— মোহাম্মদ আলাউদ্দিন ও সালাউদ্দিনের নামে সোনালী ব্যাংকের একটি যৌথ অ্যাকাউন্টে জমা রেখেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, ভবিষ্যতে নিজের বিপদ বা চিকিৎসার প্রয়োজনে এই অর্থ কাজে লাগবে। সপ্তাহখানেক আগে তৃতীয়বারের মতো স্ট্রোক করলে ওই নারীকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকার শ্যামলীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে সংকটজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সকালে মায়ের চিকিৎসার জরুরি খরচের জন্য দুই ভাই আলাউদ্দিন ও সালাউদ্দিন সোনালী ব্যাংক কমলনগর শাখা থেকে যৌথ অ্যাকাউন্টের পুরো টাকা উত্তোলন করেন। তবে টাকা তোলার পরপরই বড় ভাই আলাউদ্দিন কৌশলে ছোট ভাই সালাউদ্দিনকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে এলাকা থেকে গা-ঢাকা দেন। পরবর্তীতে স্বজনরা যোগাযোগের চেষ্টা করলে আলাউদ্দিন সাফ জানিয়ে দেন— মায়ের নামে থাকা জমি তার নামে লিখে না দিলে তিনি চিকিৎসার এই টাকা দেবেন না। ঘটনাটি রোববারের হলেও বুধবার সন্ধ্যায় ভুক্তভোগীর ছোট ছেলে সালাউদ্দিন বিষয়টি গণমাধ্যমকে জানান। ছোট ছেলে সালাউদ্দিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, বড় ভাই বেশ কিছুদিন ধরেই মায়ের জমি নিজের নামে লিখে নিতে চাপ দিচ্ছিলেন। কিন্তু মা রাজি হননি। এখন মায়ের জীবন-মরণ সন্ধিক্ষণে তিনি প্রতারণা করে চিকিৎসার টাকা আটকে রেখে জমি লিখে নেওয়ার শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। টাকার অভাবে মায়ের চিকিৎসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে, আমরা এখন চরম দিশেহারা। ঘটনাটি জানতে পেরে তীব্র নিন্দা জানিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. সোলাইমান বলেন, মায়ের চিকিৎসার জন্য রাখা টাকা তুলে ছেলে চম্পট দেওয়ার ঘটনাটি অত্যন্ত অমানবিক। এমন পাষণ্ড সন্তানের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। করুণানগর এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা আবুল কালাম আফসোস করে বলেন, মাতা-পিতার আত্মত্যাগকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে যে সন্তান মাকে মৃত্যুর মুখে ফেলে টাকা নিয়ে পালাতে পারে, আল্লাহ যেন এমন কুলাঙ্গার সন্তান আর কারো ঘরে না দেন। প্রশাসনের উচিত এ বিষয়ে দ্রুত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। জানা গেছে, অভিযুক্ত আলাউদ্দিন উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের করুণানগর এলাকার মৃত হানিফ বেপারীর বড় ছেলে। ব্যক্তিজীবনে তিনি দুটি বিয়ে করে আলাদা সংসার করছেন। ঘটনার পর থেকে তার মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাহাত উজ-জামান বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত অমানবিক। অসুস্থ মায়ের চিকিৎসার টাকা নিয়ে সটকে পড়া এবং শর্ত জুড়ে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে দ্রুত লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আরটিভি/এসএস
হাসপাতালে মৃত্যুশয্যায় মা, চিকিৎসার টাকা নিয়ে উধাও ছেলে
মাদরাসাছাত্রের শরীরে ব্যথার কারণ থেকে মিলল ‘ভয়ংকর সত্য’
নড়াইলে ৮ বছর বয়সী এক মাদরাসাছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগ উঠেছে হাবিবুর রহমান (১৫) নামের এক কিশোরের বিরুদ্ধে। 
মাদরাসাছাত্রের শরীরে ব্যথার কারণ থেকে মিলল ‘ভয়ংকর সত্য’
থানায় ভাঙচুর চালাল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক ১৭ কিশোর 
কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নেওয়ার পর ১৭ কিশোর কুমিল্লার দাউদকান্দি থানার ভেতর ভাঙচুর চালিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
থানায় ভাঙচুর চালাল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক ১৭ কিশোর 
সাহায্য চাইছিল সড়কে পড়ে থাকা রক্তাক্ত নারী, ছবি তুলতে ব্যস্ত জনতা
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত এক নারী দীর্ঘ সময় রাস্তায় পড়ে থাকলেও তাকে উদ্ধারের বদলে ছবি ও ভিডিও ধারণে ব্যস্ত ছিলেন আশপাশের অনেকে।
সাহায্য চাইছিল সড়কে পড়ে থাকা রক্তাক্ত নারী, ছবি তুলতে ব্যস্ত জনতা
মঠবাড়িয়ায় ৫ লাখের বেশি মানুষ থাকলেও নেই ব্লাড ব্যাংক
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায় পাঁচ লাখের বেশি মানুষের স্বাস্থ্যসেবায় চরম ভোগান্তি আর অনিশ্চয়তার নাম ব্লাড ব্যাংক। উপজেলায় সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো স্থায়ী ব্লাড ব্যাংক বা আধুনিক রক্ত সংরক্ষণাগার না থাকায় জরুরি মুহূর্তে রোগীদের স্বজনদের ছুটতে হয় দিশেহারা হয়ে। সময়মতো রক্ত না পেয়ে অনেক সময় সংকটাপন্ন রোগীদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
মঠবাড়িয়ায় ৫ লাখের বেশি মানুষ থাকলেও নেই ব্লাড ব্যাংক
আরও পড়ুন
হজের স্বপ্নে পায়ে হেঁটে যাত্রা, বেনাপোলে থেমে গেল দুলালের পথ
কবুতরের ঘরে আস্তানা, ২০ সিসিটিভি দিয়েও রক্ষা পেলেন না ‘হ্যাকার সম্রাট’
নাটোর-বগুড়া মহাসড়কের এ কী হাল
সবার অগোচরে পুকুরে ডুবে যায় ভাই-বোন, অতঃপর...