
ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরায় নিজস্ব ভবন না থাকায় বছরের পর বছর ধরে ভাড়া নেওয়া জরাজীর্ণ আধাপাকা টিনশেডের ঘরে চলছে একমাত্র প্রধান পোস্ট অফিসের কার্যক্রম। সংকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এ ঘরে সীমিত পরিসরে চলছে দাপ্তরিক কাজ। ফলে ব্যাহত হচ্ছে ডাক বিভাগের স্বাভাবিক কার্যক্রম, আর কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীরা। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালুর সুযোগ না থাকায় এখনো অনেকটা সনাতন পদ্ধতিতেই চলছে পোস্ট অফিসটির কার্যক্রম।
অন্যদিকে, জরাজীর্ণ ভবনে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও বিভিন্ন পরীক্ষার উত্তরপত্র সংরক্ষণ করতে গিয়ে আতঙ্কে থাকতে হয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। রাতে একই ঘরের একাংশে তাঁদের থাকতে হয় বলেও জানিয়েছেন পোস্ট অফিসটির দায়িত্বপ্রাপ্ত পোস্টমাস্টার মো. আবু তাহের।
তিনি জানান, স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পরীক্ষার সময় তাঁদের উদ্বেগ বেড়ে যায়। এসএসসি, এইচএসসি, সমমান ও ডিগ্রি পরীক্ষার উত্তরপত্র এ টিনশেডের ঘরেই রাখতে হয়। এ সময় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরপত্রের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
জানা গেছে, ২০০২ সালে নদীভাঙনের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে পোস্ট অফিসের তিনতলা ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। এরপর থেকে আর স্থায়ী ভবনে ফেরা হয়নি পোস্ট অফিসটির। স্থানীয় রফিকুল ইসলামের কাছ থেকে মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা ভাড়ায় নেওয়া একটি আধাপাকা টিনশেডের ঘরে চলছে এর কার্যক্রম।
দীর্ঘদিনের এ সংকট নিরসনে ২০২১ সালে পোস্ট অফিসের জন্য দেড়তলা পাকা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয়। তবে পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। ফলে নতুন ভবনে কার্যক্রম স্থানান্তরের অপেক্ষায় রয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সেবাপ্রত্যাশীরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পাওয়ার হাউস-সংলগ্ন ছোট একটি জরাজীর্ণ আধাপাকা টিনশেডের ঘরে চলছে পোস্ট অফিসের কার্যক্রম। ভেতরে রয়েছে দুটি কাঠের টেবিল, দুটি ভাঙাচোরা আলমারি, চারটি চেয়ার এবং ডাক বিভাগের কিছু কাগজপত্র। ঘরটির সামনের অংশে দাপ্তরিক কাজ করা হয়, আর পেছনের অংশে রাত কাটান কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
পোস্টমাস্টার, পোস্টম্যান ও প্যাকারম্যানকে সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই সরকারি চিঠিপত্র গ্রহণ, বাছাই ও বিতরণের কাজ করতে দেখা গেছে। বর্তমানে চিঠিপত্র আদান-প্রদান ও সীমিত পরিসরে মানি অর্ডার-সংক্রান্ত কার্যক্রম ছাড়া অন্যান্য সেবা বন্ধ রয়েছে। ভবন ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি রয়েছে লোকবলসংকট। এতে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।
ডাক বিভাগের আওতায় চিঠি, পার্সেল, মানি অর্ডার ও ইলেকট্রনিক মানি অর্ডারসহ বিভিন্ন সেবা থাকলেও মনপুরা পোস্ট অফিসে এসব সেবার বেশির ভাগই পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের।
তাঁদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় সেবা না পাওয়ায় চিঠি ও পার্সেল পাঠাতে তাঁরা বেসরকারি কুরিয়ার সার্ভিসের ওপর নির্ভর করছেন। ঝুঁকিপূর্ণ টিনশেডের ঘর হওয়ায় অনেকে পোস্ট অফিসে পার্সেল পাঠাতেও আগ্রহী নন। অন্যদিকে, মানি অর্ডারের খরচ বেশি মনে হওয়ায় আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে নগদ ও বিকাশের মতো মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহার করছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে মনপুরা পোস্ট অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত পোস্টমাস্টার মো. আবু তাহের জানান, ‘স্থায়ী পাকা ভবন না থাকায় আমরা কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছি না। এ ছাড়া লোকবলসংকটও রয়েছে। নতুন ভবনের নির্মাণকাজ চলমান। সেখানে আইসিটি কর্নার থাকবে। ভবনটি চালু হলে আধুনিক ও ডিজিটাল সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।’
সংশ্লিষ্টদের মতে, ডাক বিভাগের সেবা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে মনপুরা পোস্ট অফিসের স্থায়ী ভবন নির্মাণের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালু করা গেলে দ্বীপ উপজেলার বাসিন্দাদের ভোগান্তি কমবে এবং সরকারি ডাকসেবার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।
আরটিভি/টিআর




