
হাসপাতালের ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটগুলির নাম, যেমন—আইসিইউ, সিসিইউ, এইচডিইউ বা লাইফ সাপোর্ট নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রায়শই অস্পষ্টতা বা ভুল ধারণা থেকে যায়। কোন পরিস্থিতিতে রোগীকে কোথায় রেফার করা হয় এবং সেখানে কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়, তা জানা জরুরি।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মতে, রোগীর শারীরিক অবস্থার পরিমাপ করা হয় তার ‘ভাইটালস’ যেমন—হার্ট রেট, রক্তচাপ, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা, ইউরিন আউটপুট ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে। এই ভাইটালসগুলি যখন অস্বাভাবিক হয়ে পড়ে, তখন প্রয়োজন হয় বিশেষ পর্যবেক্ষণের।
আইসিইউ কনসালটেন্ট ডা. আশরাফ জুয়েল জানান, ভাইটালস এলোমেলো হলে কিছু নির্দিষ্ট মাপকাঠি থেকে বোঝা যায় রোগীর স্পেশাল মনিটরিং লাগবে এবং সেই অনুযায়ী তাকে লেভেল–১ বা লেভেল–২ কেয়ারে পাঠানো হয়।
এইচডিইউ-এর পূর্ণরূপ ‘হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট’। রোগীর অবস্থা খুব খারাপও নয়, আবার স্বাভাবিকও নয়—এমন অবস্থায় অতিরিক্ত মনিটরিংয়ের জন্য রোগীকে এইচডিইউতে রাখা হয়। এটি ওয়ার্ড বা কেবিন এবং আইসিইউ-এর মাঝামাঝি একটি পর্যায়।
অন্যদিকে, সিসিইউ-এর পূর্ণরূপ ‘করোনারি কেয়ার ইউনিট’ যা মূলত হৃদরোগজনিত জরুরি অবস্থার জন্য ব্যবহৃত হয়। হার্ট অ্যাটাক বা অ্যাকিউট করোনারি সিন্ড্রোমের মতো ক্ষেত্রে রোগীকে সিসিইউতে রেফার করা হয়।
ডা. আশরাফের মতে, যে হার্ট পেশেন্টদের কেবিন বা ওয়ার্ডে রাখলে যেকোনো মুহূর্তে হার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, তাদেরকেই সিসিইউতে রাখা হয়। তবে শুধু হৃদযন্ত্র সংক্রান্ত জটিলতার পেশেন্টদের জন্যই সিসিইউ। যদি সঙ্গে ফুসফুস, কিডনি বা ব্রেনের মতো একাধিক অঙ্গের সাপোর্টের প্রয়োজন হয়, তবে রোগীকে আইসিইউতে নেওয়া হতে পারে।
আইসিইউ-এর পূর্ণরূপ ‘ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিট’ বা ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট। রোগীর যখন একাধিক অঙ্গের জন্য সাপোর্ট প্রয়োজন হয়, সেই অবস্থার জন্যই আইসিইউ।
উদাহরণস্বরূপ, কোনো রোগীর কিডনি সমস্যা এমন পর্যায়ে যে তাকে ডায়ালাইসিস করতে হচ্ছে অথবা ফুসফুস অক্সিজেন নিতে পারছে না এবং কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে, তখন আইসিইউতে নিয়ে বাহ্যিকভাবে সেই অঙ্গগুলোকে সক্রিয় রাখার সাপোর্ট দেওয়া হয়। একজন রোগীকে এইচডিইউ হয়ে আইসিইউতে যেতে হতে পারে, আবার গুরুতর অবস্থায় কেবিন বা ইমার্জেন্সি থেকেও সরাসরি আইসিইউতে রেফার করা যেতে পারে।
পূর্বে আইসিইউতে বিশেষায়িত ইউনিট না থাকলেও এখন অনেক হাসপাতালে সার্জিক্যাল আইসিইউ, নিউরো আইসিইউ, পেডিয়াট্রিক আইসিইউ, রেসপিরেটরি আইসিইউ-এর মতো বিশেষায়িত ইউনিট দেখা যাচ্ছে।
খুব সংকটময় অবস্থায় শ্বাসযন্ত্রের কার্যক্রম সচল রাখার প্রক্রিয়া হলো ভেন্টিলেশন, যা সাধারণ মানুষ লাইফ সাপোর্ট হিসেবে জানে।
ডা. আশরাফ বলেন, যে পেশেন্টের ফুসফুস খারাপ, অক্সিজেন নিতে পারছে না বা কার্বন ডাই অক্সাইড বের করতে পারছে না, তখন তাকে এই সাপোর্ট দেওয়া হয়। শ্বাসযন্ত্র ঠিকভাবে কাজ না করলে চার থেকে আট মিনিটের মধ্যেই রোগীর ব্রেন স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তাই এর গুরুত্ব অনেক বেশি এবং এটিকে লাইফ সাপোর্টও বলা হয়।
তবে ‘লাইফ সাপোর্ট মানেই নিশ্চিত মৃত্যু’ এই ধারণাটি একেবারেই ভুল। ডা. আশরাফের মতে, চিকিৎসাবিজ্ঞানে ভেন্টিলেশন একটি চিকিৎসা প্রক্রিয়া যা রোগীকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যেই করা হয়েছে এবং এটি একটি ট্রিটমেন্ট অপশন।
এই ভুল ধারণার পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে: এক. রোগীর আর্থিক সক্ষমতার কারণে ‘টার্মিনাল স্টেজ’ বা একেবারে শেষ মুহূর্তে গিয়ে সাপোর্ট নেওয়া, যখন ফেরানো কঠিন হয়ে যায়; এবং দুই. আইসিইউ বেডের স্বল্পতা।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক মান মেনে চলা একটি হাসপাতালের আইসিইউ থেকে গত এক বছরে ৬০-৭০ শতাংশ পেশেন্ট ফিরে এসেছেন, যা প্রমাণ করে লাইফ সাপোর্ট কোনো নিশ্চিত মৃত্যুর পথ নয়, বরং জীবনরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সূত্র: বিবিসি বাংলা
আরটিভি/এএইচ




