
বেসরকারি কলেজের ডিগ্রি (পাস) স্তরে বছরের পর বছর পাঠদান করেও এমপিওভুক্তির অনিশ্চয়তায় রয়েছেন ৬৬১ জন তৃতীয় শিক্ষক।
তাদের মধ্যে ২০১৬ সাল পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া ২৬৬ জন এবং ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া ৩৯৫ জন রয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে চাকরি করা এসব শিক্ষক পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫ চূড়ান্ত হলেও তাতে ডিগ্রি (পাস) স্তরের তৃতীয় শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অথচ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে এ পদটি নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করে এমপিওভুক্তির ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলেও নীতিমালায় পদটি অন্তর্ভুক্ত না থাকায় তাদের এমপিওভুক্তির প্রক্রিয়া আটকে রয়েছে।
ডিগ্রি স্তর এমপিওভুক্ত কলেজের নন-এমপিও ডিগ্রি তৃতীয় শিক্ষক সংগঠনের সভাপতি উজ্জ্বল কুমার মণ্ডল বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ডিগ্রি (পাস) স্তরের তৃতীয় শিক্ষকেরা এমপিওভুক্তির বাইরে রয়েছেন। তাদের দাবি বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালায় পদটি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বেসরকারি কলেজে ডিগ্রি (পাস) স্তরের তিন বছরের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকসংকট রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তি-সংক্রান্ত বিধান অনুসারে ডিগ্রি (পাস) পর্যায়ে প্রতি বিষয়ে দুজন শিক্ষক নিয়োগের শর্ত রয়েছে। নতুন বিষয়ে অধিভুক্তি পাওয়া এবং পুরোনো বিষয়ের অধিভুক্তি নবায়নের ক্ষেত্রেও এ শর্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এমপিও নীতিমালায় ডিগ্রি (পাস) স্তরের জন্য একজন শিক্ষকের পদ রাখা হয়েছে। ফলে তিন বছরের কোর্সে নিয়মিত পাঠদান, টেস্ট, টিউটোরিয়াল ও ইনকোর্স পরীক্ষা পরিচালনা, প্রশ্নপত্র তৈরি এবং পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নসহ বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ডিগ্রি স্তরে তৃতীয় শিক্ষক পদটি এমপিও নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত না থাকায় ওই পদে নতুন শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হয়েছে। এমপিওভুক্ত শূন্য পদ না থাকলে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ পাওয়া যায় না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
উজ্জ্বল কুমার মণ্ডল জানান, ডিগ্রি (পাস) স্তরের তিন বছরের শিক্ষা কার্যক্রমে একজনের পরিবর্তে অন্তত দুজন শিক্ষককে এমপিও নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও মাউশির মহাপরিচালকের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছিল।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। একই বছরের ৪ মে মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আজাদ খান স্বাক্ষরিত চিঠিতেও ডিগ্রি (পাস) স্তরের তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির বিষয়টি বিবেচনার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে অনুরোধ জানানো হয়।
এ ছাড়া, ২০২৫ সালের ২৮ অক্টোবর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এমপিওভুক্তি ও ২০২১ সালের নীতিমালা সংশোধনসংক্রান্ত চূড়ান্ত মতবিনিময় সভায় তৃতীয় শিক্ষকদের অন্তর্ভুক্তির দাবি উত্থাপন করেন উজ্জ্বল কুমার মণ্ডল। তবে ২০২৫ সালের সংশোধিত নীতিমালায় তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
উজ্জ্বল কুমার মণ্ডলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত গভর্নিং বডি কর্তৃক বৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া ডিগ্রি স্তরের তৃতীয় শিক্ষকদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তাঁর ২০২৫ সালের ৩০ জুলাইয়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর এবং ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি মাউশির মাধ্যমে তালিকা চূড়ান্ত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
পরবর্তী সময়ে এমপিওভুক্তির বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি চাওয়া হলে ২০২৬ সালের ২৪ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে একটি চিঠি দেওয়া হয়। উপসচিব শিহাব উদ্দিন আহমদের স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বিষয়টি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট এমপিও নীতিমালা অনুসরণ করে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অভিযোগ, তালিকা যাচাই-বাছাই ও বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি চালাচালি হলেও তাদের এমপিওভুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। নীতিমালায় পদটি অন্তর্ভুক্ত না থাকায় দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানও হচ্ছে না।
২০২৫ সালের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় চার বছর মেয়াদি অনার্স কোর্সের জন্য পাঁচজন এবং এক বছর মেয়াদি মাস্টার্স কোর্সের জন্য দুজন শিক্ষককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের জন্য মোট সাতটি শিক্ষক পদের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কিন্তু তিন বছর মেয়াদি ডিগ্রি (পাস) স্তরের তৃতীয় শিক্ষকের পদটি নীতিমালায় স্থান পায়নি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ডিগ্রি স্তরের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ও পরীক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনায় শিক্ষকসংকট দূর করতে তৃতীয় শিক্ষক পদটি জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের মাধ্যমে ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিধি অনুযায়ী নিয়োগ পাওয়া ডিগ্রি স্তরের তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এরপরও বাদ পড়া এবং পরবর্তী সময়ে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের একটি বড় অংশ এখনও এমপিওভুক্ত হতে পারেননি।
দীর্ঘদিন ধরে এমপিওভুক্তির অপেক্ষায় থাকা এসব শিক্ষকের দাবি, তাদের বৈধ নিয়োগ ও চাকরির মেয়াদ বিবেচনায় নিয়ে নীতিমালায় তৃতীয় শিক্ষক পদ অন্তর্ভুক্ত করে দ্রুত এমপিওভুক্তির ব্যবস্থা করা হোক।
আরটিভি/এসএস


