
পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করলেও সাধারণ গ্রাহক এখনো টাকা তুলতে পারছেন না।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামি ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামি ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত হওয়ার পর গঠিত এই নতুন ব্যাংকের শাখাগুলোতে গ্রাহকের ভিড় উধাও হয়ে গেছে। বহুবার চেষ্টা করেও টাকা না পাওয়ায় আমানতকারীরা শাখায় আসা কমিয়ে দিয়েছেন, ফলে দেখা দিয়েছে এক ধরনের নীরবতা।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের শাখাগুলো ঘুরে দেখা গেছে, যে শাখাগুলো একসময় গ্রাহকের আনাগোনায় সরগরম থাকতো, এখন সেখানে হাতেগোনা কয়েকজন গ্রাহক দেখা যায়।
ব্যাংকের গ্রাহক পলাশ বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন সরকারই তাদের টাকা ফেরত দেবে, কারণ ব্যাংক এখন সরকারি মালিকানায়। তবে ডিপিএস ভাঙলে ঘোষিত প্যাকেজের সুবিধাও পাবেন না তিনি।
এক্সিম ব্যাংকের মতিঝিল শাখার কর্মকর্তারা জানান, উপর থেকে কোনো লিখিত নির্দেশনা না থাকায় তারা গ্রাহকের টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে কিছু বলতে পারছেন না।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংকের এক শাখার ব্যবস্থাপক মো. তৌফিক বলেন, বাজেট থেকে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হলেও সে টাকা এখনো শাখা পর্যায়ে আসেনি। লিখিত নির্দেশনা ছাড়া তারা গ্রাহকদের টাকা দিতে অপারগ।
এদিকে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আইয়ুব মিয়া জানিয়েছেন, সরকারি মালিকানায় একটি ইসলামি ব্যাংক চালু হওয়া দেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা। তিনি মন্তব্য করেন, গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কাজ।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকটি পূর্ণাঙ্গভাবে দাঁড় করাতে বেশ কিছু কারিগরি দল কাজ করছে এবং আইনগতভাবে পাঁচ ব্যাংককে একীভূত করা এবং ব্যাংকের ভিশন-মিশন চূড়ান্ত করাই এখন প্রধান অগ্রাধিকার।
গত ৩০ নভেম্বর ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’ ব্যাংক হিসেবে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বারবার তারল্য সহায়তা দেওয়ার পরও এসব ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা উন্নতি হয়নি, বরং শেয়ারবাজারে তাদের শেয়ারের দাম ব্যাপকভাবে কমে গেছে এবং প্রায় সব ব্যাংকের নেট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি) এখন ঋণাত্মক।
এই নাজুক পরিস্থিতিতেই একত্রীকরণের মাধ্যমে নতুন ব্যাংক গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নতুন ব্যাংকটির মোট পেইড-আপ ক্যাপিটাল নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা দেবে, এবং বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা আসবে আমানতকারীদের শেয়ার থেকে। প্রাথমিকভাবে অনুমোদিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকা।
এর আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ৯ নভেম্বর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
অর্থনীতিবিদরা এই সিদ্ধান্তকে দেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে একটি অভূতপূর্ব সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন, যা দুর্বল ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার এবং ইসলামী ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এর আগে, গত ৫ নভেম্বর আর্থিকভাবে দুর্বল পাঁচটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংককে অকার্যকর ঘোষণা করে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংকগুলো ভয়াবহ তারল্য সংকটের কারণে কর্মীদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছে। আর্থিক এ সংকটে এসব ব্যাংকের কর্মীদের বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী বলেন, ৩৫০ কোটি টাকা তারল্য সহায়তা রেখে নতুন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অন্তর্ভুক্ত ৫ ব্যাংক কর্মীদের বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ব্যাংকগুলোর চরম তারল্য সংকট ও আর্থিক অনিয়মের কারণে এই পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন গভর্নর। তবে এই সিদ্ধান্ত পুনর্গঠনের অংশ ও সাময়িক বলে জানিয়েছেন মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী।
তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাজারভিত্তিক বেতন পাবেন কর্মকর্তারা।
তবে একীভূত করার সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। রিটে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছে।
১৮ নভেম্বর শহিদুল ইসলাম নামে এক সাধারণ বিনিয়োগকারীর পক্ষে ব্যারিস্টার মাহসিব হোসাইন এ রিট দায়ের করেন।
আরটিভি/এএইচ




