ঢাকা বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

আদা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে ‘বড় পরিকল্পনা’ সরকারের

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪০ পিএম
বিক্রির উদ্দেশে রাখা আদা। ছবি: সংগৃহীত

আমদানির বিপুল ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্যে আগামী তিন বছরের মধ্যে আদা উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার।

বর্তমানে দেশের চাহিদার ৪০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হচ্ছে। এতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১,২৫৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) ‘মসলা ফসলের উন্নত জাত ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণ’ প্রকল্পের পরিচালক রাসেল আহমেদ বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে সরকার আদা উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩.৭৫ লাখ টন চাহিদার বিপরীতে দেশে আদা উৎপাদন হয়েছিল ২.৫৫ লাখ টন। এ সময় আদার সামগ্রিক ঘাটতি ছিল ১.২০ লাখ টন এবং বিদেশ থেকে আদা আমদানি করা হয়েছিল ১.৪৫ লাখ টন ।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন, ভারত, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড থেকে ১.৪১ লাখ টনেরও বেশি আদা আমদানিতে দেশের ১,২৫৬.৮১ কোটি টাকা ব্যয় হয়। ভারত থেকে ৩৮৩.৭১ কোটি টাকা ব্যয়ে সর্বোচ্চ ৬১,৪২৮ টন আদা আমদানি করা হয়েছে। অন্যদিকে চীন থেকে ৪৩,০৩৮ টন আদা আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৫৫৯.৬৫ কোটি টাকা। মিয়ানমার থেকে এসেছে প্রায় ৩০,৩৪৭ টন আদা, যার দাম ছিল ২৪৩.৪৫ কোটি টাকা। ফলে দেশটি তৃতীয় বৃহত্তম সরবরাহকারী হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এক্ষেত্রে প্রথমস্থানে রয়েছে ভারত, দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে চীন।

এ সময়ে ইন্দোনেশিয়া থেকে ৪,৯৭২ টন এবং থাইল্যান্ড থেকে ১,৬৭৯ টনের বেশি আদা আমদানি করা হয়েছে।

বর্তমানে দেশের বার্ষিক আদার চাহিদার ৩৫-৪০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়, তাই এই প্রয়োজনীয় মসলা আমদানিতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, দেশে অনুকূল আবহাওয়া ও উন্নত মানের মাটি থাকা সত্ত্বেও উন্নত জাতের অভাব, দীর্ঘ ফসলচক্র, রোগবালাই, ছত্রাকের সংক্রমণ এবং সনাতন চাষাবাদ পদ্ধতির কারণে প্রতি হেক্টর জমি থেকে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডিএই সূত্র জানায়, এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় সরকার ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাতের আদা চাষ বৃদ্ধি, মানসম্মত বীজ উৎপাদন ও সরবরাহ, কৃষক পর্যায়ে আদা চাষের প্রসার, পাহাড়ি এলাকায় সেচ সুবিধা বাড়ানো, প্রশিক্ষণ প্রদান, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বস্তায় আদা চাষ এবং সঠিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ।

কৃষক পর্যায়ে উৎপাদন প্রযুক্তি উন্নয়নের বিষয়ে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) অধীনস্থ বাংলাদেশ মসলা গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (পিএসও) ড. এম মাসুদ আলম বলেন, বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতিটি অত্যন্ত উপযোগী ও লাভজনক; কারণ এর মাধ্যমে একজন কৃষক তার বাড়ির আঙিনায় বা ছোট পরিসরের জায়গায় আদা উৎপাদন করতে পারেন।

ড. আলম বলেন, মাত্র ৫০ গ্রাম আদা রোপণ করেই একজন কৃষক প্রতি বস্তায় ১ থেকে ১.৫ কেজি আদা উৎপাদন করতে পারেন।

প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘এই কর্মসূচিকে সফল করতে আমরা ডিএই’কে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছি এবং কৃষকদের মাঝে উচ্চফলনশীল জাতের আদা বারি-২ ও বারি-৩-এর বীজ বিতরণ করছি।’

ড. আলম জানান, বর্তমানে প্রতি হেক্টরে আদা উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ১৭ টন; তবে উচ্চফলনশীল জাত ব্যবহারের ফলে প্রতি ইউনিটে উৎপাদন আরও ১ থেকে ১.৫ টন বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।

ওই কর্মকর্তা জানান, দেশের মোট আবাদি জমির মাত্র ২.৩৫ শতাংশ জমিতে সব ধরনের মসলা উৎপাদিত হলেও ২০০১ সাল থেকে গত দুই দশকে মসলা উৎপাদন ১৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্লাস্টিকের বস্তায় আদা চাষের পদ্ধতির প্রশংসা করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন জেলার কৃষকরা এখন বাণিজ্যিকভাবে বস্তায় আদা চাষের দিকে ঝুঁকছেন; কারণ অনেকেই এই মসলা চাষ করে ভালো মুনাফা অর্জন করছেন।

রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার ছোটকুয়া গ্রামের কৃষক সোহেল প্রধান বলেন, আমি প্রথমবারের মতো আমার বাড়ির পুকুরপাড়ের আশপাশের এলাকায় ১,৮০০টি বস্তায় আদা চাষ করেছি এবং এই চাষ থেকে ভালো মুনাফা পাওয়ার আশা করছি।

এই পদ্ধতিতে আদা চাষের ফলে কেবল কৃষকরাই লাভবান হচ্ছেন না, বরং আদা আমদানির ওপর দেশের নির্ভরশীলতাও দিন দিন কমছে।

তবে স্থানীয় কৃষি বিভাগ বস্তায় আদা চাষের বাণিজ্যিক ও ব্যাপক প্রসারের ক্ষেত্রে উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখছে। বর্তমানে বাংলাদেশ মসলা গবেষণা কেন্দ্র কৃষকদের বস্তা পদ্ধতিতে বারি-২ ও বারি-৩ জাতের আদা চাষে উৎসাহিত করছে।

বাংলাদেশ মসলা গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন আদার চাহিদা রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, গত বছর ২৬ হাজার ১৯৪ হেক্টর জমিতে ৯৪ হাজার ২৬ টন আদা উৎপাদিত হয়েছে।

বর্তমানে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত আদার প্রায় ৩০ শতাংশই বস্তা পদ্ধতিতে চাষ করা হচ্ছে।

কৃষি কর্মকর্তারা জানান, বস্তা পদ্ধতিতে আদা চাষ স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ক্রমশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে, কারণ অনেকেই এর মাধ্যমে ভালো আয় করছেন।

তারা আরও বলেন, আরও বেশি সংখ্যক মানুষ যদি এই পদ্ধতিতে চাষাবাদে এগিয়ে আসেন, তবে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত আদা দিয়ে দেশের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। সূত্র: বাসস

আরটিভি/আইএম

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
কৃষক কার্ডের মাধ্যমে আবহাওয়ার ‘আগাম বার্তা’ পাবেন কৃষকরা
কৃষক কার্ডধারীদের মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৌঁছে যাবে আবহাওয়ার আগাম পূর্বাভাস। এর ফলে বৃষ্টি, তাপমাত্রার পরিবর্তন কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ার বিষয়ে আগে থেকেই সতর্ক হতে পারবেন কৃষকরা। 
কৃষক কার্ডের মাধ্যমে আবহাওয়ার ‘আগাম বার্তা’ পাবেন কৃষকরা
কৃষিতে উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে ‘বিনা’র বিপ্লব
বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের কৃষিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ২২টি ফসলের মোট ১৩৯টি উচ্চফলনশীল ও উন্নত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে ৯৬টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে সরাসরি মিউটেশন ব্রিডিং বা বিকিরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে।
কৃষিতে উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে ‘বিনা’র বিপ্লব
কৃষিঋণ মওকুফে স্বস্তিতে ১৪ লাখ কৃষক, চাঙা হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর সারাদেশে ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষকের সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ করেছে। এতে ঋণের বোঝা থেকে স্বস্তি পেয়েছেন প্রান্তিক কৃষকেরা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হচ্ছে।
কৃষিঋণ মওকুফে স্বস্তিতে ১৪ লাখ কৃষক, চাঙা হচ্ছে গ্রামীণ অর্থনীতি
মন কাড়ছে টাটকা-নতুন শীতের সবজি, হাত দেওয়া বারণ!
রাজধানীর বাজারে শীতকালীন নতুন সবজির দেখা মিললেও চড়া দামের কারণে অস্বস্তিতে পড়েছেন ক্রেতারা। নতুন আলু কেজিপ্রতি ১৬০ টাকা এবং দেশি টমেটো ১৮০ থেকে ২২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অধিকাংশ সবজির দাম কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১৪০ টাকার মধ্যে।
মন কাড়ছে টাটকা-নতুন শীতের সবজি, হাত দেওয়া বারণ!
শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন করে কোটি টাকার বাণিজ্য
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন ও বিক্রি করে কোটি টাকার বাণিজ্য হচ্ছে। শীত মৌসুমকে সামনে রেখে জেলার কৃষকরা বাণিজ্যিকভাবে নানান জাতের সবজির চারা উৎপাদন করছেন। এই চারা বিক্রি করে তারা সবজি মৌসুমের আগেই ভালো আয় করতে পারছেন। 
শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন করে কোটি টাকার বাণিজ্য
আরও পড়ুন
নতুন দুই গ্যাসকূপ খনন করবে সরকার, চলবে ১০ বছর
তিন মাসে ভোক্তা অধিদপ্তরের ৫ কোটি টাকার বেশি জরিমানা আদায়
সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সরকারের জরুরি বার্তা
২০২৭ সালে সরকারি ছুটি ২৯ দিন