
মৃত্যুর ৯৫ বছর পরও লিবিয়ার মানুষের মনে অমর হয়ে আছেন ওমর আল-মুখতার। ইতালীয় ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২০ বছর সশস্ত্র প্রতিরোধের নেতৃত্ব দেওয়া এই নেতা আজও লিবিয়ায় প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে স্মরণীয়।
আজকের (১৬ সেপ্টেম্বর) এই দিনে ১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ৭৩ বছর বয়সে ইতালীয় দখলদারদের হাতে ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড হয় ওমর আল-মুখতারের। আত্মসমর্পণের শর্ত মেনে নিতে অস্বীকার করায় তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। সেই থেকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম লিবীয়দের কাছে তিনি হয়ে আছেন ‘মরুর সিংহ’—অন্যায়ের বিরুদ্ধে অসম লড়াইয়ের এক প্রতীক।
ধর্মীয় শিক্ষায় বেড়ে ওঠা
ওমর আল-মুখতার ১৮৬২ সালে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের জাওয়িয়াত জানজুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আল-মানফাহ গোত্রের সদস্য ছিলেন। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারান। পবিত্র হজ পালনের উদ্দেশ্যে মক্কায় যাওয়ার পথে তার বাবা মারা যান।
বাবার ইচ্ছা অনুযায়ী ধর্মীয় স্কলার শেখ হুসেইন ঘারিয়ানি তাকে লালন-পালন করেন। তার কাছেই কোরআন শিক্ষা নেন ও পুরো কোরআন মুখস্থ করেন।

পরে তিনি পূর্ব লিবিয়ার আল-জাগবুব মরূদ্যানে যান। সে সময় এটি ছিল সেনুসি ধর্মীয় আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে প্রায় আট বছর ইসলামি জ্ঞান ও ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করেন।
১৮৯৭ সালে সেনুসি আন্দোলনের নেতা আল-মাহদি আল-সেনুসি তাকে জাওয়িয়াত আল-কুসুরের দায়িত্ব দেন। সেখানে ন্যায়বিচার, বিচক্ষণতা ও বিরোধ মীমাংসার দক্ষতার জন্য তিনি মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তখন থেকেই তিনি ‘সিদি ওমর’ নামে পরিচিতি পান। পরে তিনি সুদানেও দায়িত্ব পালন করেন।
ধর্মীয় নেতা থেকে প্রতিরোধযোদ্ধা
একসময় ধর্মীয় পণ্ডিত ওমর আল-মুখতার হয়ে ওঠেন ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে যোদ্ধা। প্রথম দিকে তিনি লিবিয়ার সীমান্ত এলাকায় ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করেন। ১৯০০ সালে দক্ষিণ সুদান ও চাদে ফরাসি ঔপনিবেশিক বাহিনীর বিরুদ্ধেও যুদ্ধে অংশ নেন।
১৯১১ সালে ইতালি উসমানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে লিবিয়ায় আক্রমণ চালালে ওমর আল-মুখতার প্রায় এক হাজার যোদ্ধাকে সংগঠিত করেন। পরে তিনি লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
১৯১২ সালে ইতালি লিবিয়াকে নিজেদের উপনিবেশ ঘোষণা করে। এরপর প্রায় দুই দশক তিনি ইতালীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চালিয়ে যান। মরুভূমির ভৌগোলিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে অতর্কিত হামলা ও দ্রুত সরে যাওয়ার কৌশল ব্যবহার করতেন তার যোদ্ধারা। এতে ইতালীয় বাহিনী বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে।
চশমা দেখে পরিচয়, এরপর গ্রেপ্তার
ওমর আল-মুখতারের পরিচিতির অন্যতম প্রতীক ছিল তার ধাতব ফ্রেমের চশমা। ১৯৩০ সালে একটি বড় সংঘর্ষের পর ইতালীয় বাহিনী তার ঘোড়া ও সেই চশমা খুঁজে পায়। এরপর ইতালীয় সেনা কর্মকর্তা রোদলফো গ্রাজিয়ানি তাকে ধরার ব্যাপারে প্রকাশ্যে আত্মবিশ্বাস দেখান।
১৯৩১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ইতালীয় বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ওমর আল-মুখতারের দুটি ঘোড়া নিহত হয়। পরে যোদ্ধাদের একজন তাকে ‘সিদি ওমর’ বলে সম্বোধন করলে ইতালীয় বাহিনী তার পরিচয় নিশ্চিত করে এবং তাকে আটক করে।
গ্রেপ্তারের তিন দিন পর বেনগাজিতে তার বিচার শুরু হয়। পরদিন তাকে ফাঁসিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
বিচারের সময় ইতালীয় কর্তৃপক্ষ তাকে দেশ ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। শর্ত ছিল, তিনি তার যোদ্ধাদের সশস্ত্র লড়াই বন্ধ করতে বলবেন। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
‘আমরা আত্মসমর্পণ করব না’
ওমর আল-মুখতার তখন বলেন, নামাজে আল্লাহর একত্ব ও মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রাসুল হওয়ার সাক্ষ্য দেওয়া যে আঙুল, তা দিয়ে তিনি মিথ্যার কোনো শব্দ লিখতে পারবেন না। তিনি আত্মসমর্পণ করবেন না এবং বিজয়ী হবেন, অথবা মৃত্যুবরণ করবেন—এমন দৃঢ় অবস্থান জানান।
১৯৩১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর লিবিয়ার সালুক শহরে তাকে হাতকড়া পরিয়ে ফাঁসির মঞ্চে নেওয়া হয়। সেখানে প্রায় ২০ হাজার মানুষ তার মৃত্যুর সাক্ষী হন। মৃত্যুর আগে তিনি শাহাদাত পাঠ করেন।
সিনেমাতেও উঠে এসেছে তার জীবন
ওমর আল-মুখতারের জীবন ও ইতালীয় দখলদারদের বিরুদ্ধে তার লড়াই নিয়ে ১৯৮০ সালে নির্মিত হয় ‘মরুর সিংহ’ নামের চলচ্চিত্র। এতে তার চরিত্রে অভিনয় করেন অ্যান্থনি কুইন।
ওমর আল-মুখতারের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার নিয়ে ইতালিতেও দীর্ঘদিন সংবেদনশীলতা ছিল। চলচ্চিত্রটি ইতালিতে ২০০৯ সাল পর্যন্ত নিষিদ্ধ ছিল।
মৃত্যুর এত বছর পরও লিবিয়ার মানুষের কাছে ওমর আল-মুখতার শুধু একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তি নন; তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ, দৃঢ়তা ও আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে আছেন।
সূত্র: দ্য মিড্যাল ইস্ট মনিটর
আরটিভি/জেএমএ



