
হবিগঞ্জের মাধবপুরে সম্প্রতি অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল ও ঘন ঘন লোডশেডিং নিয়ে প্রতিবাদের জেরে দায়ের হওয়া একাধিক মামলায় ৮০ হাজার টাকা নেওয়ার মাধ্যমে আপোশ-মীমাংসার আলোচনা এবং মামলা চলমান থাকা অবস্থায় ভুক্তভোগীদের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখার অভিযোগ উঠেছে হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) জিল্লুর রহমানের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে বিরোধের ঘটনায় মামলা হওয়ার পর তাদের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। পরে মামলা মীমাংসা ও জরিমানার নামে ৮০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়।
এমন অভিযোগ করেছেন মাধবপুর উপজেলার আন্দিউরা গ্রামের ইউপি সদস্য প্রার্থী সোহেল মিয়া, বাঘাসুরা গ্রামের কৃষক রুমন মিয়াসহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভুক্তভোগী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এক কর্মচারী দাবি করেন, বিভিন্ন ঘটনায় এভাবে অনেক গ্রাহকের কাছ থেকে জরিমানা বা অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে তার কাছে স্পষ্ট তথ্য নেই। ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, ফৌজদারি মামলায় আদালতের বাইরে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একজন জিএম কীভাবে মামলা মীমাংসার অর্থ নির্ধারণ করেন। এ ধরনের ঘটনায় সরকারি কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও তারা তদন্ত দাবি করেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ সেপ্টেম্বর মাধবপুরের বাঘাসুরা গ্রামের সাজু মিয়ার ছেলে রোমান মিয়ার সঙ্গে তেলিয়াপাড়া অভিযোগ কেন্দ্রের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মীদের বিরোধ ও মারামারির ঘটনা ঘটে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে প্রতিবাদের একপর্যায়ে এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় মামলা হয়। পরে জিএম জিল্লুর রহমান ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সদস্য সচিব জহিরুল ইসলামের মাধ্যমে ৮০ হাজার টাকার বিনিময়ে মামলা আপোশের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি নথি প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, মামলা হওয়ার পরও তার বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে গত ১২ আগস্ট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদ করাকে কেন্দ্র করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মচারী দেলোয়ার মিয়ার সঙ্গে স্থানীয় ইউপি সদস্য প্রার্থী সোহেল মিয়ার বিরোধ ও মারামারির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায়ও মামলা হয়।
সোহেল মিয়ার দাবি, তার বাবার নামে থাকা বিদ্যুৎ সংযোগে নতুন করে সংযোগ দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি তার স্ত্রী ও ভাইয়ের নামে সংযোগের জন্য আবেদন করলেও তা গ্রহণ করা হচ্ছে না। পল্লী বিদ্যুতের পক্ষ থেকে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংযোগ দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছে।
সোহেল মিয়া বলেন, আমি যদি কোনো অপরাধ করে থাকি, আদালত তার বিচার করবে। কিন্তু মামলা চলমান থাকার কারণে আমার বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখা অন্যায় বলে মনে করি। এতে আমার স্কুলপড়ুয়া সন্তানসহ পরিবারের সদস্যরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। আমি পল্লী বিদ্যুতের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ন্যায়বিচার চাই।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, জিএমের ঘনিষ্ঠ একজনের মাধ্যমে মামলা মীমাংসা ও জরিমানার নামে ৮০ হাজার টাকা দেওয়ার বিষয়ে তার কাছে কিছু প্রমাণ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন অভিযোগ করেন, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামলা করে পরে মামলা মীমাংসার নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগগুলো তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। কেউ অপরাধ করলে আদালত বিচার করবে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি নিজে মামলা মীমাংসার নামে অর্থ আদায় করতে পারে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।
এদিকে জিএম জিল্লুর রহমানের বিরুদ্ধে হবিগঞ্জের মাধবপুর, চুনারুঘাট ও নবীগঞ্জে চারটি স্থানে সাবস্টেশন নির্মাণের জন্য প্রায় ১২০ শতাংশ জমি ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। ভূমির মালিকদের সঙ্গে গোপনে সমঝোতা করে কমিশন নেওয়ার মাধ্যমে সরকারকে জমি বিক্রির অভিযোগ নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখালেখি হয়েছে। এছাড়া দালালের মাধ্যমে খুঁটি ও নতুন সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে কমিশন বাণিজ্য এবং বড় অঙ্কের বকেয়া থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করার অভিযোগও রয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
মাধবপুরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির বিপুল অঙ্কের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকার অভিযোগের মধ্যেই সম্প্রতি সুরমা চা বাগানের হতদরিদ্র চা শ্রমিক রবি লাল গৌড়ের বিদ্যুৎ সংযোগ মাত্র ৫১১ টাকা বকেয়ার কারণে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার ঘটনা ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন দরিদ্র চা শ্রমিকের সামান্য বকেয়ার কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও বড় অঙ্কের বকেয়া থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।
হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধবপুর জোনাল অফিসের এটিএম আবুল হাসানের কাছে মামলা চলমান থাকা অবস্থায় গ্রাহকের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা এবং এ বিষয়ে আদালতের কোনো নির্দেশনা রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি জিএম জিল্লুর রহমান স্যার দেখছেন।
স্থানীয় সমাজসেবক ও মাধবপুর মডেল প্রেসক্লাবের সভাপতি ফরাশউদ্দীন বলেন, কারো বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রেখে মামলা মীমাংসায় বাধ্য করা হলে বিষয়টি তদন্ত করা প্রয়োজন। মামলা মীমাংসা করা সরকারি কর্মকর্তার কাজ কিনা, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার। কতজনের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটেছে, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা উচিত। একই সঙ্গে চারটি সাবস্টেশনের জমি ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগও তদন্ত করা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) জিল্লুর রহমান বলেন, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গায়ে হাত তোলার ঘটনায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।
তার ভাষ্য, সরকারি কর্মচারীদের ওপর হামলার ঘটনায় এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জরিমানা আদায়ের বিষয়টিও নিয়ম মেনে করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
তবে এ পর্যন্ত কতজনকে এ ধরনের ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে এবং কত টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে— এ বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। পরে তাকে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।
হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সভাপতি শাহ আলম বলেন, সোহেল মিয়ার বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করছি। আমরা অনেক সময় জিএমকে অনুরোধ করি এসব ঝামেলা সমাধানের জন্য। এখানে খারাপ কিছু দেখি না। আর জমি ক্রয়ে কোনো অনিয়ম হয়নি।
এ বিষয়ে পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির উপপরিচালক জুলহাস উদ্দিন বলেন, আমরা বিষয়গুলো খোঁজখবর নিয়ে দেখব। কেউ অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরটিভি/এমএইচজে


