
জেলার বীরগঞ্জ উপজেলায় ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের আয়োজনে জীবন সঙ্গী খুঁজতে ২৩ অক্টোবর বসতে যাচ্ছে ২শ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী এক ব্যতিক্রমী ‘বউ মেলা’।
যেখানে শুধু কেনাকাটা কিংবা বিনোদনের জন্য নয় দূর-দূরান্ত থেকে আসা তরুণ-তরুণীদের অনেকেই আসেন তাদের পছন্দের জীবন সঙ্গী খুঁজতে।
এ মেলার আয়োজনকারী দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলা আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির সভাপতি শীতল মার্ডীর সঙ্গে বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) আলাপকালে তিনি মেলা আয়োজনের সার্বিক তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, আগামীকাল শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) তাদের সমিতির আয়োজনে সারা দিনব্যাপী বীরগঞ্জ উপজেলার গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে এ ঐতিহ্যবাহী ‘বউ মেলার’ উদ্বোধন ঘোষণা করবেন, দিনাজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মনজুরুল ইসলাম।
তিনি আরও বলেন, প্রতিবছর শারদীয় দুর্গাপূজার এক বা দু’দিন পর এ মেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। প্রায় ২শ’ বছরের পুরোনো এ আয়োজন ঘিরে প্রতি বছরই তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। স্থানীয়দের কাছে এটি বাসিয়াহাট মেলা বা বউ মেলা নামেও পরিচিত। ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর মানুষের ঐতিহ্যবাহী মিলন-মেলা হিসেবে এর বেশ পরিচিতি রয়েছে।
সমিতির সভাপতি শীতল মার্ডী বলেন, মেলা উপলক্ষে ওই দিন সকাল থেকেই উপজেলার গোলাপগঞ্জ স্কুল মাঠ ও আশপাশের এলাকায় বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। বিভিন্ন বয়সী মানুষের পাশাপাশি বিবাহ যোগ্য তরুণ-তরুণীদের উপস্থিতি এ ‘বউ মেলার’ অন্যতম আকর্ষণ।
ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের জীবনসঙ্গী খোঁজার ঐতিহ্য এ মেলার সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, এখানে অনেক তরুণ-তরুণী নিজেদের পছন্দের জীবনসঙ্গী খোঁজার সুযোগ পেয়ে থাকেন। কারও সঙ্গে পছন্দ ও বোঝাপড়া তৈরি হলে বিষয়টি পরবর্তীতে পরিবারের কাছে জানানো হয়। দুই পরিবারের সম্মতি থাকলে পরবর্তী সময়ে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ের আয়োজন করা হয়ে থাকে।
বীরগঞ্জ উপজেলা আদিবাসী উন্নয়ন সমিতির সাধারণ সম্পাদক কমলা কান্ত হাসদা বলেন, মেলায় কাউকে পছন্দ করলেই সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে—এমন নয়। বরং মেলাটি অনেকের জন্য পরিচয় ও জীবনসঙ্গী নির্বাচনের একটি ঐতিহ্যবাহী সামাজিক পরিসর হিসেবে কাজ করে। এ মেলায় দূর-দূরান্ত থেকে শুধু নয়, বীরগঞ্জ বা দিনাজপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকেও মানুষ এ মেলায় আসেন। বিশেষ করে ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অংশ গ্রহণ মেলার ঐতিহ্যকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলে।
তিনি বলেন, তরুণ-তরুণীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সেজে মেলায় আসেন। কেউ আসেন বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। মেলা মানেই উৎসব, জীবনসঙ্গী খোঁজার বিষয়টির পাশাপাশি এ মেলা পরিণত হয় বিশাল এক লোকজ উৎসবে। মাঠজুড়ে বসে নানা ধরনের দোকান। এ মেলায় মিষ্টি, ফুচকা, জিলাপি, পিঠা, ও প্রসাধনীসহ বিভিন্ন গৃহস্থালির সামগ্রী এবং মাটির তৈরি বিভিন্ন জিনিস পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, মেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশগুলোর একটি হলো সাংস্কৃতিক আয়োজন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী নাচ-গান, ঢোল, মন্দিরাসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের তালে পুরো এলাকা মুখর হয়ে ওঠে।
স্থানীয় আদিবাসী নেতা ও অবসর প্রাপ্ত শিক্ষক হাবিব লাকড়ার ভাষ্য অনুযায়ী, এ ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীদের জীবনসঙ্গী খোঁজার ‘বউ মেলার’ ইতিহাস প্রায় দুইশ’ বছরের পুরোনো। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ এ আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আসছেন আদিবাসী সম্প্রদায়সহ এ এলাকার সকল স্তরের জনসাধারণ।
তিনি বলেন, সময় বদলেছে, মানুষের জীবন যাপন বদলেছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা বদলেছে। কিন্তু মেলার প্রতি মানুষের আকর্ষণ এখনো একটুও কমেনি। বরং আধুনিকতার যুগে দাঁড়িয়েও এমন একটি লোকজ আয়োজন মানুষের কাছে আলাদা আবেদন তৈরি করেছে।
মেলার সঙ্গে জীবনসঙ্গী খোঁজার ঐতিহ্যের সম্পর্ক থাকায় স্থানীয়ভাবে এটি ‘বউ মেলা’ নামেও পরিচিতি পেয়েছে। তবে মেলার মূল আকর্ষণ শুধু বিয়ে বা পাত্র-পাত্রীর সন্ধান নয়; এটি একই সঙ্গে একটি ঐতিহ্যবাহী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। এখানে মানুষের দেখা-সাক্ষাৎ, পরিচয়, আনন্দ-বিনোদন, কেনাকাটা এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন—সবকিছু মিলেমিশে তৈরি করে এক ভিন্ন আবহ।
তিনি আরও বলেন, আধুনিকতার মাঝেও টিকে আছে এ ঐতিহ্যবাহী ‘বউ মেলা’। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মানুষের পরিচিত হওয়ার সুযোগ বেড়েছে। তবুও ২শ’ বছরের পুরোনো এ মেলার প্রতি মানুষের আগ্রহ দেখিয়ে দেয়—লোকজ ঐতিহ্যের আবেদন এখনো শেষ হয়ে যায়নি। একজন তরুণ বা তরুণীর কাছে হয়তো এটি হতে পারে জীবনসঙ্গী খোঁজার একটি সুযোগ, আবার অন্য কারও কাছে এটি হতে পারে শেকড়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার দিন।
২৩ অক্টোবর গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে তাই শুধু একটি মেলা বসবে না—বসবে মানুষের মিলন, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর নতুন সম্পর্ক তৈরির এক অনন্য আয়োজন। হয়তো কারও জন্য এটি নিছক একটি মেলা, আবার কারও জীবনে এ মেলাই হয়ে উঠতে পারে নতুন জীবনের গল্পের প্রথম অধ্যায়।
জেলার বীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পরিদর্শক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, ঐতিহ্যবাহী এ বউ মেলার দিন সকাল থেকে মেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোড়দার থাকবে। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে মেলাটি সম্পন্ন করতে পুলিশ এবং আনসার সদস্যসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্ব পালন করবেন বলে আশ্বস্ত করেন তিনি।
বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ সুমা খাতুন বলেন, দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলা আদিবাসী সমাজের এ ঐতিহ্যবাহী ‘বউ মেলা’ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পূর্ণ করতে প্রশাসন তৎপর রয়েছে। মেলা সুষ্ঠ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হবে বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন।
আরটিভি/এমএম



