
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে প্রতিদিন অসংখ্য শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতে আসেন। কেউ পরীক্ষার প্রস্তুতি নেন, কেউ গবেষণার কাজে বই খোঁজেন, আবার কেউ দীর্ঘ সময় রিডিং রুমে পড়াশোনা করেন। তবে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের অনেকের জন্য গ্রন্থাগারটি যেন প্রবেশের আগেই শেষ হয়ে যায়।
গ্রন্থাগারে প্রবেশের জন্য নেই র্যাম্প, দোতলায় ওঠার জন্য নেই লিফট। এমনকি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপযোগী ওয়াশরুমেরও ব্যবস্থা নেই। ফলে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সুবিধা কার্যত সীমিত হয়ে পড়েছে।
লাইব্রেরি প্রশাসক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ছয় দশক আগে, ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। এতে সাধারণ পাঠকক্ষ, দুটি ডিসকাশন রুম ও রেফারেন্স রুম মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক আসন রয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা স্থাপনের পর প্রতিদিন প্রায় ৬৫০ থেকে ৭০০ শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করতে আসেন। তবে এসব পাঠকক্ষের কোথাও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপযোগী বিশেষ ব্যবস্থা নেই।
বর্তমানে রাবিতে ৩২ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। তাদের মধ্যে বিভিন্ন বিভাগে প্রায় তিন শতাধিক শিক্ষার্থী শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে পড়াশোনা করছেন। হাত-পা, দৃষ্টিশক্তি কিংবা জন্মগত বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণে তারা অন্যান্য শিক্ষার্থীর মতো স্বাভাবিকভাবে ক্যাম্পাসের সব সুবিধা ব্যবহার করতে পারেন না।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সাত দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে তাদের জন্য প্রবেশগম্যতা, পড়াশোনার উপযোগী পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ব্যবস্থা না থাকায় উচ্চশিক্ষায় সমান সুযোগ নিশ্চিতের বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের আকুতি
জন্ম থেকে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম হোসেন আরটিভিকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের চার বছরে সবচেয়ে যে বিষয়টি আমাকে কষ্ট দিয়েছে, তা হলো আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের জন্য কোথাও আলাদা কোনো কর্নার নেই। লাইব্রেরিতে পড়ার কোনো পরিবেশ নেই। আমরা সেখানে গিয়ে পড়ব, তেমন কোনো পরিবেশ নেই। প্রতিনিয়ত আমরা এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।
তিনি বলেন, অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল সিস্টেম থাকলেও আমাদের তা নেই। যার কারণে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা আমরা পাচ্ছি না। দীর্ঘদিন ধরে আমি এ কথা বলে আসছি। এগুলো পূরণ করা এখন সময়ের দাবি। আমি আশা করব, প্রশাসন দ্রুত বিষয়গুলো আমলে নিয়ে আমাদের দাবিগুলো পূরণ করবে এবং আমরা যেন সমান সুযোগ পাই, তা নিশ্চিত করবে।
আইন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মো. রিফাত রহমান হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন। তার চার বছরের ক্যাম্পাসজীবনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারও জড়িয়ে আছে। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তিনি কখনো গ্রন্থাগারের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি।
নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে রিফাত রহমান আরটিভিকে বলেন, আমি একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী। হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী হিসেবে আমার চার বছরের ক্যাম্পাস জার্নির সঙ্গে লাইব্রেরিও জড়িয়ে আছে। চার বছরে আমি লাইব্রেরির বারান্দায় গিয়েছি, কিন্তু লাইব্রেরির ভেতরে ঢোকার আমার সাধ্য হয়নি। ঢুকিনি বলতে আমি ঢুকতে পারিনি। তার মানে এই নয় যে আমার কোনো দরকার লাগেনি বা আমি পড়াশোনায় ভালো না। বিষয়টি হচ্ছে, আমি ঢুকতে পারিনি। ঢোকার মতো পরিবেশ আমার জন্য সেখানে ছিল না।
তিনি বলেন, গ্রন্থাগারের দোতলায় যাওয়ার জন্য কোনো লিফট বা র্যাম্প নেই। ফলে হুইলচেয়ার নিয়ে সেখানে ওঠা সম্ভব নয়। শুধু প্রবেশের ক্ষেত্রেই নয়, গ্রন্থাগারে দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করতে গেলে প্রয়োজনীয় ওয়াশরুম ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য উপযোগী ব্যবস্থা নেই।
রিফাত আরটিভিকে বলেন, আমি এটা করুণা করে বলছি না। কারণ আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩-তে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করার কথা বলা আছে। যা লাইব্রেরিতে প্রবেশকেও বোঝায়। এটা কোনো করুণা নয়, এটা আইন দ্বারা স্বীকৃত আমাদের অধিকার। আমাদের প্রতিনিয়ত এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের যে আইন আছে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইনে বলা আছে, সবার জন্য সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং সবাই যেন সমান অধিকার পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। সেক্ষেত্রে আমরা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। কারণ লাইব্রেরিতে অন্যান্য শিক্ষার্থীরা যেতে পারছে, কিন্তু আমাদের মতো শিক্ষার্থীরা যেতে পারছে না। সেক্ষেত্রে আমরা পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে পড়ছি।
প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়ে রিফাত আরটিভিকে বলেন, আমাদের লাইব্রেরিতে ঢোকার মতো পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রশাসনের কাছে আমার দাবি থাকবে। এছাড়া লাইব্রেরিতে আমাদের জন্য একটি উপযোগী ওয়াশরুমের ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের লাইব্রেরির রিডিং রুম দোতলায়। সেখানে যাওয়ার জন্য ব্যবস্থা করতে হবে। লিফট বা র্যাম্পের ব্যবস্থা করলে আমরা সেখানে যেতে পারব। আমাদের জন্য যতটুকু সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা আইনে বলা আছে, সেটা যেন আমরা পাই। কারণ এটা আমাদের অধিকার। সেজন্য আমার দাবি, প্রশাসন যেন দ্রুত এগুলো বাস্তবায়ন করে।
শুধু রিফাত বা নাঈম নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্যও গ্রন্থাগারকে প্রবেশগম্য করার দাবি উঠেছে। তাদের জন্য র্যাম্প, লিফট ও উপযোগী ওয়াশরুমের ব্যবস্থা করা হলে তারা অন্যান্য শিক্ষার্থীর মতো গ্রন্থাগারের সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আড়াই মাস পেরিয়ে গেলেও বাস্তবায়ন হয়নি আশ্বাস
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য গ্রন্থাগারে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে একাধিকবার আলোচনা করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সমাজকল্যাণ সম্পাদক আবদুল্লাহ আল মাসুদ।
মাসুদ আরটিভিকে বলেন, এ বিষয়ে আমি এর আগে অনেকবার ভিসি স্যারের সঙ্গে কথা বলেছি। গত দেড় মাস আগেও ভিসি স্যারের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। তিনি তখন বলেছিলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে কাজ করে দেবেন। তবে এখনো কোনো কাজ দেখতে পাইনি। এছাড়া লাইব্রেরিতে শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন যন্ত্রপাতির তালিকাও দিয়েছি। সেগুলোর বাজেটও হয়তো পাস হয়েছে, তবে এখনো সেগুলো কেনা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, যেসব শিক্ষার্থী উপরে উঠতে পারবেন না, যাদের পায়ে সমস্যা বা যারা হুইলচেয়ার ব্যবহার করেন, তাদের জন্য লিফট অথবা নিচতলায় ব্যবস্থা করার কথা জানিয়েছিলাম। তারা বলেছিলেন, সাত দিনের মধ্যে করে দেবেন। কিন্তু দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো তা করা হয়নি। লাইব্রেরিতে আমার কাছে মনে হয়, অনেক জায়গা আছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও লাইব্রেরি প্রশাসক চাইলে এটি সম্ভব। তাদের সদিচ্ছা থাকলে এটা করা সম্ভব।
এ বিষয়ে রাকসুর সহসভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ আরটিভিকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় সাড়ে তিনশ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী আছেন। আমরা তাদের নিয়ে অনেকগুলো ইশতেহার রেখেছিলাম। লাইব্রেরিতে লিফটের ব্যবস্থা করা রাকসুর পক্ষ থেকে সম্ভব নয়। তবে আমরা এ বিষয়ে অনেকবার প্রশাসন ও লাইব্রেরি প্রশাসকের কাছে দাবি জানিয়েছি। ক্যাম্পাসে আসার পর প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরিতে প্রবেশ করতে পারছেন না—এটা খুবই দুঃখজনক।
যা ভাবছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
এ বিষয়ে জানতে চাইলে লাইব্রেরি প্রশাসক অধ্যাপক ড. মোহা. হাবিবুল ইসলাম আরটিভিকে বলেন, ওদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়েছি। প্রশাসনও আন্তরিকভাবে বিষয়টি দেখছে। হয়তো কয়েক দিনের মধ্যে আমরা এর একটা ফলাফল পেয়ে যাব। প্রশাসন অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে কাজ করছে। আর আমি কোনো দাবি পেলে সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করি। প্রশাসন বলে, নিয়ম অনুযায়ী পাঠান। আমরা দেখি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রশাসন খুবই আন্তরিক। আমাদের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য এটি খুব ভালো একটি ইতিবাচক দিক। আমরা কয়েক দিনের মধ্যেই ফলাফল পেয়ে যাব। এছাড়া বর্তমান যে লাইব্রেরি সিস্টেম আছে, এই সিস্টেমে কীভাবে কী করলে ভালো হয়, তা প্রকৌশলীরা ভালো বলতে পারবেন। আমরা আমাদের জায়গা থেকে চেষ্টা করছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম আরটিভিকে বলেন, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। তবে তাদের জন্য বাজেট বরাদ্দ হয়ে গেছে। কিছুটা সময় লাগবে। একসঙ্গে এত বেশি কাজে হাত দিয়েছি যে, আমাকে সহযোগিতা করার মতো কম্পিটেন্ট লোকেরও অভাব রয়েছে। আমি আশা করি, খুব অল্প সময়ের মধ্যে লাইব্রেরির কাজ আমরা শেষ করতে পারব।
তিনি আরও বলেন, শুধু লাইব্রেরি নয়, প্রত্যেকটি জায়গায় ওয়াশরুমে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া লিফট, র্যাম্প—যা যা প্রয়োজন, সেসব ব্যবস্থা করা হবে।
আরটিভি/জেএমএ




