
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন ঝুঁকি শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শের সুযোগ তৈরি করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) উচ্চশিক্ষা ত্বরান্বিতকরণ ও রূপান্তর (হিট) প্রকল্পের আওতায় নেওয়া এই উপপ্রকল্পে দেশের ৫০টির বেশি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার শিক্ষার্থীর তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণা করা হবে।
হিট প্রকল্পের একাডেমিক ট্রান্সফরমেশন ফান্ডের আওতায় ডিআইইউ সিএসই বিভাগের এ উপপ্রকল্পের নম্বর ১৩৮১৪। প্রকল্পটির নাম ‘ডেভেলপমেন্ট অব আ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ড্রিভেন বাই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ফর আর্লি ইন্টারভেনশন অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ ডায়াগনসিস অ্যামং বাংলাদেশি ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস’। প্রকল্পটির মোট বাজেট ২ কোটি ৯৬ লাখ টাকা এবং মেয়াদ তিন বছর। বর্তমানে প্রকল্পটির অগ্রগতি প্রায় ৩০ শতাংশ। আগামী ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে এআই প্ল্যাটফর্মটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্ল্যাটফর্মটি মূলত চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সহায়ক একটি এআই টুল হিসেবে কাজ করবে। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে একটি ফলাফল তৈরি করা হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা পরামর্শকের মাধ্যমে তা মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।
গবেষণার জন্য দেশের সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ৫০টির বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার শিক্ষার্থীর তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। তথ্য সংগ্রহের কাজে প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ জন শিক্ষার্থীকে যুক্ত করা হবে। ফলে গবেষণাটি শুধু ডিআইইউর শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।
প্রকল্পে শিক্ষার্থীদের বিষণ্নতা, মানসিক চাপ ও উদ্বেগসহ বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিষয় মূল্যায়নের জন্য প্রশ্নমালা তৈরি করা হবে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানী এ প্রশ্নমালা তৈরির সঙ্গে যুক্ত থাকবেন। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্য পরবর্তী সময়ে গবেষণা ও এআইভিত্তিক বিশ্লেষণের কাজে ব্যবহার করা হবে।
কোনো শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যে ঝুঁকির ইঙ্গিত পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা পরামর্শকের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা নেওয়ার সুযোগ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এআইকে সরাসরি চিকিৎসকের বিকল্প হিসেবে নয়, বরং চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহারের লক্ষ্য রয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ডিআইইউর নতুন ভবনের সিএসই বিভাগের ৬০২ নম্বর কক্ষে রিসার্চ অ্যান্ড ডেটা অ্যানালাইসিস সেল স্থাপন করা হচ্ছে। এই সেল থেকে গবেষণা, তথ্য বিশ্লেষণ এবং প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণের জন্য প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম কেনা হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি কম্পিউটার, চারটি ল্যাপটপ, ১০টি ট্যাব, পাঁচটি ক্যামেরা, স্মার্ট হোয়াইটবোর্ড, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, কনফারেন্স রুমের চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন ল্যাব ও অফিস সরঞ্জাম রয়েছে। বড় পরিসরের তথ্য বিশ্লেষণ ও মেশিন লার্নিংয়ের জন্য দুটি উচ্চক্ষমতার কম্পিউটারও রাখা হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব সরঞ্জাম ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছেছে।
সরকারি ই-জিপি তথ্য অনুযায়ী, এসপি ১৩৮১৪-এর আওতায় রিসার্চ অ্যান্ড ডেটা অ্যানালাইসিস সেলের জন্য আইসিটি ইকুইপমেন্ট অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ কেনার একটি প্যাকেজে ৬৮ লাখ ৬৯ হাজার ১৭৫ টাকার চুক্তি করা হয়েছে। এ প্যাকেজের আওতায় প্রকল্পের গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণ কার্যক্রমের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।
প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রাথমিকভাবে নিজেদের ঝুঁকি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্যের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
এদিকে প্রকল্পের আওতায় ডিআইইউর শিক্ষার্থীদের গবেষণার সুযোগও তৈরি হচ্ছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের গবেষণার কাজে হিট প্রকল্পের ল্যাব ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। এতে গবেষণা ও তথ্য বিশ্লেষণের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে।
তবে প্রকল্পের আওতায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হবে। ফলে তথ্যের গোপনীয়তা, শিক্ষার্থীদের সম্মতি এবং সংগৃহীত তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছে। বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্যের ক্ষেত্রে তথ্য সুরক্ষা ও ব্যবহারের নীতিমালা স্পষ্ট থাকা জরুরি।
বর্তমানে প্রকল্পটির কাজ প্রায় ৩০ শতাংশ এগিয়েছে। নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে এআই প্ল্যাটফর্মটি চালুর লক্ষ্য রয়েছে। তবে প্রকল্প শেষে প্ল্যাটফর্মটির স্থায়ী পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার থাকবে এবং গবেষণার ফলাফল কীভাবে ব্যবহার করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
আরটিভি/এমএম




