ঢাকা সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৮ কার্তিক ১৪৩৩

কেন ভুল সময়ে বাসে উঠেছিল তাজমিন

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ১২ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৮ পিএম
স্কুলশিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন। ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজার থেকে কুমিল্লায় ফিরতে সাধারণত ৯ থেকে ১১ ঘণ্টা সময় লাগে। এ পথে যাতায়াতকারী অধিকাংশ যাত্রী রাত ১০টা থেকে ১২টার মধ্যে নাইট কোচে রওনা হন, যাতে ভোরের আলোয় কুমিল্লায় পৌঁছানো যায়। কিন্তু কুমিল্লার স্কুলশিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৫) কেন দুপুরে কক্সবাজার থেকে বাসে উঠেছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তাজমিনের যাত্রার সময় নির্ধারণ, টিকিট কেনা এবং গভীর রাতে কুমিল্লায় পৌঁছানোর বিষয়টি এখন আলোচনায়। বিশেষ করে, একা ভ্রমণ করা একজন কিশোরীর নিরাপত্তার বিষয়টি কেন গুরুত্ব পায়নি, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

কক্সবাজার আইকনিক বাসের টিকিট কাউন্টারের কর্মী আবদুল্লাহ বলেন, তাজমিন ও তার সঙ্গে থাকা রিয়াজ উদ্দিন রাজু ওরফে রাজু চৌধুরীর (২০) বিষয়টি বোঝা উচিত ছিল। দিনে রওনা হলে রাতে কুমিল্লায় পৌঁছাতে হবে। তিনি বলেন, ‘আমি বলতে চাইছিলাম ওদের, কিন্তু কাস্টমারের চয়েজ থাকতে পারে তাই বলা হয়নি।

জানা যায়, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত আনুমানিক ৮টা থেকে ৯টার দিকে তারা টিকিট কাটতে যান। পরদিন বুধবার দুপুর ১২টার টিকিট কেনেন। বাসটি ছাড়ে দুপুর ১টার দিকে। তাজমিন একা ভ্রমণ করায় তার জন্য একটি সিটের টিকিট কাটেন রাজু।

একজন কিশোরীর জন্য একক টিকিটের বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও দিনের বেলায় রওনা দিয়ে গভীর রাতে অপরিচিত শহরে পৌঁছানোর নিরাপত্তা নিয়ে কেন ভাবা হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে স্পষ্ট কোনো উত্তর মেলেনি।

রাজুর দাবি, কক্সবাজারে অবস্থানকালে তাজমিনের বাবা তাকে একাধিকবার ফোন করে অবস্থান জানতে চান এবং বাড়ি ফিরে আসার অনুরোধ করেন। তাজমিনকে বাবার কাছে বলতে শুনেছিলেন, সে শিগগিরই বাড়ি ফিরবে। এরপর মঙ্গলবার রাতে তারা আইকনিক এক্সপ্রেস বাসের টিকিট কাটেন। পরদিন বুধবার বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হন তাজমিন।

রাজুর ভাষ্য, তাজমিনকে নিরাপদে কুমিল্লার বাসায় পৌঁছানোর বিষয়ে তার সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ ছিল। তারপরও ঘটে যায় হত্যাকাণ্ড।

রাজু আরও দাবি করেন, হাতঘড়ি নিয়ে মায়ের সঙ্গে ঝগড়ার জেরে তাজমিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। তাজমিন তাকে জানিয়েছিলেন, তার সৎমা আছেন এবং আপন মা মারা গেছেন। পরে তিনি এক বান্ধবীর বাসায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যান। সেখান থেকে কুমিল্লায় ফিরে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকেই রাজুর সঙ্গে তাজমিনের যোগাযোগ শুরু হয়। এরপর মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে তিনি কক্সবাজারে পৌঁছান।

তবে রাজুর এসব বক্তব্যের সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

পরিবারের দাবি, ৪ অক্টোবর তাজমিন বাসা থেকে বেরিয়ে যান। এরপর থেকে তিনি নিজের ইচ্ছামতো চলাফেরা করছিলেন। এ সময়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ থাকলেও তিনি কোথায় এবং কার কাছে ছিলেন, তা পরিবার নিশ্চিতভাবে জানতে পারেনি।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হত্যাকাণ্ডের পর তাজমিনের আইফোনের অবস্থান শনাক্ত করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে তার যাতায়াতের তথ্য পাওয়া যায়।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের ধারণা, বাবা-মায়ের বারবার বাড়ি ফেরার তাগিদ এবং প্রয়োজনে তাকে নিতে যাওয়ার আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে তাজমিন দ্রুত বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকতে পারেন। তবে যাত্রার সময় এবং গভীর রাতে কুমিল্লায় পৌঁছানোর নিরাপত্তার বিষয়টি তার সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলেছিল, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

ঘটনার দিন বুধবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তাজমিনের মা কেয়া খাতুন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে। মেয়েকে নিয়ে আসতে বান্ধবীর বাড়িতে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। এ জন্য বান্ধবীর নাম এবং তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও তাজমিন কিছু জানায়নি।

কেয়া খাতুন আরও জানান, মেয়ের বন্ধুবান্ধব নিয়ে আগে থেকেই তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। কোনো অঘটন ঘটতে পারে এমন আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি। মেয়েকে চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করতেন এবং তার চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে খোঁজ নিতেন। কিন্তু এত সতর্কতার পরও মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি বলে আক্ষেপ করেন তিনি।

এদিকে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, তাজমিনের মা যে বান্ধবীর কথা উল্লেখ করেছেন, তিনি বয়সে তাজমিনের চেয়ে বড় এবং কুমিল্লায় থাকেন। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। তবে হত্যাকাণ্ডে ওই বান্ধবীর সম্পৃক্ততার কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। একইভাবে রাজুর সম্পৃক্ততার বিষয়টিও তদন্তে নিশ্চিত হয়নি।

পুলিশের ভাষ্য, তাজমিনকে হত্যার ঘটনায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া (৩৫) জড়িত। শনিবার রাতে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে ঘটনার সব দিক খতিয়ে দেখতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

তদন্তের প্রয়োজনে আটক রাজুকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তথ্য যাচাই-বাছাই করতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কুমিল্লা থেকে কক্সবাজারে গেছেন। জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তের পর তাজমিনের যাত্রা, তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং হত্যাকাণ্ডের আগে-পরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

সচেতন নাগরিক কমিটি, কুমিল্লার সাবেক সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খানের মতে, রাজুর সঙ্গে তাজমিনের সম্পর্ক না থাকলে হয়তো তাকে কক্সবাজার যেতে হতো না। সে ক্ষেত্রে এমন বিপদের মুখে পড়ার আশঙ্কাও এড়ানো যেত বলে মনে করেন তিনি।

পুলিশ জানায়, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে বাসে নেমে কুমিল্লা শহরের রেইসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেন তাজমিন। পরদিন বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

তাজমিন কেন দুপুরে বাসে উঠেছিলেন, গভীর রাতে কুমিল্লায় পৌঁছানোর পর কী ঘটেছিল এবং কীভাবে তিনি হত্যার শিকার হলেন এসব প্রশ্নের কিছু উত্তর পুলিশের তদন্তে উঠে এলেও ঘটনার প্রতিটি দিক যাচাই করা এখনো জরুরি।

আরটিভি/এসকে

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
গৃহবধূর আপত্তিকর ভিডিওধারণ করে ব্ল্যাকমেইল, ইমাম ধরা
মুন্সীগঞ্জের টংগিবাড়ীতে এক গৃহবধূর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের সূত্র ধরে গোপনে আপত্তিকর ভিডিওধারণ এবং তা ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগে নূর আলম শেখ (৩২) নামে এক ধর্মীয় শিক্ষককে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। 
গৃহবধূর আপত্তিকর ভিডিওধারণ করে ব্ল্যাকমেইল, ইমাম ধরা
গাজীপুরে পুলিশের ৩ গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, সাংবাদিক ও বিজিবি সদস্য আহত
শ্রমিক আন্দোলনে আজও উত্তপ্ত গাজীপুরের দুই মহাসড়ক। ইতোমধ্যে ছুটি দেওয়া হয়েছে দেড় শতাধিক কারখানা। এসব কারখানার শ্রমিকরা মহাসড়কে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করছেন। 
গাজীপুরে পুলিশের ৩ গাড়িতে অগ্নিসংযোগ, সাংবাদিক ও বিজিবি সদস্য আহত
৪৭ বছর বয়সে এইচএসসি পাস করলেন আমিনুল, এবার আইন বিষয়ে পড়ার স্বপ্ন
গাজীপুরের শ্রীপুরে ৪৭ বছর বয়সে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য মো. আমিনুল ইসলাম। ১৯৯৯ সালে এসএসসি পাসের পর দীর্ঘ ২৭ বছর পড়াশোনার বাইরে ছিলেন তিনি।
৪৭ বছর বয়সে এইচএসসি পাস করলেন আমিনুল, এবার আইন বিষয়ে পড়ার স্বপ্ন
এবার পোশাক শ্রমিকদের ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক অবরোধ
ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক অবরোধ করেছেন কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এতে সড়কটিতে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
এবার পোশাক শ্রমিকদের ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক অবরোধ
শ্রমিক অসন্তোষে বন্ধ ৬৭০ পোশাক কারখানা: বিজিএমইএ
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের পুনর্নিয়োগ এবং আন্দোলনরত শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে শ্রমিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রধান তিনটি শিল্পাঞ্চলে।
শ্রমিক অসন্তোষে বন্ধ ৬৭০ পোশাক কারখানা: বিজিএমইএ
আরও পড়ুন
কুমিল্লায় মাটি খুঁড়তে গিয়ে মিলল অবিস্ফোরিত মর্টার শেল
পদ হারালেন কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের আমির ও নায়েবে আমির
প্রবেশপথে ময়লা-আবর্জনা, নাক চেপে স্কুলে ঢুকতে হয় শিক্ষার্থীদের
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও দেখে কিশোর গ্যাংয়ের ৪ সদস্য ধরা