
রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় নতুন তথ্য উঠে এসেছে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে। নিহত গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর শরীরে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তবে দুজনেরই মৃত্যু শ্বাসরোধ বা গলায় ফাঁস দেওয়ার কারণে হয়েছে বলে জানিয়েছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে আসা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রীতিলতা চক্রবর্তীর যৌনাঙ্গ থেকে অণুবীক্ষণিক পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হলেও বাহ্যিক যৌনাঙ্গে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তার গলার মাঝামাঝি অংশে পুরো গলা ঘিরে আড়াআড়ি লিগেচার মার্ক পাওয়া যায়। ওই দাগের নিচের পেশিতে রক্তজমাটের চিহ্ন ছিল। এ ছাড়া শ্বাসনালি ও খাদ্যনালিতে অতিরিক্ত রক্তসঞ্চালনের চিহ্নও পাওয়া গেছে।
ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের মতে, গলায় ফাঁস বা শ্বাসরোধের কারণে প্রীতিলতার মৃত্যু হয়েছে। আঘাতটি মৃত্যুর আগে করা হয়েছিল এবং মৃত্যুর ধরন হত্যাজনিত। ময়নাতদন্তের সময় থেকে আনুমানিক দুই থেকে চার দিন আগে তার মৃত্যু হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক জোরপূর্বক যৌন কার্যকলাপের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
নিহত মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও প্রায় একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। তার যৌনাঙ্গ থেকেও পরীক্ষার জন্য নমুনা নেওয়া হলেও বাহ্যিক কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। গলার মাঝামাঝি অংশে পুরো গলা ঘিরে লিগেচার মার্ক এবং ওই দাগের নিচের টিস্যুতে ব্যাপক রক্তক্ষরণের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
তবে প্রার্থীর শরীরে আরও কয়েকটি আঘাতের চিহ্ন ছিল। তার থুতনির ডান পাশে আঘাত ও ফোলা দেখা গেছে। ডান চোখের বাইরের অংশ এবং গালের হাড়ের কাছেও ফোলা ছিল। শরীর আংশিক পচে যাওয়ায় বিভিন্ন ধরনের পোস্টমর্টেম পরিবর্তনের চিহ্নও পাওয়া গেছে।

রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বাবলু কুমার বিশ্বাস বলেন, প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছিল। পরীক্ষার প্রতিবেদনে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি।
তিনি বলেন, ধর্ষণের বিষয়ে মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান কোনো আলামত থাকলে তা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। দৃশ্যমান আলামত না থাকলে প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত মতামত দেওয়া হয়।
এর আগে, শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরের কামালকাছনা-মাছুয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
এ ঘটনায় রোববার ভোরে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ নামে দুজনকে আটক করা হয়। পরে ওই দিন বিকেলে নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী বাদী হয়ে থানায় হত্যা মামলা করেন।
রোববার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের প্রাথমিক কারণ ও ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশের একটি ভবনের ছাদ দিয়ে তার বাড়ির ছাদে প্রবেশ করেন মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিলেন বলে দাবি পুলিশের। এ সময় গণপতি চক্রবর্তী ছাদে উঠে তাদের দেখতে পান এবং মাদক সেবন ও সেখানে আড্ডা দেওয়ার বিষয়ে বকাঝকা করেন।
পুলিশের দাবি, বিষয়টি অন্যদের জানিয়ে দিতে পারেন এমন আশঙ্কা থেকেই দুই যুবক গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেন। একপর্যায়ে সঙ্গে থাকা গামছা দিয়ে তার গলায় পেঁচিয়ে ধরলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়।
পুলিশ কমিশনারের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপতি চক্রবর্তীর বাঁচার চেষ্টা ও শব্দ শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ওপরে যাওয়ার চেষ্টা করলে সিঁড়িতে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে তাদের ২৫ বছর বয়সী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী এগিয়ে এলে তাকেও হত্যার চেষ্টা করা হয়।
পুলিশের দাবি, প্রার্থীকে হত্যা করতে চার থেকে পাঁচ মিনিট সময় লাগে। একপর্যায়ে আসামিরা রশি দিয়ে তার গলা ও মুখ পেঁচিয়ে জোরে টান দেয়। এতে তার চোয়াল ভেঙে যায় এবং চোখ বেরিয়ে আসে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। পরে ঘরে থাকা ১২ বছর বয়সী আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকেও হত্যা করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য, প্রিয়ম আসামিদের চিনত এবং ভবিষ্যতে সে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অন্যদের জানিয়ে দিতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই তাকে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ ওই বাড়ির ওয়াশরুমে গোসল করেন। পরে সেখানে বসেই আবার ইয়াবা সেবন করেন বলে পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। এরপর তারা বাসার আসবাবপত্র তল্লাশি করে স্বর্ণালংকার বের করেন।
পুলিশের দাবি, সিদ্ধার্থ একটি স্বর্ণের দোকানে কাজ করেন। এ কারণে আগুন দিয়ে পরীক্ষা করে কোনটি আসল স্বর্ণ, তা শনাক্ত করে নেওয়া হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার জুমার নামাজের সময় আশপাশের লোকজন মসজিদে গেলে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের বাড়ির ছাদ দিয়ে ঘটনাস্থল থেকে বেরিয়ে যান। বের হওয়ার আগে তারা ডাইনিং টেবিলে বসে বয়ামে রাখা খেজুর খান। এ ছাড়া মাদকের প্রভাব কমানোর জন্য ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খাওয়ার কথাও জানিয়েছে পুলিশ।
তবে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত কার্যক্রম ও ফরেনসিক পরীক্ষার অন্যান্য ফলাফলের ভিত্তিতে পরবর্তী সময়ে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
আরটিভি/এসকে


