
বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর দখল-দূষণ বন্ধ, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং নদী রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে দেশের পরিবেশ ও নদীপ্রেমী ২৩টি সংগঠন। এ দাবিতে নদী দুটির বর্তমান পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করেছে সংগঠনগুলো।
নদী দখল ও দূষণকারীদের তালিকা প্রকাশ করে তাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), গ্রিন ভয়েসসহ দেশের পরিবেশ ও নদীপ্রেমী বিভিন্ন সংগঠন।
বিশ্ব নদী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বসিলা লঞ্চঘাট থেকে লঞ্চযোগে ‘বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী নদীর দখল-দূষণের বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন’ কর্মসূচিতে এ দাবি জানানো হয়।
দেশের পরিবেশ ও নদীপ্রেমী ২৩টি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত কর্মসূচিতে বাপা, বেলা, গ্রিন ভয়েসের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, সরকারি বাঙলা কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, সরকারি হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ ও সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ শাখার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
এ ছাড়া এএলআরডি, নাগরিক উদ্যোগ, বারসিক, বাদাবন সংঘ, ক্যাপস, ডব্লিউবিবি ট্রাস্ট, অনুসন্ধানী ক্রিডস, সিডিপি, ইকিউএমএস, আরডিআরসি, সিডাব্লিউএফ, শিসউক, বাংলাদেশ সেন্টার ফর কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন স্টাডিজ, ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফ্রেন্ডস অ্যালায়েন্স (ডুফা), নিরাপদ নৌপথ বাস্তবায়ন আন্দোলন, লিডার্স, বুড়িগঙ্গা বাঁচাও আন্দোলন, কোস্ট ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ ঘুড়ি ফাউন্ডেশন ও শীতলক্ষ্যা বাঁচাও আন্দোলনসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা কর্মসূচিতে অংশ নেন।
বাপার সহ-সভাপতি মহিদুল হক খানের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবিরের সঞ্চালনায় কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন এমপি।
কর্মসূচিতে বাপার কোষাধ্যক্ষ মো. আমিনূর রসুল, সাংগঠনিক সম্পাদক মিহির বিশ্বাস, যুগ্ম সম্পাদক শাহজাহান মৃধা বেনু, হুমায়ুন কবির সুমন, ড. হালিমদাদ খান, নির্বাহী সদস্য ফরিদুল ইসলাম ফরিদ, বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক মো. আলমগীর কবির, ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী, সিডাব্লিউএফের চেয়ারম্যান শাহ ইশরাত আজমেরী, এএলআরডির সানজিদা খাতুন রিপা, বারসিকের জাহাঙ্গীর হোসেনসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
‘নদী দখল ও দূষণকারীদের আইনের আওতায় আনতে হবে’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন এমপি বলেন, বাংলাদেশের প্রাণ হচ্ছে নদী। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে নদী ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু সেই নদী আজ হুমকির মুখে।
তিনি বলেন, যারা নদীকে গলা টিপে হত্যা করার চেষ্টা করছে, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা উচিত। নদী দখলদার ও দূষণকারীদের তালিকা প্রকাশ করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, যারা খাল ভরাট করে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছে এবং পরিবেশের ক্ষতি করছে, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
‘দখলদারদের তালিকা করে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে’
সভাপতির বক্তব্যে মহিদুল হক খান বলেন, বাপা দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশের নদ-নদী রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। দেশের নদীগুলো আজ দখল ও দূষণে জর্জরিত। দ্রুত সব দখলদারের তালিকা করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
‘নদী রক্ষায় হাইকোর্টের আদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে’
বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক মো. আলমগীর কবির বলেন, নদী রক্ষার বিষয়ে পরিবেশবাদী সংগঠন, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের আন্দোলন ও লেখালেখি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাদের চাপের ফলে একপর্যায়ে হাইকোর্ট নদী উদ্ধারে হস্তক্ষেপ করে।
তিনি বলেন, ২০০৯, ২০১৪, ২০১৬, ২০১৯ ও ২০২১ সালে হাইকোর্টের বিভিন্ন আদেশ নদী রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তিনি আরও বলেন, ঢাকার চারপাশের নদীসহ শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলো রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বর্তমান সরকারের আগ্রহ ও উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে নদী রক্ষায় কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
‘নদীর বুকেও শিল্পকারখানার স্থাপনা’
নদী পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মো. আলমগীর কবির বলেন, দেশের নদ-নদীর অবস্থা ভালো নয়। নদীর দখল ও দূষণের চিত্র সরেজমিনে দেখা গেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, নদীর জায়গায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এবং নদীর বুকে পণ্য পরিবহনের জন্য জেটি নির্মাণ করা হয়েছে। এসব অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
তিনি জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি নদীর একক অভিভাবকত্বের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান
বাপার সাংগঠনিক সম্পাদক মিহির বিশ্বাস বলেন, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে নদী রক্ষা করতে হবে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে, তা দূর করতে হবে। আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় কার্যকরভাবে হলে নদী রক্ষা আরও সহজ হবে।
সিডাব্লিউএফের চেয়ারম্যান শাহ ইশরাত আজমেরী বলেন, নদীকে দূষণমুক্ত করতে হবে। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
হুমায়ুন কবির সুমন বলেন, নদীর সঙ্গে মৎস্য, প্রাণবৈচিত্র্য ও জীববৈচিত্র্য জড়িত। সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী বলেন, শুধু দিবসভিত্তিক কর্মসূচি নয়, প্রতিদিনই নিজ নিজ জায়গা থেকে নদী রক্ষায় কাজ করতে হবে।
এএলআরডির সানজিদা খাতুন রিপা বলেন, দূষণের জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তি নিশ্চিত না হলে দখল-দূষণ কমবে না। শিল্পকারখানায় ইটিপি ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনিটরিং জোরদার করা প্রয়োজন।
১০ দফা দাবি
নদী পরিদর্শন কর্মসূচি থেকে সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলো হলো—
১. বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর পুনরায় সীমানা জরিপ করে নদীভূমি দ্রুত দখলমুক্ত করতে হবে।
২. নদীতে সরাসরি শিল্পবর্জ্য ও পয়ঃবর্জ্য ফেলার সব অবৈধ সংযোগ বন্ধ করতে হবে।
৩. সব শিল্পকারখানার ইটিপি সার্বক্ষণিক চালু রাখা এবং অনলাইন মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।
৪. দূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
৫. নদীর তীরের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীর মূল প্রবাহ ও জায়গা ফিরিয়ে দিতে হবে।
৬. বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর পানি, তলানি ও জীববৈচিত্র্যের নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করতে হবে।
৭. নদীতে প্লাস্টিক, পলিথিন, বাজারের বর্জ্য ও জাহাজের তেল-বর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে।
৮. বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরী রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সব সরকারি সংস্থাকে নিয়ে সময়বদ্ধ সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
৯. রাষ্ট্রকে দেশের নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বন, হ্রদ, পুকুরসহ প্রাকৃতিক সম্পদের ট্রাস্টি বা অভিভাবকসুলভ রক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
১০. জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে।
কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীসহ দেশের নদ-নদী রক্ষায় শুধু দিবসভিত্তিক কর্মসূচি নয় বরং নিয়মিত নজরদারি, সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এবং দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা প্রয়োজন। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ রক্ষায় ১০ দফা দাবি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন তারা।
আরটিভি/ এসকেডি


