বর্ষায় বরিশাল গেলে যেসব জায়গায় বেড়াবেন 

আরটিভি নিউজ

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬ , ১২:৪৫ এএম


বর্ষায় বরিশাল গেলে যেসব জায়গায় বেড়াবেন 

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের সৌন্দর্যের কথা উঠলে বরিশালের নাম সবার আগে আসে। নদী, খাল-বিল, সবুজ প্রকৃতি আর বর্ষার থইথই পানিতে বরিশাল যেন নতুন রূপে সেজে ওঠে। তাই বর্ষাকালই বরিশাল ভ্রমণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রকৃতির অপূর্ব মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলে রয়েছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান, যা যেকোনো ভ্রমণপিপাসীকে মুগ্ধ করবে।

অশ্বিনীকুমার টাউন হল
বরিশাল সদরের প্রাণকেন্দ্রে মূল সড়কে অবস্থিত এই লাল রঙের প্রাচীন ভবনটিকে শহরের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বরিশালের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অশ্বিনীকুমার দত্তের নামানুসারে এ ভবনের নামকরণ করা হয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ১৯২১ সালে দেড় বিঘা জমির ওপর এই টাউন হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন অশ্বিনীকুমার দত্ত। ভবন তৈরির কাজ শেষ হয় ১৯৩০ সালে। শতবর্ষী এই ভবনে এখন সংস্কারকাজ চলছে।

বিবির পুকুর
বরিশাল শহরের প্রাণকেন্দ্রে এই জলাশয়ও শতবর্ষী ও ঐতিহ্যবাহী। কথিত আছে, ১৯০৮ সালে জিন্নাত বিবি নামে একজন দয়ালু নারী শহরের পানির সংকট দূর করতে এই পুকুর খনন করেন। এর চারপাশের এলাকা বিবির মহল্লা নামে পরিচিত। পুকুরটি এখন গ্রিলে ঘেরা হলেও এর চারপাশের ওয়াকওয়ে শহরের একটি অন্যতম আড্ডাস্থল হিসেবে গড়ে উঠেছে।

৩০ গোডাউন
কীর্তনখোলা নদীর তীরে ৩০ গোডাউন নামের এই জায়গায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী গড়ে তুলেছিল দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্তম সামরিক ক্যাম্প ও নির্যাতনকেন্দ্র। একাত্তরে প্রায় ৩ হাজার বাঙালিকে এখানে হত্যা করে কীর্তনখোলা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। নির্যাতন করা হয় আরও হাজার হাজার মানুষকে।

আরও পড়ুন

কীর্তনখোলার তীরে শহীদদের রক্তে স্নাত ৩০ গোডাউন বধ্যভূমিতে গড়ে তোলা হয়েছে একটি স্মৃতিসৌধ। যে উঁচু জায়গা থেকে লাশগুলো খালে ফেলা হতো সেটাও সংরক্ষণ করা হয়েছে। ঐতিহাসিক বটবৃক্ষ ও স্মৃতিসৌধটির পাশেই কীর্তনখোলা নদীর তীরে পাকা রাস্তায় চায়ের স্টল ও ওয়াকওয়েতে বসে কিছু সময় কাটানো যায়।

অক্সফোর্ড মিশন চার্চ
বরিশাল শহরের সবচেয়ে সুন্দর স্থাপনা ১১৩ বছরের পুরোনো অক্সফোর্ড মিশন চার্চ। ধারণা করা হয়, এটি এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম গির্জা। এই গির্জার নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯০৩ সালে। ব্রিটেনের রাজার পক্ষ থেকে ব্রাদারহুড অব এপিফ্যানি সংগঠন এই গির্জা গড়ে তোলে বলে এর আরেক নাম অক্সফোর্ড এপিফ্যানি গির্জা।

৩৫ একর জমির ওপরে অবস্থিত কমপ্লেক্সটিতে চার্চ ছাড়াও আছে ১৩টি ছোট-বড় পুকুর, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, আবাসিক ছাত্র ও ছাত্রী হোস্টেল, ফাদার ও সিস্টারদের আবাসন, পাঠাগার ও হাসপাতাল।

গ্রিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই গির্জা টেরাকোটা রঙের লালচে ইট দিয়ে তৈরি। বিশাল প্রার্থনাকক্ষের মূল বেদিতে রাখা ক্রুশটি বেথলেহেম থেকে এসেছে। সবুজ মাঠ, পুকুর, অপূর্ব সুন্দর বাগান—সব মিলিয়ে এই এপিফ্যানি গির্জায় যতক্ষণ থাকবেন, হৃদয় দিয়ে এর সৌন্দর্য ও পবিত্রতা উপলব্ধি করতে পারবেন।

সেন্ট পিটার্স ক্যাথেড্রাল
শহরের সদর রাস্তায় সাদা রঙের আরেক দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা হলো এই সেন্ট পিটার্স ক্যাথেড্রাল। ১৮৬৪ সালে এটি প্যারিশ হিসেবে শুরু হয় এবং পরে ক্যাথেড্রালে উন্নীত হয় (প্যারিশ হলো নির্দিষ্ট এলাকার স্থানীয় খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের গির্জা, এবং ক্যাথেড্রাল হলো কোনো অঞ্চলের প্রধান বিশপের বসার নির্দিষ্ট আসন বা প্রধান গির্জা)। প্রার্থনাকক্ষটি ঘুরে দেখার পর বিকেলে পাশের শান্ত–সুন্দর পুকুরঘাটে বসে থাকতেই অসাধারণ লাগছিল।

মুকুন্দ দাসের কালীবাড়ি
বরিশালের নথুল্লাপাড়ায় প্রধান বাসস্ট্যান্ডের কাছেই আরেকটি শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপনা চারণ কবি মুকুন্দ দাসের কালীবাড়ি। স্থানীয় ভক্তদের কাছে এটি পবিত্র জাগ্রত পীঠ হিসেবে বিবেচিত। এখানে ধুমধাম করে শ্যামাপূজা হয়। স্বদেশি আন্দোলনখ্যাত চারণ কবি মুকুন্দ দাস মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

আরও পড়ুন

ব্রজমোহন কলেজ
বিএম কলেজ বা ব্রজমোহন কলেজের বয়সও ১৩৫ বছর ছাড়িয়ে গেছে। শিক্ষানুরাগী অশ্বিনীকুমার দত্ত ১৮৮৯ সালে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তখন কলেজটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রাচীন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল দুই বাংলায়। বিশাল এলাকাজুড়ে স্থাপিত এই কলেজে অশ্বিনীকুমার দত্ত ও কবি জীবনানন্দ দাশের নামে দুটি হল আছে। বিএম কলেজে অধ্যাপনা করতেন কবি জীবনানন্দ দাশ। আরেক প্রিয় কবি আবুল হাসানও যে এই কলেজের ছাত্র ছিলেন, তা পুকুরপাড়ে হাঁটতে গিয়ে মনে পড়ল।  

বরিশাল শহর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে বরিশাল-স্বরূপকাঠি সড়কে অবস্থিত দুর্গাসাগর দিঘি দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্তম জলাশয়। ১৭৮০ সালে পানীয় জলের সংকট দূর করতে রাজা জয় নারায়ণের মা রানি দুর্গাবতী এটি খনন করান এবং নিজের

নামানুসারে এর নাম রাখেন দুর্গাসাগর। দিঘিটির মোট আয়তন প্রায় ২৫ হেক্টর বা প্রায় ৬২ একর। বিকেলের মনোরম আলোয় দিঘির স্বচ্ছ সবুজাভ জল আর চারপাশের ঘন সবুজ গাছপালা অসাধারণ লাগছিল।

বর্ষায় থই থই পানিতে অপরূপা, আবার শীতে এখানে এসে বাসা বাঁধে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি। ২৫০ বছরের পুরোনো এই দিঘি দেখতে ৩০ টাকার টিকিট কেটে যে কেউ প্রবেশ করতে পারেন।

সাতলার বিল
বরিশাল শহর থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে উজিরপুরে সাতলার বিল যেন শাপলা আর পদ্মের রাজ্য। ভরা বর্ষায় গোটা বিল শাপলায় ঢেকে যায়, তখন লাল রঙে রঙিন হয়ে ওঠে। ঘাট থেকে একটা নৌকা নিয়ে বিলের মাঝ পর্যন্ত যেতেই শুরু হলো বৃষ্টি। পানিতে শাপলা, ঝিরঝির বৃষ্টির ফোঁটা, মেঘবরণ আকাশ আর উতল হাওয়া মিলে পরিবেশটা অপার্থিব হয়ে উঠেছিল। সাতলার বিলে যেতে হবে খুব ভোরে; কারণ, রোদ উঠলে শাপলা পদ্মগুলো বুজে যেতে শুরু করে।

ভাসমান পেয়ারা বাজার
বরিশালে বর্ষার সত্যিকারের সৌন্দর্য দেখতে হলে ভোরবেলা রওনা দিতে হবে ঝালকাঠির ভীমরুলিতে ভাসমান পেয়ারা বাজারের উদ্দেশে। বর্ষায় আঁকাবাঁকা এই জলপথে সকালবেলা বসে ভাসমান বাজার।

নামে পেয়ারার বাজার হলেও নানা ধরনের সবজি, আমড়া, কাঁঠাল, পেঁপেসহ আরও অনেক কিছু বিক্রি হচ্ছে নৌকায়। আটঘর স্কুলের সামনে থেকে একটা নৌকা নিয়ে পানির মধ্য দিয়ে ঘন সবুজ বনের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে পৌঁছাতে হয় বাজারে।

যাত্রাপথটিই অসাধারণ সুন্দর। দুধারে নানা রকমের গাছ, বেশির ভাগই পেয়ারা ও অন্যান্য ফলের, কোনো কোনোটির ডালপালা ঝুঁকে এসে নৌকা স্পর্শ করছে, পাখিরা ওড়াউড়ি করছে নির্ভয়ে, পানকৌড়ি বসে আছে গাছের মাথায়। থাইল্যান্ডের ফ্লোটিং মার্কেটের চেয়েও সুন্দর আমাদের এই ভাসমান বাজার।

মনে রাখবেন, অপূর্ব এই জলপথে পানির বোতল, প্লাস্টিকের প্যাকেট ফেলা যাবে না; হাত বাড়িয়ে পেয়ারা ছিঁড়ে খাবেন না। এ অঞ্চলের মানুষ এই বাজারের ওপর নির্ভরশীল, তাই তাঁদের বিরক্ত করবেন না।

প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও জলপথের বৈচিত্র্য একসঙ্গে উপভোগ করতে চাইলে বর্ষায় বরিশাল হতে পারে আপনার পরবর্তী ভ্রমণের সেরা ঠিকানা।

আরটিভি/এমএম

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission