
জাতীয় পর্যায়ের ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এ প্রথম চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। একই প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি)। দেশের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অংশগ্রহণে আয়োজিত এ প্রতিযোগিতায় মোট পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়কে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় রাজধানীর নভোথিয়েটারে আয়োজিত ইনোভেশন ফেয়ারের সমাপনী অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। এবারের আয়োজনে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৭৮টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় অংশ নেয় এবং প্রদর্শিত হয় ১৫০টির বেশি উদ্ভাবন। এর মধ্যে যবিপ্রবি পাঁচটি উদ্ভাবন নিয়ে মেলায় অংশগ্রহণ করে।
যবিপ্রবির প্রদর্শিত উদ্ভাবনগুলোর মধ্যে ছিল ন্যানো-ইউরিয়া, কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় স্মার্ট সেন্সর, ন্যানো-ক্যারিয়ার ড্রাগ, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য প্রিবায়োটিক এবং সরাসরি পানি থেকে হাইড্রোজেন উৎপাদন প্রযুক্তি। এসব উদ্ভাবন মেলায় গবেষক, নীতিনির্ধারক ও দর্শনার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করে। বিশেষ করে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. জাভেদ হোসেন খানের উদ্ভাবিত ন্যানো-ইউরিয়া প্রদর্শনের জন্য সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে অনুমতি পাওয়ায় যবিপ্রবি প্রতিনিধি দলের মধ্যে বিশেষ উৎসাহ তৈরি হয়।
মেলায় যবিপ্রবির প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনায় ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর, উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শেখ মাহমুদুল হাসান এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফারুক হাসান। মেলার বিভিন্ন পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবনগুলো নিয়ে নীতিনির্ধারক, গবেষক ও দর্শনার্থীদের সঙ্গে প্রতিনিধি দলের সদস্যরা মতবিনিময় করেন।
অর্জনের পর যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর বলেন, ‘এটা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অনেক বড় একটি পাওয়া। আমাদের সব গবেষকের জন্য এটি একটি অনুপ্রেরণা। আমরা আমাদের উদ্ভাবনগুলো নিয়ে খুবই আশাবাদী ছিলাম। প্রতিনিধি দলও অনেক পরিশ্রম করেছে। আমরা এই কাজের ধারা অব্যাহত রাখতে চাই এবং দেশের গবেষণায় বড় ভূমিকা রাখতে চাই।’
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক শেখ মাহমুদুল হাসান বলেন, দেশের ৭৮টি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণে প্রতিযোগিতাটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উদ্ভাবন থেকে কঠোর বাছাইয়ের মাধ্যমে পাঁচটি প্রকল্প মেলায় চূড়ান্তভাবে প্রদর্শনের জন্য মনোনীত করা হয়। মেলায় এসব উদ্ভাবন দর্শনার্থী ও সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের কাছ থেকে ব্যাপক আগ্রহ ও প্রশংসা পেয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘যবিপ্রবি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করায় আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। তবে এই অর্জনকে কেবল মেলা বা গবেষণাগারে সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না; সাধারণ মানুষের কল্যাণে এসব উদ্ভাবন ব্যবহার করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে এই ইনোভেশনগুলো খুব শিগগিরই দেশের সর্বস্তরের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।’
এর আগে মেলায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়ারুল কবীর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারে উদ্ভাবিত পণ্যগুলোকে শিল্প পর্যায়ে নেওয়া এবং বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের জন্য সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। এসব উদ্ভাবন যেন গবেষণাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাজারে এবং মানুষের ব্যবহারিক জীবনে পৌঁছাতে পারে, সে বিষয়ে সরকারের জোরালো ভূমিকা প্রত্যাশা করেন তিনি।
ন্যানো-ইউরিয়ার উদ্ভাবক অধ্যাপক ড. জাভেদ হোসেন খান বলেন, দেশের কৃষির কথা চিন্তা করে তারা ন্যানো-ইউরিয়া উদ্ভাবন করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের যাচাই-বাছাই শেষে পাঁচটি উদ্ভাবন নিয়ে তারা মেলায় অংশ নেন। প্রতিটি উদ্ভাবন বর্তমান সময়ের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় বিচারকদের নজর কেড়েছে। মেলায় অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে এই অর্জন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গবেষক দলকে সার্বিক সহযোগিতা করেছে বলেও জানান তিনি।
কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফারুক হাসান বলেন, এ অর্জন বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত গর্বের। তিনি গবেষক দলকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্মিলিত সহযোগিতায় যবিপ্রবিকে আরও এগিয়ে নিতে হবে।
যবিপ্রবির প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. কিশোর মজুমদার, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিনা আক্তার, পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল ইসলাম, কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. রাফিউল হাসান এবং ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা ইয়াসমিন। এছাড়া বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরাও প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মেলায় অংশ নেন।
বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬-এ যবিপ্রবির এই সাফল্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবন কার্যক্রমে নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে উদ্ভাবনগুলোকে গবেষণাগার থেকে শিল্প ও সাধারণ মানুষের ব্যবহারিক জীবনে নিয়ে যেতে পারলে এ অর্জন আরও কার্যকর ও টেকসই ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা তাদের।
আরটিভি/ এসকেডি




