
বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় টানা চতুর্থবারের মতো স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (BAEC) ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ড. মো. খালিদ হোসাইন। এক বছরের গবেষণাকর্মের প্রভাব বিবেচনায় বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের মধ্যে তার অবস্থান পঞ্চম।
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান এলসেভিয়ার যৌথভাবে ৮ অক্টোবর ২০২৬ বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীদের তালিকা প্রকাশ করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকদের বৈজ্ঞানিক প্রকাশনা, গবেষণার প্রভাব ও উদ্ধৃতির মতো সূচকের ভিত্তিতে এ তালিকা তৈরি করা হয়। এতে বাংলাদেশের আইসিডিডিআরবি, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরাও স্থান পেয়েছেন।
স্কোপাস-ইনডেক্সড গবেষণা নিবন্ধের তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বের বিজ্ঞানীদের ২০টি বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্র ও ১৭৪টি উপক্ষেত্রে শ্রেণিবদ্ধ করে এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তালিকায় দুই ধরনের তথ্য বিবেচনা করা হয়—সমগ্র কর্মজীবনের গবেষণাকর্ম এবং সর্বশেষ এক বছরের গবেষণাকর্ম। ড. মো. খালিদ হোসাইনের নাম এ বছর দুই ক্যাটাগরিতেই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
সমগ্র কর্মজীবনের গবেষণার তথ্যের ভিত্তিতে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে মোট ১০৫ জন গবেষক তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এই তালিকায় ড. খালিদ হোসাইনের অবস্থান ৫৫তম। অন্যদিকে সর্বশেষ এক বছরের গবেষণাকর্মের ভিত্তিতে এ বছর বাংলাদেশ থেকে মোট ৩৪৭ জন বিজ্ঞানী তালিকায় স্থান পেয়েছেন। তাদের মধ্যে ড. হোসাইনের অবস্থান পঞ্চম।
তালিকায় স্থান পাওয়ার বিষয়ে নিজের প্রতিক্রিয়ায় ড. মো. খালিদ হোসাইন বলেন, আমার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দেশের বিজ্ঞান গবেষণায় অবদান রাখা আমার দেশের প্রতি কর্তব্য। সে কারণেই ডিগ্রি শেষ করে জাপানে চাকরি বা অবস্থান না করে দেশে ফিরে আসি। আমি বিশ্বাস করি, আজ আমি আমার দেশকে কিছুটা হলেও প্রতিদান দিতে পেরেছি। আমি মনে করি, এটি আমার জন্য একটি বড় অর্জন।
ড. মো. খালিদ হোসাইন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত পদার্থবিদ্যা, ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ (বর্তমান ইইই বিভাগ) থেকে প্রথম বিভাগে বিএসসি ও এমএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১২ সালে তিনি বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
পরবর্তীতে জাপান সরকারের Monbukagakusho/MEXT Scholarship নিয়ে জাপানের কিউশু বিশ্ববিদ্যালয়ের Department of Advanced Energy Engineering Science থেকে নিউক্লিয়ার এনার্জি ম্যাটেরিয়ালস বিষয়ে ২০২১ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
গবেষণায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ASM International—যা পূর্বে American Society for Metals নামে পরিচিত ছিল—থেকে “Most Popular Presentation Award-2021” অর্জন করেন।
ড. খালিদ হোসাইন ১১টি বিজ্ঞানবিষয়ক বইয়ের লেখক। জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন পিয়ার-রিভিউড জার্নালে তার ৩৫০টির বেশি বৈজ্ঞানিক গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তার প্রকাশনাগুলো আন্তর্জাতিক গবেষণা অঙ্গনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। তার গবেষণা নিবন্ধগুলো এ পর্যন্ত ২০ হাজারের বেশি বার উদ্ধৃত হয়েছে এবং h-index ৭৫।
গবেষণার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সভা, কর্মশালা ও প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং, চীন, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে তিনি বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানী ও গবেষকদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের MIT, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা IAEA, জাপান অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি JAEA এবং ইন্দোনেশিয়ার BATAN-এর মতো প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
ড. খালিদ হোসাইনের গবেষণার প্রধান ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে নিউক্লিয়ার এনার্জি ম্যাটেরিয়ালস, সোলার সেল, ফুয়েল সেল, ন্যানোম্যাটেরিয়ালস ও সিরামিকস। বিশেষ করে হাইড্রোজেন এনার্জি ম্যাটেরিয়ালস ও ইলেকট্রোকেমিক্যাল ডিভাইস, প্রোটন পরিবাহী অক্সাইড এবং হাইড্রোজেন আইসোটোপের আচরণসংক্রান্ত গবেষণায় তার কাজ রয়েছে।
বাংলাদেশে থেকেই আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা চালিয়ে যাওয়া এবং দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণায় অবদান রাখার প্রত্যয় নিয়ে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় টানা চতুর্থবারের মতো তার অন্তর্ভুক্তি আন্তর্জাতিক গবেষণা অঙ্গনে তার ধারাবাহিক গবেষণা-অবদানের একটি উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আরটিভি/এমএ


