মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের অনেকেই শুধু একটি ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে দেখেন। কিন্তু এই পরিচয়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য স্বপ্ন, ত্যাগ, অপমান, পরিশ্রম এবং নীরব কান্নার গল্প।
এই পেশায় যারা কাজ করেন, তাদের অনেকেই অত্যন্ত মেধাবী। অনেকেরই বড় বড় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করার যোগ্যতা রয়েছে। আবার এমনও অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা অনিয়ম কিংবা ঘুষ দিয়ে চাকরি নেওয়ার পথ বেছে নেননি। নিজের যোগ্যতা, সততা এবং পরিশ্রমের ওপর বিশ্বাস রেখেই তারা মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছেন।
ভোর থেকে রাত পর্যন্ত তাদের ছুটে বেড়াতে হয় হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং চেম্বারে। প্রচণ্ড রোদ, ঝুম বৃষ্টি কিংবা অসহনীয় গরম তাদের থামাতে পারে না। মাস শেষে বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণের চাপ, কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি, চাকরি টিকিয়ে রাখার লড়াই এবং অনিশ্চয়তা নিয়েই প্রতিদিন তাদের পথ চলা।
একটি ওষুধ কোম্পানিতে যখন নতুন কোনো ওষুধ বাজারে আনে, তখন সেই ওষুধের কার্যকারিতা, ব্যবহার এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য চিকিৎসকদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভরা। এ জন্য তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা চিকিৎসকের চেম্বারের বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন, শুধু কয়েক মিনিট সময় পেলে নতুন ওষুধটির পরিচয় তুলে ধরবেন।
অনেক সময় তাদের সঙ্গে অপ্রত্যাশিত আচরণ করা হয়। কেউ রূঢ় ভাষায় কথা বলেন, কেউ অবহেলা করেন, আবার অনেক সময় রোগী কিংবা রোগীর স্বজনরাও বিরক্তি প্রকাশ করেন। অথচ খুব কম মানুষই বোঝেন, একজন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করতে যান নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়। নতুন ওষুধ সম্পর্কে চিকিৎসকদের সঠিক তথ্য জানানো এবং সেই তথ্যের মাধ্যমে রোগীদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখাই তাদের দায়িত্ব।
উৎসবের ছুটিতে পরিবারের সঙ্গে ঈদ কাটানোর সুযোগ অনেক রিপ্রেজেন্টেটিভের হয়ে ওঠে না। সন্তানের জন্মদিন, বাবা মায়ের অসুস্থতা কিংবা পারিবারিক আনন্দের মুহূর্তেও অনেক সময় তাদের কর্মস্থলে থাকতে হয়। নিজের কষ্টকে লুকিয়ে মুখে হাসি রেখেই তারা দায়িত্ব পালন করেন।
তাই কোনো মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভকে ছোট করে দেখবেন না। সম্মান করুন। কারণ তিনি শুধু একটি কোম্পানির প্রতিনিধি নন, তিনি একজন শিক্ষিত, মেধাবী, পরিশ্রমী মানুষ, যিনি দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি তারাও ওষুধ সম্পর্কে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিয়ে চিকিৎসা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন।
সব পেশারই মর্যাদা আছে। আর একজন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভের কষ্ট সত্যিই বুঝতে হলে একদিন তার সঙ্গে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পথ চললেই যথেষ্ট।
টার্গেটের চাপ, অনিশ্চিত কর্মঘণ্টা, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা আর প্রতিদিনের নীরব অপমান—সব মিলিয়ে এক অদেখা সংগ্রামের নাম মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ। দেশের লাখো শিক্ষিত যুবকের এই আর্তনাদ কোনো পরিসংখ্যানে ওঠে না। তাদের এই লড়াইকে সম্মান জানানোই হোক আমাদের মানবিকতার প্রথম ধাপ।
আরটিভি/এমএম



