
চলতি বছরের শুরু থেকেই চা উৎপাদনে আশাব্যঞ্জক ধারা অব্যাহত রয়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধির পর জুলাইয়েও উৎপাদনে ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। যদিও গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় চলতি বছরের একই মাসে উৎপাদন কিছুটা কমেছে, তবে বছরের প্রথম সাত মাসের সামগ্রিক হিসাবে গত তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ চা উৎপাদিত হয়েছে। এতে চলতি বছরের নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনাও আরও জোরালো হয়েছে।
চা বোর্ডের কর্মকর্তা ও বাগান মালিকরা বলছেন, চলতি বছর আগাম বৃষ্টিপাত, অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত সার বরাদ্দসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে চা উৎপাদনে গতি এসেছে। এর সঙ্গে চায়ের ন্যূনতম মূল্যস্তর নির্ধারণ, বাজারে ভালো দাম ও চাহিদা থাকায় বাগান মালিকরাও চা চাষ ও পরিচর্যায় আগ্রহ বাড়িয়েছেন। ফলে উৎপাদনের ধারাও ইতিবাচক রয়েছে।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. মেসবাহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, চায়ের ধারাবাহিক চাহিদা ও রপ্তানি সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে এ খাতে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানোর পাশাপাশি বাগানগুলোতে সার, কীটনাশকসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ যথাসময়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বৃষ্টিপাত না থাকলে কৃত্রিমভাবে পানি ছিটানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে চায়ের দামও ভালো। সব মিলিয়ে এর ইতিবাচক ফল পাওয়া যাচ্ছে।
চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১০ কোটি ২৯ লাখ ১৮ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়। এরপর ২০২৪ সালে উৎপাদন নেমে আসে ৯ কোটি ৩০ লাখ ৪২ হাজার কেজিতে। ২০২৫ সালে উৎপাদন কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ৯ কোটি ৪৯ লাখ ২৭ হাজার কেজি। তবে ২০২৪ ও ২০২৫— দুই বছরই নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।
চলতি বছরে চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি। এর মধ্যে জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রথম সাত মাসে উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ২৭ লাখ ৪১ হাজার কেজি।
চা বোর্ডের বুলেটিনের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে চা উৎপাদিত হয়েছিল ৩ কোটি ৫৯ লাখ ৮ হাজার কেজি। ২০২৪ সালের একই সময়ে উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৪০ হাজার কেজি। সেই হিসাবে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে ২০২৫ সালের তুলনায় উৎপাদন বেড়েছে ১৯ দশমিক ০৩ শতাংশ বা ৬৮ লাখ ৩৩ হাজার কেজি। আর ২০২৪ সালের তুলনায় বেড়েছে ১৯ দশমিক ৫৯ শতাংশ বা ৭০ লাখ ১ হাজার কেজি।
তবে শুধু জুলাই মাসের হিসাবে গত বছরের তুলনায় কিছুটা পিছিয়েছে চলতি বছর। এ বছরের জুলাইয়ে ১ কোটি ২১ লাখ ১০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে। অথচ ২০২৫ সালের জুলাইয়ে উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৩৪ লাখ ৮৯ হাজার কেজি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জুলাইয়ে উৎপাদন কমেছে ১৩ লাখ ৭৯ হাজার কেজি।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে চা উৎপাদিত হয়েছিল ১ কোটি ১৪ লাখ ৩৫ হাজার কেজি। সে হিসাবে চলতি বছরের জুলাইয়ে ওই বছরের তুলনায় উৎপাদন ৬ লাখ ৭৫ হাজার কেজি বেশি হয়েছে।
এর আগে জুন মাসেও উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা যায়। ২০২৫ সালের জুনে ৯৮ লাখ ২৫ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হলেও চলতি বছরের জুনে উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ২৪ লাখ ৫ হাজার কেজি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জুনে উৎপাদন বেড়েছে ৮২ লাখ ১২ হাজার কেজি বা ২৬ শতাংশ।
জুন পর্যন্ত চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট ৩ কোটি ৬ লাখ ৩১ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়, যা গত বছরের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় ৩৬ শতাংশ বেশি। জুলাইয়ে এসে প্রবৃদ্ধির হার কিছুটা কমলেও প্রথম সাত মাসের হিসাবে গত দুই বছরের তুলনায় ১৯ শতাংশের বেশি উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে চা।
বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ টি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান বলেন, চা খাতে ভালো প্রবৃদ্ধির জন্য অনুকূল আবহাওয়ার পাশাপাশি নিলামে ভালো দাম পাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। এবার চায়ের ন্যূনতম মূল্যস্তর থাকায় বাগান মালিকরা ভালো দাম পাচ্ছেন। ফলে বাগানের পরিচর্যাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ কারণেই এবার উৎপাদন ভালো হচ্ছে।
চা বোর্ডের তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৫ লাখ ৭৩ হাজার কেজি, ফেব্রুয়ারিতে ২৪ হাজার কেজি, মার্চে ২৫ লাখ ৫৮ হাজার কেজি, এপ্রিলে ৫৯ লাখ ১৮ হাজার কেজি, মে মাসে ৯১ লাখ ৫৩ হাজার কেজি, জুনে ১ কোটি ২৪ লাখ ৫ হাজার কেজি এবং জুলাইয়ে ১ কোটি ২১ লাখ ১০ হাজার কেজি চা উৎপাদিত হয়েছে।
গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের মার্চে ১২ লাখ ২৩ হাজার কেজি, এপ্রিলে ৩৬ লাখ ৪৬ হাজার কেজি, মে মাসে ৫ লাখ ৫ হাজার কেজি এবং জুনে ২৫ লাখ ৮০ হাজার কেজি বেশি চা উৎপাদিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে চলতি বছরের প্রথম সাত মাসের উৎপাদন চা খাতে গত তিন বছরের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বছরের বাকি সময়ে অনুকূল আবহাওয়া ও উৎপাদন সহায়ক পদক্ষেপ অব্যাহত থাকলে নির্ধারিত ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা আরও বাড়বে।
আরটিভি/এমএইচজে




