
কোমলমতি শিশুদের মাঝে গাছের চারা বিতরণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করেছে সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘যুবদূত’। এসময় শিক্ষার্থীদের গাছের উপকারিতা সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার পাশাপাশি বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে উৎসাহিত করা হয়।
রোববার (২৩ আগস্ট) ‘যুবদূতের’ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মণিরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হাতে পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন গাছের চারা তুলে দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে অভিভাবকদের হাতে যুবদূতের ‘ইমার্জেন্সি কন্টাক্ট কার্ড’ তুলে দেওয়া হয়। জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী উত্তাল সময়ে ২০২৪ সালের ২৩ আগস্ট সমাজসেবী কাজী শরিফ মাহমুদের নেতৃত্বে দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর হাত ধরে যাত্রা শুরু করে ‘যুবদূত’। তারুণ্যের শক্তিকে ইতিবাচক কাজে কাজে লাগিয়ে সমাজে মানবিকতা, সচেতনতা ও ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে সংগঠনটির পথচলা শুরু হয়। দেখতে দেখতে দুই বছর পূর্ণ করেছে সংগঠনটি।
প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার সুযোগ ও শিক্ষাসামগ্রী পৌঁছে দিতে কাজ করছে যুবদূত। দূর-দূরান্তের গ্রামে গিয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষা উপকরণ তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তাদের মধ্যে ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন জাগিয়ে তুলছেন সংগঠনটির স্বেচ্ছাসেবীরা। প্রতিবছর শিশুদের মাঝে শিক্ষাসামগ্রী বিতরণের মধ্য দিয়ে সংগঠনটির নতুন কার্যক্রমের সূচনা হয়।
_20260823_185054779.jpeg)
শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা তৈরিতেও রয়েছে যুবদূতের বিভিন্ন উদ্যোগ। মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের অনলাইন সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্পর্কেও দেওয়া হচ্ছে প্রয়োজনীয় ধারণা।
মানবিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো, শীতবস্ত্র বিতরণ, বৃক্ষরোপণ এবং শিশুদের ত্বক সুরক্ষায় সচেতনতামূলক উদ্যোগসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে সংগঠনটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে বাল্যবিবাহ, যৌতুক ও ইভটিজিংয়ের বিরুদ্ধেও নিয়মিত সচেতনতার বার্তা তুলে ধরা হয়।
যুবদূতের দর্শনে শিক্ষা শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজেকে জানা, সমাজকে বোঝা এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধ তৈরিও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই লক্ষ্যেই বিভিন্ন সামাজিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে সংগঠনটি।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের জীবন যখন কঠিন হয়ে উঠেছিল, তখন মানুষের নাগালের মধ্যে প্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দিতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেয় যুবদূত। রমজান মাসজুড়ে পরিচালিত হয় ‘রমজান জনসেবা বাজার’। স্বল্পমূল্যে প্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের এ উদ্যোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে এবং সংগঠনটি প্রশংসা অর্জন করে।
তবে এ উদ্যোগ চলাকালে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মুখেও পড়তে হয় সংগঠনটিকে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২২ ফেব্রুয়ারি রাত আনুমানিক ১২টার দিকে একটি সন্ত্রাসী দল স্টলে হামলা চালিয়ে লুটপাট করে। ওই ঘটনায় সামাজিক সংগঠন ও সমাজসেবায় যুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়। তবে ঘটনার পরও নিজেদের সামাজিক কার্যক্রম থেকে সরে আসেনি যুবদূত।

প্রতিকূলতা ও নানা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে দুই বছরে যুবদূত তরুণদের সামাজিক অংশগ্রহণের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে উঠেছে। শিক্ষার্থী ও তরুণদের স্বেচ্ছাসেবা ও মানবিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে তাদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা তৈরির চেষ্টা করছে সংগঠনটি।
দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এবার শিশুদের মাঝে ২ হাজার গাছের চারা বিতরণের উদ্যোগ নিয়েছে যুবদূত। পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের মধ্যে বৃক্ষরোপণ ও প্রকৃতি সংরক্ষণের মানসিকতা গড়ে তুলতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
যুবদূতের প্রতিষ্ঠাতা কাজী শরিফ মাহমুদ বলেন, তারুণ্যের শক্তিকে ইতিবাচক কাজে লাগিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই যুবদূতের মূল লক্ষ্য। শুরুতে স্বপ্নটি ছোট পরিসরে ছিল, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা ও তরুণদের অংশগ্রহণ আমাদের দায়িত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ভবিষ্যতেও শিক্ষা, সচেতনতা, মানবিক সহায়তা ও পরিবেশ রক্ষায় আরও বড় পরিসরে কাজ করতে চাই।
যুবদূতের কার্যনির্বাহী পরিষদের সভাপতি মনিরুজ্জামান বলেন, দুই বছরে আমরা নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছি, কিন্তু কোনো বাধাই আমাদের থামাতে পারেনি। যুবদূতকে শুধু একটি সংগঠন নয়, তরুণদের মানবিক ও সামাজিক কাজে যুক্ত করার একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যুবদূতের প্রতিষ্ঠাতা কাজী শরিফ মাহমুদ, কার্যনির্বাহী পরিষদের সভাপতি মনিরুজ্জামান, সদস্য নুসরাত, প্রান্তি, ফাহিম আব্দুল্লাহসহ সংগঠনের অন্যান্য সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবীরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দুই বছরের পথচলায় যুবদূতের সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন নয়, বরং শিক্ষার্থী ও তরুণদের একটি অংশকে স্বেচ্ছাসেবা, মানবিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা। সেই ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীও কেবল আনুষ্ঠানিক উদযাপনে সীমাবদ্ধ না রেখে শিশুদের হাতে গাছের চারা তুলে দিয়ে পরিবেশ রক্ষার বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে সংগঠনটি।
দুই বছর পেরিয়ে যুবদূতের প্রত্যয় এখন আরও বিস্তৃত, তারুণ্যের শক্তিকে মানবিক ও সামাজিক কাজে নিয়োজিত করে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দেওয়া। প্রতিকূলতা ও নানা চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে সেই লক্ষ্যেই এগিয়ে যেতে চায় সংগঠনটি।
আরটিভি/টিআর



