
পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ চিয়া বীজ এখন রবিশস্য হিসেবে বাংলাদেশে চাষের সম্ভাবনাময় ফসল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শীতকালীন আবহাওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চিয়া চাষ করা সম্ভব বলে কৃষি সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। সঠিক সময়ে বপন ও পরিচর্যা করা হলে ৯০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যেই এ ফসল ঘরে তোলা যায়।
ক্ষুদ্র দানার চিয়া বীজ পুষ্টি ও শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। দানা শস্য ও হেলথ ফুড হিসেবে এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। চিয়া বর্ষজীবী ঔষধি তৈলবীজজাতীয় উদ্ভিদ। গাছ সাধারণত এক মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এর ফুল নীল, বেগুনি বা সাদা রঙের হতে পারে এবং বীজ গোল বা উপবৃত্তাকার হয়ে থাকে।
দুই ধরনের চিয়া বীজ
চিয়া বীজ প্রধানত দুই ধরনের কালো ও সাদা। বেগুনি ফুল উৎপাদনকারী গাছ থেকে সাধারণত বাদামি বীজ পাওয়া যায়, যাকে কালো চিয়া বলা হয়। অন্যদিকে সাদা ফুল উৎপাদনকারী গাছ থেকে সাদা, ধূসর ও হলুদাভ মার্বেলযুক্ত বীজ পাওয়া যায়।
বীজ থেকেই চাষ সহজ
বীজ ও চারা দুইভাবেই চিয়ার বংশবিস্তার করা যায়। তবে বীজ থেকে চারা উৎপাদন করাই তুলনামূলকভাবে সহজ। সাধারণত বপনের ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে বীজ অঙ্কুরিত হতে শুরু করে।
চিয়া চাষে ১১ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহনীয় হলেও ১৬ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা অনুকূল। ২০ থেকে ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণ আবহাওয়ায় গাছ ভালোভাবে বেড়ে ওঠে। বিভিন্ন পরিবেশ ও অঞ্চলে ফসলটির জীবনচক্র ১০০ থেকে ১৫০ দিনের মধ্যে হতে পারে।
বাংলাদেশে উপযুক্ত সময় শীতকাল
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় চিয়াকে রবিশস্য হিসেবে চাষ করা যায়। শীতকাল এ ফসলের জন্য উপযোগী। বেশি ফলনের লক্ষ্যে ১৫ নভেম্বরের মধ্যে বীজ বপন করার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্তও বীজ বপন করা যেতে পারে। বপনের পর সাধারণত ৯০ থেকে ১০০ দিনের মধ্যে ফসল সংগ্রহ করা সম্ভব।
কেমন মাটিতে চাষ করবেন
চিয়া বিভিন্ন ধরনের মাটিতে চাষ করা যায়। হালকা থেকে মাঝারি কাদামাটি এবং বেলে থেকে বেলে দোআঁশ মাটি এ ফসলের জন্য উপযোগী। জমি ভালোভাবে নিষ্কাশনযোগ্য ও মাঝারি উর্বর হলে ফলন ভালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
চারা স্থাপন ও বীজ বপনের সময় মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকা প্রয়োজন। তবে গাছ পরিপক্ব হওয়ার পর অতিরিক্ত ভেজা মাটি চিয়া গাছের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ফসলটি কিছুটা অ্যাসিডিক মাটি ও মাঝারি খরাও সহ্য করতে পারে।
বিঘায় ১০০ গ্রাম বীজ
সাধারণত প্রতি বিঘায় প্রায় ১০০ গ্রাম চিয়া বীজ প্রয়োজন হয়। জমি প্রস্তুতের জন্য ৩ থেকে ৪টি চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। একই সঙ্গে জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে।
চিয়া বীজ অত্যন্ত ছোট হওয়ায় সরাসরি বপনের সময় প্রায় ৫ কেজি শুকনো বালি বা ছাইয়ের সঙ্গে বীজ মিশিয়ে নেওয়া ভালো। এরপর সরিষা, তিল বা ডাটাশাকের মতো ৪০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার দূরত্বে সারি করে বীজ ছিটিয়ে দেওয়া যায়।
এ ছাড়া বীজতলায় চারা তৈরি করে ১৫ থেকে ২৫ দিন বয়সী চারা মূল জমিতে রোপণ করা যায়। এ ক্ষেত্রে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৪০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব প্রায় ২০ সেন্টিমিটার রাখতে হবে।
৬০-৮০ শতাংশ ফুলের মাথা বাদামি হলেই কাটাই
চিয়া গাছের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ ফুলের মাথা বাদামি বা হলুদাভ-বাদামি রঙ ধারণ করলে ফসল সংগ্রহের উপযুক্ত সময় হয়। এ সময় মাটির ওপর থেকে পুরো গাছ কেটে ত্রিপল বা পরিষ্কার মেঝেতে রেখে রোদে শুকাতে হয়।
এক থেকে দুই দিন রোদে শুকানোর পর বাঁশ বা কাঠের লাঠি দিয়ে আলতোভাবে আঘাত করলে গাছ থেকে বীজ আলাদা হয়ে যায়। পরে বীজ ঝেড়ে পরিষ্কার করে ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়।
চাষ পদ্ধতি ও ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে প্রতি বিঘায় প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কেজি পর্যন্ত চিয়া বীজের ফলন পাওয়া যেতে পারে। ফলে স্বল্প সময়ে উৎপাদনযোগ্য পুষ্টিকর এ ফসলটি বাংলাদেশের রবিশস্যের তালিকায় সম্ভাবনাময় সংযোজন হতে পারে।
আরটিভি/এসকে




