
রবি ও বোরো মৌসুম সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। এক বস্তা সারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে কৃষকদের। কোথাও আবার সার নিতে গিয়ে ডিলারদের লোকজনের হাতে হয়রানি ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। এতে সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারায় বোরোসহ রবি ফসলের উৎপাদন নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা।
নাটোরের সিংড়া উপজেলার শেরকোল শাহী বাজারের মেসার্স সাফী এন্টারপ্রাইজের সামনে বুধবার সকাল থেকেই সার নিতে ভিড় করেন নারী-পুরুষসহ শতাধিক কৃষক। তবে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও দোকানের শাটার খোলেনি। এ সময় কৃষকদের সঙ্গে ডিলারের লোকজনের তর্ক-বিতর্ক ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।
চকপুর গ্রামের কৃষাণী শামসুন নাহার বেওয়া বলেন, প্রায় ৪০ বিঘা জমিতে রবিশস্য ও বোরো ধান চাষ করেন তিনি। স্বামী-সন্তান কেউ না থাকায় কৃষিকাজই তার আয়ের প্রধান অবলম্বন। সারের প্রয়োজনেই বাধ্য হয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। তবে দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও সার না পাওয়ায় খালি হাতে বাড়ি ফেরার আশঙ্কা করছেন তিনি।
খরমকুড়ি গ্রামের কৃষক জাহেদুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, মঙ্গলবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও ডিলারের ছেলের কাছ থেকে নানা অবান্তর কথা ও গালাগালি শুনতে হয়েছে। সার নেওয়ার জন্য তারা গ্রাম থেকে ৫০০ টাকা ভাড়ায় ভ্যানও এনেছিলেন। পরে চার বস্তা সারের টাকা জমা নিয়ে তাদের দেওয়া হয় মাত্র দুই বস্তা। তবে জমা টাকা কিংবা ফেরত দেওয়া টাকার কোনো রসিদ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা।
বুধবার আবার বাকি সার নিতে গেলে ডিলারের ছেলে ও তার লোকজন খারাপ ব্যবহার করেন বলেও অভিযোগ করেন তারা। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ডিলার মিজানুর রহমান।
সিংড়ার কৃষকরা জানান, টিএসপি সারের চাহিদা বেশি থাকায় অনেকেই তা পাচ্ছেন না। কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শে ডিএপি সার নিতে গেলেও অনেক ক্ষেত্রে ইউরিয়া সার নিতে বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
সিধাখালী গ্রামের কৃষক জিয়াউর রহমান জিয়া অভিযোগ করেন, তাকে সার দেওয়া হয়নি। অথচ সার দেওয়া হয়েছে বলে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
ভাগনাগরকান্দি গ্রামের কৃষক আবুল বাসার বলেন, জমিতে সরিষা, ভুট্টা ও আলু চাষের উপযোগী সময় চলে এসেছে। কিন্তু দুদিন ধরে ডিলারের দোকানে ঘুরেও সার পাননি তিনি। তার অভিযোগ, সার না পাওয়ার পাশাপাশি ডিলারের লোকজনের দুর্ব্যবহারেরও শিকার হতে হচ্ছে কৃষকদের।
এদিকে মানিকগঞ্জের দৌলতপুরেও সার নিতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কৃষকরা। উপজেলার কলিয়া ইউনিয়নে ডিলার আবদুর রাজ্জাকের দোকানের সামনে বুধবার সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকরা জড়ো হতে থাকেন।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, বেশ কিছুদিন ধরে সার সংকটের কথা বলে আসছিলেন ডিলার। বুধবার সার দেওয়া হবে এমন খবর পেয়ে সকাল থেকেই শত শত কৃষক দোকানের সামনে অবস্থান নেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভিড় আরও বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে বিপুলসংখ্যক কৃষকের উপস্থিতি দেখে ডিলার সার বিক্রি বন্ধ করে পুলিশে খবর দেন।
এতে অপেক্ষমাণ কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে কয়েকজন কৃষক সারের গোডাউনে প্রবেশের চেষ্টা করেন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ আসে। সেখানে দৌলতপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রবীর বিশ্বাস এবং উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. লুৎফে আল মুঈজও উপস্থিত হন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জানান, ওই ডিলার ৭০৬ বস্তা সার বরাদ্দ পেয়েছেন। বিভিন্ন ধরনের সার বিতরণের সময় কয়েকশ কৃষক একসঙ্গে ভিড় করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। একপর্যায়ে কয়েকজন কৃষক গোডাউনের দরজা-জানালা ভেঙে ফেলার চেষ্টা করেন। পরে গ্রাম পুলিশ দিয়ে কৃষকদের মধ্যে সার বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়।
কৃষকদের দাবি, সময়মতো সার না পেলে রবি ও বোরো মৌসুমের আবাদ ব্যাহত হবে। তাই দ্রুত সার সংকটের সমাধান এবং ডিলারদের বিরুদ্ধে ওঠা হয়রানি ও অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
আরটিভি/এসকে



