
মন খারাপ, মানসিক চাপ কিংবা দুশ্চিন্তার সময় নিজেকে ভালো রাখতে সবসময় বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না। মাত্র ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ডের কিছু সহজ অভ্যাসও মানসিক চাপ কমাতে, মনোযোগ বাড়াতে এবং নিজেকে কিছুটা শান্ত রাখতে সহায়ক হতে পারে। এসব ছোট অনুশীলনকে বলা হয় ‘মাইক্রো-প্র্যাকটিস’।
‘মাইক্রো-প্র্যাকটিস’ বইয়ের লেখক এলি সাসম্যানের মতে, প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও অল্প সময়ের এসব অনুশীলন করা সম্ভব। এমন চারটি সহজ অভ্যাস তুলে ধরা হলো,
হাসির ব্যায়াম
কোনো কৌতুক বা মজার ঘটনা ছাড়াই ইচ্ছাকৃতভাবে হাসা হলো হাসির ব্যায়ামের মূল বিষয়। শুরুতে কৃত্রিমভাবে হাসা কিছুটা অস্বস্তিকর মনে হলেও ধীরে ধীরে তা স্বাভাবিক হাসিতে পরিণত হতে পারে।
ডেলফ্ট ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষক নাটালি ভ্যান ডার ওয়ালের মতে, এ অনুশীলন শুরু হয় গভীর শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার মাধ্যমে। এরপর কৃত্রিমভাবে হাসতে শুরু করতে হয়। কিছুক্ষণ পর সেই হাসি স্বাভাবিক হয়ে আসতে পারে।
যেভাবে করবেন: প্রথমে তিনবার গভীর শ্বাস নিন। এরপর পেটের ওপর হাত রেখে কৃত্রিমভাবে হাসা শুরু করুন। প্রয়োজনে ‘হি হি হি, হা হা হা’ বলে শুরু করতে পারেন। ধীরে ধীরে হাসির শব্দ বাড়িয়ে শেষে আবার গভীর শ্বাস নিন। এরপর এমন কোনো বিষয় ভাবুন, যার জন্য আপনি কৃতজ্ঞ।
মাইক্রো যোগা
দীর্ঘ সময় কম্পিউটার বা মোবাইলের সামনে বসে থাকলে শরীরে জড়তা তৈরি হতে পারে। কুঁজো হয়ে বসার অভ্যাসও শরীরের ওপর চাপ বাড়ায়। এ অবস্থায় অল্প সময়ের কিছু স্ট্রেচিং বা শরীর প্রসারিত করার ব্যায়াম উপকারী হতে পারে, যাকে সাসম্যান ‘মাইক্রো যোগা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১৫ মিনিট পরপর ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ড শরীর প্রসারিত করলে কাজের দক্ষতা বাড়তে পারে। গভীর শ্বাস ও মনোযোগের সঙ্গে এ ধরনের ব্যায়াম করলে মানসিক চাপও কমতে পারে।
যেভাবে করবেন: দুই হাত পিঠের পেছনে নিয়ে আঙুল জড়িয়ে ধরুন। শ্বাস নেওয়ার সময় হাত নিচের দিকে টানুন এবং বুক সামান্য ওপরে তুলুন। শ্বাস ছাড়ার সময় শরীর ঢিলে করে দিন। এভাবে দুই থেকে তিনবার ধীরে শ্বাস নিন।
ধীরে শ্বাস নেওয়া
মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তার সময় ধীরে ও গভীরভাবে শ্বাস নেওয়া শরীর ও মনকে শান্ত করতে সাহায্য করতে পারে। এতে ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ বা বিপদের সময় শরীরের দ্রুত প্রতিক্রিয়ার অবস্থা কিছুটা কমে আসতে পারে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, তিনবার ধীরে গভীর শ্বাস নেওয়ার সঙ্গে মস্তিষ্কের এমন কিছু তরঙ্গের সম্পর্ক রয়েছে, যা শান্ত থাকা ও মনোযোগের সঙ্গে যুক্ত।
ইতালির ইউনিভার্সিটি অব নেপলস ফেদেরিকো ২-এর গবেষক অমিত কুমারের মতে, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আগে কিংবা মন অস্থির হয়ে পড়লে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে।
যেভাবে করবেন: আরাম করে বসে চোখ বন্ধ করুন। ধীরে তিনবার গভীর শ্বাস নিন। প্রতিবার প্রায় ১০ সেকেন্ড সময় নিন। শ্বাস নেওয়ার চেয়ে ছাড়ার সময় কিছুটা বেশি রাখুন। পুরো প্রক্রিয়ায় নাক দিয়ে বাতাস প্রবেশ ও বের হওয়ার দিকে মনোযোগ দিন।
নিজেকে শান্ত করার স্পর্শ
নিজেকে আলতো করে স্পর্শ করার মাধ্যমেও মন শান্ত করা সম্ভব। সাসম্যান ও তাঁর সহকর্মীদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ২০ সেকেন্ডের এমন অনুশীলন থেকেও উপকার পাওয়া যেতে পারে।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের প্রতি ভালো ও সদয় চিন্তা করার সময় বুক ও পেটের ওপর হাত রেখেছিলেন। এরপর তাদের শরীরে স্ট্রেস হরমোন ‘কর্টিসল’-এর মাত্রা অন্য দলের তুলনায় কম দেখা যায়। পরবর্তী আরেকটি গবেষণায় নিয়মিত এ অনুশীলনের সঙ্গে ছয় মাস পর নিজের প্রতি ভালোবাসা ও সহানুভূতির অনুভূতি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া যায়।
যেভাবে করবেন: বুক বা হাতের ওপর আলতো করে এক বা দুই হাত রাখুন। ধীরে শ্বাস নিন এবং নিজের সম্পর্কে ইতিবাচক কিছু ভাবুন। একই সঙ্গে হাতের উষ্ণতা ও হালকা চাপ অনুভব করার দিকে মনোযোগ দিন।
সবগুলো অভ্যাস একসঙ্গে করার প্রয়োজন নেই। নিজের জীবনযাত্রার সঙ্গে যেটি সহজে মানিয়ে যায়, সেটি বেছে নেওয়াই যথেষ্ট। গবেষকদের মতে, একেকজনের ক্ষেত্রে একেক ধরনের অনুশীলন বেশি কার্যকর হতে পারে। তাই কয়েকটি পদ্ধতি চেষ্টা করে নিজের জন্য আরামদায়ক অভ্যাসটি নিয়মিত করা যেতে পারে।
হাঁটা, বাসন ধোয়া কিংবা অন্যান্য দৈনন্দিন কাজের মাঝেও কিছুক্ষণ ধীরে শ্বাস নেওয়া বা নিজের অনুভূতির দিকে মনোযোগ দেওয়া যায়। ছোট এই বিরতিগুলো নিয়মিত চর্চা করলে মানসিক চাপ সামলাতে এবং নিজেকে কিছুটা শান্ত রাখতে সহায়ক হতে পারে।
আরটিভি/এসকে




