
প্রতিষ্ঠার দুই দশক পেরিয়ে ২১ বছরে পদার্পণ করেছে ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। দীর্ঘ এই পথচলায় বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে মাত্র একবার।
এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে বের হয়েছেন ১১ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী। সমাবর্তন পেয়েছেন ১ হাজার ৩৯৯ জন, সমাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন আরও প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী। তাদের অনেকেই বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, গণমাধ্যম, শিক্ষা, গবেষণা, ব্যবসা ও দেশের বাইরে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত রয়েছেন। তবে সাবেক শিক্ষার্থীদের ছাত্রজীবনের সোনালি স্মৃতিকে ফিরে দেখার এক আবেগঘন মুহূর্তের আয়োজন করতে পারেনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ফলে ডিগ্রি সম্পন্ন করা হাজারো শিক্ষার্থী এখনও তাদের কাঙ্ক্ষিত সমাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন।
২০১৭ সালের ১৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত প্রথম সমাবর্তনে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ পর্যন্ত মোট পাঁচটি ব্যাচের ১ হাজার ৩৯৯ জন গ্র্যাজুয়েট অংশগ্রহণ করেন। সেই সময় ২৯ জন শিক্ষার্থীকে মোট ৩২টি স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়।
২০১৭ সালের সেই সমাবর্তনের দিনটি ছিল নজরুল চেতনায় উদ্ভাসিত এক গৌরবময় আয়োজন। তবে এরপর থেকে নতুন কোনো সমাবর্তন না হওয়ায়, একের পর এক অ্যাকাডেমিক ব্যাচ পাস করলেও শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এই দীর্ঘ বিরতিতে চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা। অনেকেই মনে করছেন, ডিগ্রির আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না পাওয়ার কারণে কর্মক্ষেত্রে এক ধরনের অসম্পূর্ণতা রয়ে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এইচ. আই. হাবিব বলেন, সমাবর্তন হয়েছে মাত্র পাঁচটি ব্যাচ নিয়ে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এখন ২০তম ব্যাচ চলে এসেছে। সমাবর্তন না হওয়ার কারণে একটি প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে উঠতে যা প্রয়োজন, সেসবের কিছুই করা সম্ভব হচ্ছে না। বরং সাবেক শিক্ষার্থীরা আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, কোনো অ্যালামনাই গঠন করা পর্যন্ত সম্ভব হচ্ছে না এই বিচ্ছিন্নতার কারণে। সমাবর্তনের মাধ্যমে চূড়ান্ত সনদ প্রদান করা হয়, কিন্তু সমাবর্তন না হওয়ায় শিক্ষাজীবনের সেরা অর্জন সেই সনদও পেতে পারছি না আমরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ও লোকপ্রশাসন ও সরকার পরিচালনা বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক নাজমুল হাসান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ষষ্ঠ ব্যাচের একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আমার সম্পর্ক শুধু শিক্ষাজীবনের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত থাকায় এই প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি ও সুনামের সঙ্গে আমার আবেগ ও দায়িত্ববোধ গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, সমাবর্তন উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন, যা শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের অধ্যবসায় ও অর্জনের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান করে। দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে; ফলে অনেক সাবেক শিক্ষার্থী এখনো তাদের কাঙ্ক্ষিত সমাবর্তনের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাই সমাবর্তন আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করে সম্ভাব্য সময়সীমা নির্ধারণ, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন এবং সাবেক শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী নিহার সরকার অংকুর বলেন, একটি সমাবর্তন করতে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে শুরু করে সরকারের সঙ্গে এক ধরনের যোগাযোগ থাকতে হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। যদিও-বা এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না, কিন্তু স্বাভাবিক একটা যোগাযোগ থাকতে হয় যে একটা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তনটা করবে, নিয়মিতভাবে করবে, একটা চাহিদা থাকতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের। আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের যদি মিশন-ভিশন ঠিক না থাকে, তাহলে এগুলো তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে না; যে কারণে তারা সমাবর্তনগুলো করার ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে তারা এতটা মনোনিবেশ রাখে না। তারা ব্যস্ত থাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিয়ে, শিক্ষক-কর্মকর্তারা ব্যস্ত থাকে ডেভেলপমেন্ট কাজ নিয়ে, তারা ব্যস্ত থাকে ইভিনিং কোর্স নিয়ে, তারা ব্যস্ত থাকে কীভাবে আরএফকিউ (RFQ) করবে। সুতরাং শিক্ষার্থীদের এই সমাবর্তনের আনুষ্ঠানিকতার তাদের কাছে কোনো গুরুত্ব নেই, যে কারণে তারা এতে মনোনিবেশ করে না।
সমাবর্তন নিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ২০ বছরের পথচলায় এখন পর্যন্ত মাত্র একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়েছে। দ্বিতীয় সমাবর্তনের জন্য আমাদের হাজারো শিক্ষার্থী অপেক্ষা করছে। আসলে একটি সমাবর্তন আয়োজন ব্যয়বহুল, সময়সাপেক্ষ এবং এতে অনেকের অংশগ্রহণ প্রয়োজন হয়। বস্তুতপক্ষে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো একটি দিকই আমরা এখনও পরিপূর্ণভাবে গড়ে তুলতে পারিনি। আমাদের যেমন লোকবলের অভাব রয়েছে, তেমনি রয়েছে অর্থসংকট। তারপরও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের কাছে সমাবর্তন একটি আবেগের জায়গা। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতে চায়, বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুনভাবে দেখতে চায়। আমরাও তাদের এই চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে একমত। আমরা আমাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা চেষ্টা করব, দ্বিতীয় সমাবর্তনটি যেন খুব ধুমধাম ও জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপন করতে পারি। আমরা ধীরে ধীরে সমাবর্তন খাতে অর্থ জমা করার চেষ্টা করছি। উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে অতি দ্রুতই দ্বিতীয় সমাবর্তনের আয়োজন করতে পারব।
উল্লেখ্য, সমাবর্তন হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠান, যেখানে শিক্ষার্থীদের ডিগ্রি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রদান করা হয়। সাধারণত নির্দিষ্ট সময় পরপর এই আয়োজন করা হয় এবং এতে উপাচার্য, চ্যান্সেলরসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকেন। শিক্ষার্থীরা অ্যাকাডেমিক পোশাক (গাউন ও ক্যাপ) পরে অংশগ্রহণ করে এবং তাদের শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।
আরটিভি/এসএস




