
নিজের জীবন দিয়ে স্বাধীনতার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে চেয়েছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান। ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট পাকিস্তান থেকে বিমান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে শহীদ হন তিনি। আজ (২০ আগস্ট) তাঁর ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী।
মহান মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতা ও অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ লাভ করেন মতিউর রহমান। তাঁর শাহাদাতের ৩৫ বছর পর ২০০৬ সালে পাকিস্তান থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয় তাঁর দেহাবশেষ। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ ও তাঁর ব্যক্তিগত আগ্রহে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ২৪ জুন রাতে তাঁর দেহাবশেষ ঢাকায় পৌঁছালে খালেদা জিয়া রাষ্ট্রীয়ভাবে তা গ্রহণ করেন। পরদিন ২৫ জুন পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে পুনরায় দাফন করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের টানে বদলে যায় মতিউরের জীবন
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের জন্ম ১৯৪১ সালের ২৯ অক্টোবর ঢাকার পৈতৃক নিবাসে। তাঁর বাবা মৌলভী আব্দুস সামাদ ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী এবং মা মোবারকুন্নেসা ছিলেন গৃহিণী। নয় ভাই ও দুই বোনের মধ্যে মতিউর ছিলেন অষ্টম।
১৯৫২ সালে তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলাতেও তাঁর দক্ষতা ছিল। ১৯৫৬ সালে ভর্তি হন পাকিস্তান বিমানবাহিনী স্কুল, সারগোদায়। ১৯৬০ সালে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
১৯৬১ সালের ১৫ আগস্ট পাকিস্তান বিমানবাহিনী একাডেমি, রিসালপুরে ৩৬তম সাধারণ দায়িত্ব কোর্সে উড্ডয়ন প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে যোগ দেন। ১৯৬৩ সালের ২৩ জুন তিনি বিমান শাখায় কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। তাঁর চাকরির নম্বর ছিল পিএকে-৪৩৬৭।
পরবর্তী সময়ে মৌরিপুরের দ্বিতীয় প্রশিক্ষণ স্কোয়াড্রন, করাচির যুদ্ধবিমান নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ বিদ্যালয় এবং উড্ডয়ন প্রশিক্ষক বিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণ নেন। কর্মজীবনে এফ-৮৬ যুদ্ধবিমানের পাইলট হিসেবে ১৯ ও ২৫ নম্বর স্কোয়াড্রনে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। প্রশিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন বিমানবাহিনী একাডেমি, রিসালপুর ও দ্বিতীয় স্কোয়াড্রনে। কিছু সময় ইসলামাবাদের আন্তঃবাহিনী গোয়েন্দা সদর দপ্তরেও দায়িত্ব পালন করেন।
দুর্ঘটনাও থামাতে পারেনি তাঁর সাহস
১৯৬৭ সালে এক পাঞ্জাবি পাইলটের সঙ্গে প্রশিক্ষণকালীন আকাশযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সময় তাঁর বিমান বিধ্বস্ত হয়। তিনি বিমান থেকে বেরিয়ে প্রাণে বেঁচে যান। এ ঘটনায় দুজনের বিরুদ্ধেই সামরিক আদালতে বিচার হয়। পরে পাঞ্জাবি পাইলট শাস্তি না পেলেও মতিউর রহমানকে এক বছরের জন্য উড্ডয়ন থেকে বিরত রাখা হয়।
১৯৬৮ সালের ১৯ এপ্রিল মিলি খানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ এপ্রিল তাঁদের প্রথম মেয়ে মাহিন এবং ১৯৭০ সালের ১৪ ডিসেম্বর দ্বিতীয় মেয়ে তুহিনের জন্ম হয়।
১৯৭১ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে বার্ষিক ছুটিতে পরিবার নিয়ে ঢাকায় আসেন মতিউর। তখন দেশে স্বাধিকার আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠেছে। ১ মার্চ কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার কথা থাকলেও তিনি আর ফিরে যাননি।
২৫ মার্চ তিনি নরসিংদীর গ্রামের বাড়িতে যান। সেখানে স্বাধীনতাকামী মানুষদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। ৪ এপ্রিল পাকিস্তানি বিমানবাহিনী নরসিংদীতে হামলা চালালে তিনি ভৈরব হয়ে তাঁর নানার বাড়ি গোকুলনগরে চলে যান।

পাকিস্তান থেকে বিমান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা
দেশের জন্য লড়াই করতে মতিউর রহমান পাকিস্তান থেকে একটি বিমান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। ৯ মে ১৯৭১ তিনি সপরিবারে কর্মস্থলে ফিরে যান। দেরিতে কাজে যোগ দেওয়ার কারণ জানানোর পর তাঁকে উড্ডয়ন নিরাপত্তা কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
তবে নিয়মিত দায়িত্ব পালনের আড়ালে তিনি কয়েকজন দেশপ্রেমিক বাঙালি কর্মকর্তার সঙ্গে বিমান নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা চালিয়ে যেতে থাকেন।
২০ আগস্টের সেই শেষ উড্ডয়ন
পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৭১ সালের ২০ আগস্ট সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে মতিউর রহমান পাঞ্জাবি পাইলট কর্মকর্তা রাশেদ মিনহাজকে সঙ্গে নিয়ে টি-৩৩ প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে ভারতের উদ্দেশে উড্ডয়ন করেন। বিমানের পরিচিতি ছিল ‘ব্লু বার্ড-১৬৬’।
বিমানটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পাইলটের মধ্যে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে সিন্ধুর বেদিন এলাকায় বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। এতে দুজনই নিহত হন।
এই আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন মতিউর রহমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য তাঁর অসীম সাহসিকতার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ প্রদান করা হয়।
পাকিস্তানে পড়ে ছিল বীরের কবর
শহীদ হওয়ার পর পাকিস্তান সরকার মতিউর রহমানের মরদেহ করাচির মাসরুর বিমানঘাঁটির চতুর্থ শ্রেণির কবরস্থানে দাফন করে। ফলে বাংলাদেশের সাত বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে পাঁচজনের সমাধি দেশে থাকলেও দীর্ঘদিন মতিউর রহমানের কবর পাকিস্তানেই থেকে যায়।
কবরটি ছিল পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর নিয়ন্ত্রিত এলাকায়। সাধারণ মানুষের সেখানে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। তাঁর পরিবারের সদস্যরাও দীর্ঘদিন কবর জিয়ারত করতে পারেননি।
১৯৯৪ সালে খালেদা জিয়া সরকারের প্রথম মেয়াদে পরিবারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়ার পর মতিউর রহমানের পরিবারের সদস্যদের পাকিস্তানে তাঁর কবর জিয়ারতের সুযোগ তৈরি হয়। তাঁর মেয়ে মাহিন, জামাতা ফয়সাল খন্দকার ও নাতি রাশাদ সেখানে গিয়ে কবর জিয়ারত করেন। দাফনের প্রায় ২৩ বছর পর পরিবারের সদস্যরা প্রথমবার তাঁর কবরের কাছে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে আবারও কবরের কাছে যেতে তাঁদের বাধার মুখে পড়তে হয়। এরপর থেকেই মতিউর রহমানের দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি আরও জোরালোভাবে আলোচনায় আসে।
খালেদা জিয়ার উদ্যোগে দেশে ফেরে বীরের দেহাবশেষ
মতিউর রহমানের দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত আগ্রহ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০০৬ সালে পাকিস্তান সফরের সময় তাঁর দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
শেষ পর্যন্ত ২৪ জুন ২০০৬ রাতে পাকিস্তান থেকে মতিউর রহমানের দেহাবশেষ ঢাকায় পৌঁছায়। দেশের মানুষের পক্ষ থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তা গ্রহণ করেন।
পরদিন ২৫ জুন পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে পুনরায় দাফন করা হয় বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে।
এভাবে শাহাদাতের ৩৫ বছর পর নিজের দেশের মাটিতে ফিরে আসেন বাংলাদেশের এই বীর সন্তান।
যে বিমানবন্দর দিয়ে গিয়েছিলেন, সেখানেই ফিরল তাঁর কফিন
মতিউর রহমান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ ছাড়ার যে বিমানবন্দর ব্যবহার করেছিলেন, ৩৫ বছর পর তাঁর কফিনও সেই বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। তখন স্থানটি জাতীয় প্যারেড স্কয়ার হিসেবে পরিচিত ছিল।
কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানানোর সেই মুহূর্ত ছিল দেশের মানুষের জন্য অত্যন্ত আবেগঘন। বিশেষ করে স্বাধীনতার পর জন্ম নেওয়া প্রজন্মের কাছে এটি ছিল এক বিরল অভিজ্ঞতা—যে বীর দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছিলেন, তাঁর কফিনের সামনে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ।
অর্জন ও অবদান
বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের সবচেয়ে বড় অর্জন তাঁর দেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ। পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কর্মরত থেকেও তিনি নিজের মাতৃভূমির স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন। শুধু মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেই থেমে থাকেননি; পাকিস্তান থেকে একটি প্রশিক্ষণ বিমান নিয়ে ভারতের উদ্দেশে উড্ডয়ন করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সাহসী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছিলেন।
তিনি ছিলেন দক্ষ যুদ্ধবিমান পাইলট, প্রশিক্ষক এবং সামরিক কর্মকর্তা। কর্মজীবনে এফ-৮৬ যুদ্ধবিমান চালানো থেকে শুরু করে প্রশিক্ষক ও উড্ডয়ন নিরাপত্তা কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধে তাঁর এই অসামান্য সাহসিকতার স্বীকৃতিই হলো দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব বীরশ্রেষ্ঠ।
আজও অনুপ্রেরণার নাম মতিউর রহমান
মাত্র ২৯ বছর বয়সে শহীদ হওয়া মতিউর রহমান রেখে গেছেন দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তাঁর জীবনের শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে, স্বাধীনতার জন্য তিনি কতটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন।
পাকিস্তানের মাটিতে ৩৫ বছর পড়ে থাকার পরও তাঁর স্মৃতি মুছে যায়নি। বরং দেশে ফিরে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পুনঃসমাহিত হওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি ফিরে এসেছেন তাঁর নিজের মানুষের কাছে।
আজ ২০ আগস্ট, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী। গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় জাতি স্মরণ করছে সেই বীরকে, যিনি নিজের জীবন দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে নিজের নাম অমর করে গেছেন।
আরটিভি/জেএমএ


