
দীর্ঘ ৩৬ বছর পর ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (রাকসু), হল সংসদ ও সিনেট ছাত্রপ্রতিনিধি নির্বাচন। নির্বাচনের এক বছর পেরিয়ে গেলেও শপথ হয়নি সিনেটের পাঁচ ছাত্র প্রতিনিধির।
আইন অনুযায়ী বছরে অন্তত একবার অধিবেশন আহ্বানের বিধান থাকলেও প্রায় এক দশক ধরে অকার্যকর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ এই নীতিনির্ধারণী ফোরাম। ইতিমধ্যে, রাকসুর মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও এখনো আলোর মুখ দেখেনি সিনেট অধিবেশন।
সিনেটের কোরাম সংকট, সদস্যপদসংক্রান্ত জটিলতা ও প্রশাসনের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে ঝুলে আছে অধিবেশন আয়োজন। দেশের অন্য তিন স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বছর সিনেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হলেও এদিকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম রাবি।
এতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালনের সুযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বহুল প্রতীক্ষিত ওই নির্বাচনে সিনেট প্রতিনিধি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ৫৮ জন প্রার্থী। নির্বাচনে শিবির-সমর্থিত ‘সম্মিলিত শিক্ষার্থী জোট' থেকে তিনজন এবং স্বতন্ত্র প্যানেল থেকে দুইজন নির্বাচিত হন। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা হলেন রাকসুর সাবেক ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ, জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার, এজিএস সালমান সাব্বির, ফজলে রাব্বী মো. ফাহিম রেজা ও আকিল বিন তালেব।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী, পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান নির্বাচিতরা সিনেট প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচিত হবেন। এছাড়াও, শপথ গ্রহণ করার পরবর্তী এক বছর পর্যন্ত তারা দায়িত্ব পালন করবেন।
১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের ২১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, বছরে অন্তত একবার সিনেট অধিবেশন আহ্বানের বিধান রয়েছে। কিন্তু রাবিতে সর্বশেষ সিনেট অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালের ১৯ মে। এর আগে ২০০১ সালের ২৮ ও ২৯ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০তম সিনেট অধিবেশনের পর দীর্ঘ ১৪ বছর বিরতি দিয়ে ২০১৫ সালের ১৮ মে ২১তম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
এরপর ২০১৬ সালের ১৯ মে ২২তম অধিবেশনের পর থেকে আর কোনো অধিবেশন হয়নি। ফলে প্রায় এক দশক ধরে সিনেট অধিবেশন ছাড়াই চলছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী এই ফোরামে উপাচার্য নির্বাচন, বাজেট অনুমোদন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন সংশোধন এবং নতুন বিভাগ বা ইনস্টিটিউট চালুর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
রাকসুর সদ্য-সাবেক সাধারণ সম্পাদক (জিএস) ও সিনেট সদস্য সালাহউদ্দিন আম্মার বলেন, সিনেট কার্যকর করার জন্য প্রশাসনের সাথে বারবার কথা বলছি। বর্তমান প্রশাসন আমাদের কাছে এক মাসের মতো সময় চেয়েছেন। আমরা একটা বড় সীমাবদ্ধতার কথা জানি যে, সিনেটে আওয়ামী আমলের অনেক সদস্য আছেন।
‘তাদেরকে না নিয়ে অধিবেশন কল করলে তারা আবার সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে সেই সিনেট অধিবেশন বাতিল করে দিতে পারবেন। তবে এগুলো চাইলেই সমাধান করা সম্ভব। প্রশাসন এই বিষয়টা নিয়ে যথেষ্ট আন্তরিক না। যেভাবেই হোক আমরা সিনেট কার্যকর করব।’
রাকসুর ভিপি ও সিনেট সদস্য মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, রাকসুর প্যানেলের মধ্যে আমরা তিনজন সিনেট সদস্য থাকায় আমরা প্রত্যেকটা অধিবেশনেই সিনেট নিয়ে কথা বলেছি। এছাড়াও, আমরা পাঁচজন আলাদা ভাবে অসংখ্যবার প্রশাসনের সাথে দেখা করেছি। দুই প্রশাসনই আমাদের বিভিন্ন কারণ দেখিয়েছে। আমার মনে হয়, প্রশাসন সিনেট অধিবেশন না দেওয়ার মূল কারণ হচ্ছে—সিনেটে যেসব সিদ্ধান্ত হয়, এগুলো তারা মেনে নিতে পারবে না। প্রশাসন সেগুলোকে অনধিকার চর্চা মনে করবে।
তিনি আরও বলেন, প্রশাসন বলছে যে তোমরা শপথ নেওয়ার পর একবছর পর পর্যন্ত তোমাদের মেয়াদ থাকবে। কিন্তু, আমরা তো কর্মকর্তা কর্মচারী থেকে নির্বাচিত না, আমরা কি সারাজীবন ক্যাম্পাসে থাকবো নাকি। অনেকের পড়াশোনা শেষ, তারা চলে যাবে। সিনেটের শপথ ও পরবর্তী রাকসু নিয়ে প্রশাসন সর্বোচ্চ ইগনোরেন্স দেখিয়েছে। রাকসুর মেয়াদ শেষ, সিনেট নিয়ে আমরা খুব দ্রুতই সিদ্ধান্ত জানাব।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি সিনেট অধিবেশন দেওয়ার জন্য। কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত আছেন। সিনেট অধিবেশন করতে গেলে আমাদের আগে কোরাম পূরণ করতে হবে।
তিনি বলেন, অনেক সিনেট সদস্য মৃত্যবরণ করেছেন, এছাড়াও বিভিন্ন কারণে অনেক পদ শূন্য হয়ে আছে। বিভিন্ন ইস্যুগুলো সমাধান হওয়ার পর আমরা সিনেট অধিবেশন দিব। যখন বুঝবো যে বিতর্কহীনভাবে অধিবেশন করতে পারব তখনই করব, তার আগে আমি করব না।
আরটিভি/এসআর




