
মনটা আজ একটু ভার হয়ে ছিল। প্রতিদিনের একঘেয়েমি আর অহেতুক ক্লান্তি কাটানোর তাগিদে বিকেলের দিকে একাই পা বাড়ালাম ঘরের বাইরে। বাসাটা নদীর কাছাকাছি হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে হাঁটতে শুরু করি। কিছুটা পথ পেরোতেই চোখে পড়ে এক অবিশ্বাস্য নীরব স্থাপত্য। লাল ইটে সাদা রঙের কারুকাজ করা বিশাল এক প্রাচীন দেয়াল স্থানীয়দের কাছে যা 'লালকুঠি' নামে পরিচিত।
ঐতিহাসিক নর্থব্রুক হল বা এই চেনা লালকুঠি পুরান ঢাকার আঁকাবাঁকা সরু গলির মাঝে যেন এক অনন্য সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে। পুরো রাজধানীর বিকট গাড়ির হর্ন আর শহুরে কোলাহলের বুক চিরে এটি যেন শান্তির এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। ঠিক পাশেই ব্যস্ত সদরঘাট। বুড়িগঙ্গার জলে ভেসে আসা নদীর হাওয়া আর দূরে দূরপাল্লার লঞ্চের হুইসেলের শব্দ এখানে এক অদ্ভুত আবহ তৈরি করে।
লালকুঠির চত্বরে পা রাখতেই দেখা গেল নতুন জীবনের ছোঁয়া। এখানে যেন রূপসী ও তরুণ-তরুণীদের ছবি তোলার এক আনন্দমেলা বসেছে। মন ভালো করতে কিংবা নিজেকে একটু সুন্দর ফ্রেমে বন্দি করতে সবাই দারুণ সব পোশাকে সেজে এসেছেন। বিশেষ করে মেয়েরা নজরকাড়া রঙের শাড়ি, ম্যাচিং গয়না আর রেশমি চুড়ি পরে এসেছে সাজগোজের সবটুকু ঢেলে দিয়ে। ছেলেদের পরনেও ঐতিহ্যবাহী পাঞ্জাবি। প্রতিটি মানুষের চোখ-মুখে যেন উদ্ভাসিত এক উষ্ণ হাসি। সবাই এসেছে শহুরে ক্লান্তি ভুলে নিজেকে কিছুটা লালিত সময় দিতে।
দালানের ধারের প্রশস্ত চত্বরে স্থানীয়দের হাঁটাচলা ও শরীরচর্চা করতে দেখা যায়। স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের জন্য এটি এক চমৎকার জায়গা নেই কোনো যানজটের চাপ, নেই কোলাহলের হুটোপুটি। মনকে একটু স্থিরতা দিতে চাইলে যে কেউ চাইলে এখানে এসে ঘুরে যেতে পারেন।
স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে লালকুঠির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর লাল ইটের দেয়ালে সাদা রঙের সূক্ষ্ম নকশা ও কারুকাজ। নকশাদার অংশগুলোতে রাতে রয়েছে নান্দনিক আলোর ব্যবস্থা। প্রতিটি লাল ইটের পিলারের শীর্ষে শোভা পাচ্ছে ছোট ছোট সাদা গম্বুজ, আর তার ঠিক ওপরেই কালো রঙের অপূর্ব নকশি কারুকাজ।
দর্শনার্থীদের এই স্মৃতি ধরে রাখতে চত্বরজুড়ে পেশাদার আলোকচিত্রীদেরও আনাগোনা দেখা যায়। টাকার বিনিময়ে তারা পছন্দসই কোণ থেকে তুলে দিচ্ছেন দর্শনার্থীদের রঙিন ছবি। বিশেষ করে বিকেল গড়িয়ে সূর্য যখন বুড়িগঙ্গার বুকে ডুব দিতে শুরু করে, তখন যেন ছবি তোলা, নদীর হাওয়ায় ভিডিও ধারণ কিংবা ব্লগ বানানোর হিড়িক পড়ে যায়। লালকুঠির দেয়ালে গোধূলির আলো পড়ে তৈরি হয় এক অনবদ্য দৃশ্য।
বিকেলের এই ক্ষণে এখানে সবচেয়ে বেশি ভিড় জমান প্রিয়জন বা দম্পতিরা। এছাড়া পরিবার কিংবা একঝাঁক বন্ধুবান্ধব নিয়ে আসা মানুষের আড্ডাও জমে ওঠে বেশ। এই আঙিনা শুধু সাধারণ মানুষের ঘোরাঘুরিতেই সীমাবদ্ধ নয়; এর ঐতিহাসিক আভিজাত্যের কারণে এখানে প্রায়ই দেখা যায় নাটক-সিনেমার শুটিং, মডেলদের ফটোশুট কিংবা নতুন দম্পতিদের ওয়েডিং ভিডিওর কাজ।
তবে সাঁঝের বাতি জ্বলতেই ভাঙতে শুরু করে এই আনন্দ-আড্ডা। দিনের শুরুতে সূর্য ওঠার সাথে সাথে খোলা হলেও, সন্ধ্যা নামার পর মাগরিবের আজান শুনলেই লালকুঠির মূল ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। ততক্ষণে বুড়িগঙ্গার কূল ছেড়ে ঘরে ফিরতে শুরু করেন সবাই, সঙ্গে নিয়ে যান বিষাদ ভুলে এক চিলতে শান্তির স্মৃতি।
লালকুঠিতে ঘুরতে আসা শিক্ষার্থী তাসনিম মেহজাবিন বলেন, সারা সপ্তাহের ব্যস্ততা আর ক্লাসের ক্লান্তি কাটাতে নদীর ধারের এই শান্ত পরিবেশ সত্যিই দারুণ। লাল ইটের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের সামনে বন্ধুদের সঙ্গে শাড়ি পরে ছবি তুলতে পেরে বেশ ভালো লাগছে।
আরেক দর্শনার্থী তানভীর আহমেদ বলেন, ঢাকার বিকট যানজট আর হর্নের শব্দ থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে বুড়িগঙ্গার এই তীর যেন এক শান্তির দ্বীপ। বিকেলে নদীর হাওয়ায় হাঁটাহাঁটি আর বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিলে মনের সব বিষাদ এক নিমেষেই দূর হয়ে যায়।এছাড়া এখানে যে লাল ইট রয়েছে সেরা খুব ভালো লাগে। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে এটা সুন্দর একটি ঘোরাঘুরির জায়গা।
দায়িত্বে থাকা গেটম্যানের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন সূর্য ওঠার সাথে সাথেই আমরা লালকুঠির মূল ফটক দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দিই। বিকেল গড়াতেই দূর-দূরান্ত থেকে নানা বয়সের মানুষের আনাগোনা বাড়তে থাকে কেউ ছবি তুলতে আসেন, কেউ আসেন একটু শান্তির খোঁজে। ঐতিহ্যের এই চত্বরকে সুন্দর রাখা আর দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আমাদের মূল কাজ। তবে রাতের নিরাপত্তা এবং নিয়ম মেনে চলার সুবিধার্থে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে, অর্থাৎ মাগরিবের আজান হলেই আমরা মূল ফটক বন্ধ করে দিই।
আরটিভি/ এসকেডি




