ঢাকা মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩

প্রসবের ভয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়েছিলেন, ৩৬ বছর পর পেট থেকে মিলল ‘পাথর শিশু’

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম
দীর্ঘ ৩৬ বছর মায়ের পেটে থাকা মৃত ভ্রূণের কঙ্কাল বা ‘পাথর শিশু’ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বের করেন চিকিৎসকেরা। ছবি: সংগৃহীত

গর্ভধারণের পর সন্তান জন্ম না হলেও বছরের পর বছর পেটের ভেতরে থেকে যেতে পারে মৃত ভ্রূণ—বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানে এমন বিরল ঘটনা রয়েছে। এ ধরনের অবস্থাকে বলা হয় ‘লিথোপেডিয়ন’, সহজ ভাষায় ‘পাথর শিশু’। মায়ের শরীরের ভেতরে মৃত ভ্রূণটি দীর্ঘদিন থেকে গেলে শরীর সেটিকে ক্যালসিয়ামের স্তর দিয়ে ঘিরে ফেলে। ধীরে ধীরে সেটি শক্ত হয়ে পাথরের মতো আকার ধারণ করে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এমনই এক বিরল ঘটনার কথা উঠে এসেছে। ৬০ বছর বয়সী ভারতের নাগপুরের এক নারী ২০১৪ সালে তলপেটে ব্যথা ও একটি শক্ত চাকা নিয়ে হাসপাতালে যান। প্রায় দুই মাস ধরে তার এই সমস্যা চলছিল। চিকিৎসকেরা প্রথমে ধারণা করেছিলেন, এটি হয়তো কোনো টিউমার।

ওই নারীর চিকিৎসা-ইতিহাস খতিয়ে দেখে জানা যায়, ১৯৭৮ সালে তিনি শেষবার গর্ভবতী হয়েছিলেন। তখন চিকিৎসকেরা তাকে জানিয়েছিলেন, তার গর্ভের সন্তান মারা গেছে এবং অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দিয়েছিলেন। অস্ত্রোপচারের ভয় পেয়ে তিনি হাসপাতাল থেকে নিজ গ্রামে ফিরে যান। এরপর আর অস্ত্রোপচার করাননি।

বছরের পর বছর মাঝেমধ্যে পেটে ব্যথা হলেও তিনি স্থানীয় চিকিৎসকের কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে তা সামলে নিতেন। প্রায় ৩৬ বছর পর তলপেটে ব্যথা ও শক্ত চাকা নিয়ে তিনি হাসপাতালে গেলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়।

আরও পড়ুন

পেটের চিত্রায়ন পরীক্ষায় দেখা যায়, জরায়ুর পেছনে প্রায় ১১ বাই ৮ বাই ৮ সেন্টিমিটার আকারের একটি শক্ত পিণ্ড রয়েছে। এর ভেতরে স্পষ্টভাবে কয়েকটি হাড়ের মতো কাঠামো দেখা যায়। চিকিৎসকদের সন্দেহ হয়, এটি মৃত ভ্রূণের অবশিষ্টাংশ হতে পারে। পাশাপাশি পিণ্ডটির চাপে দুই পাশের মূত্রনালিতে সমস্যা তৈরি হয়ে কিডনিতেও প্রস্রাব জমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা যায়।

পরে অস্ত্রোপচার করে পিণ্ডটি বের করা হয়। চিকিৎসকেরা দেখতে পান, একটি আবরণে ঘেরা শক্ত পিণ্ডের ভেতরে ভ্রূণের হাড় রয়েছে। পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করার পর নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি লিথোপেডিয়ন বা দীর্ঘদিন ধরে পেটের ভেতরে থাকা ক্যালসিয়াম জমে শক্ত হয়ে যাওয়া মৃত ভ্রূণ।

কীভাবে তৈরি হয় ‘পাথর শিশু’

লিথোপেডিয়ন সাধারণত জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণের ক্ষেত্রে হতে পারে। বিশেষ করে গর্ভ জরায়ুর বাইরে, পেটের ভেতরে স্থাপিত হলে এবং ভ্রূণটি মারা যাওয়ার পরও শরীর সেটিকে শোষণ করতে না পারলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

মৃত ভ্রূণটি যদি মায়ের শরীরের জন্য খুব বড় হয় এবং সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি করে, তখন শরীর সেটিকে একটি বিদেশি বস্তুর মতো ঘিরে ফেলে। সময়ের সঙ্গে সেখানে ক্যালসিয়াম জমতে থাকে। ফলে ভ্রূণের শরীর ধীরে ধীরে শক্ত ও পাথরের মতো হয়ে যায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে পেটের বাইরে গর্ভধারণের ক্ষেত্রে মৃত ভ্রূণের এমন পরিণতি অত্যন্ত বিরল। একটি প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে এ ধরনের প্রায় ৩৩০টি ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

লিথোপেডিয়নের ক্ষেত্রে কখনো শুধু ভ্রূণের হাড় অবশিষ্ট থাকে, আবার কখনো পুরো ভ্রূণই ক্যালসিয়ামের স্তরে আবৃত হয়ে শক্ত হয়ে যেতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মৃত ভ্রূণের নরম অংশ ধ্বংস হয়ে শুধু কঙ্কালও থেকে যায়।

কয়েক দশক পরেও ধরা পড়তে পারে

লিথোপেডিয়নের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক হলো, এটি অনেক সময় কয়েক দশক পর্যন্ত মায়ের শরীরে থেকে যেতে পারে। অনেক নারী দীর্ঘ সময় কোনো বড় সমস্যা ছাড়াই এটি বহন করেন। পরে পেটে ব্যথা, চাকা বা অন্য কোনো কারণে পরীক্ষা করাতে গিয়ে বিষয়টি ধরা পড়ে।

মরক্কোর জাহরা আবুতালিবের ঘটনাও এ কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহুল আলোচিত। ১৯৫৫ সালে সন্তান প্রসবের সময় জটিলতার মধ্যে পড়ে তিনি হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরে যান। পরে তার প্রসববেদনা বন্ধ হয়ে গেলেও সন্তান জন্ম নেয়নি। বহু বছর পর প্রায় ৪৬ বছর ধরে ভ্রূণটি শরীরে বহন করে ০০১ সালে ৭৫ বছর বয়সে পেটে প্রচন্ড ব্যথা শুরু হলে পরীক্ষায় তার শরীরে দীর্ঘদিন ধরে থাকা মৃত ভ্রূণের সন্ধান পাওয়া যায়। পরে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সেটি বের করা হয়।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত বিরল হলেও ‘পাথর শিশু’ নিয়ে একাধিক ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনা মূলত জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ, চিকিৎসা না পাওয়া এবং দীর্ঘদিন ধরে মৃত ভ্রূণ শরীরে থেকে যাওয়ার বিরল পরিণতি সম্পর্কে ধারণা দেয়।

চিকিৎসকদের জন্যও বিরল অভিজ্ঞতা

চিকিৎসকেরা জানান, পেটের ভেতরে শক্ত কোনো পিণ্ড পাওয়া গেলে সেটিকে সবসময় টিউমার ধরে নেওয়া যায় না। রোগীর পুরোনো গর্ভধারণের ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং চিত্রায়ন পরীক্ষার মাধ্যমে প্রকৃত কারণ শনাক্ত করা সম্ভব।

দীর্ঘদিন ধরে শরীরে থাকা লিথোপেডিয়ন কখনো উপসর্গহীন থাকতে পারে। আবার এর চাপে আশপাশের অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ব্যথা, মূত্রনালিতে বাধা বা কিডনিতে প্রস্রাব জমে যাওয়ার মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘পাথর শিশু’ নামে পরিচিত এই বিরল ঘটনা তাই শুধু বিস্ময়করই নয়, মানবদেহের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধব্যবস্থার একটি অসাধারণ উদাহরণও।

সূত্র: ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশন

আরটিভি/জেএমএ

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
প্রয়াত আত্মাদের স্মরণে আজ ‘অল সোলস ডে’
মৃত্যুর পরও প্রিয়জনের স্মৃতি বেঁচে থাকে হৃদয়ে। তাদের সঙ্গে কাটানো মুহূর্ত, ভালোবাসা ও জীবনের নানা গল্প স্মরণ করেই দিন কাটে স্বজনদের।
প্রয়াত আত্মাদের স্মরণে আজ ‘অল সোলস ডে’
জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস আজ
জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস আগামীকাল। প্রতিবছর ২ নভেম্বর জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস পালিত হয়।
জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস আজ
ইতিহাসে আজকের এই দিনে
সোমবার (২ নভেম্বর) এক নজরে দেখে নেওয়া যাক তেমনই কিছু ঘটনা।
ইতিহাসে আজকের এই দিনে
প্রাণের মাঝে আয়
নস্টালজিয়া খুব খারাপ জিনিস। না চাইতেও এমন সব স্মৃতি মনে পড়ে, যা কখনও আমাদের হাসায়, আবার কখনও বা কাঁদায়। মনে হচ্ছে এইতো সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে পা রাখলাম। প্রথম ক্লাসে অনেকের দেখেছি দাড়ি-গোঁফ ওঠেনি। আবার কেউতো পরিচিতি পর্বে নিজের নাম বলতেও থরথর করে কাঁপছিল। এরপর কতশত দিন একসঙ্গে। কত স্মৃতি বুকের সঞ্চয়ী হিসাবে জমা।
প্রাণের মাঝে আয়
কাজহীন দিবস আজ
সারাদিন কাজের ব্যস্ততা, একের পর এক দায়িত্ব, আর হাতে লম্বা কাজের তালিকা। এই ব্যস্ততার মাঝেই নিজের জন্য একটু সময় বের করার কথা মনে করিয়ে দেয় ‘জিরো টাস্কিং ডে’ বা কাজহীন দিবস। প্রতি বছর নভেম্বর মাসের প্রথম রোববার পালিত হয় দিনটি। এ বছর ১ নভেম্বর এই বিশেষ দিন। দিনটির মূল ভাবনা খুব সহজ- অন্তত একটি দিন নিজের উপর কাজের চাপ না রেখে বিশ্রাম নেওয়া, পছন্দের কাজ করা কিংবা একেবারেই কিছু না করা। বিশেষ করে যেসব দেশে ডে-লাইট সেভিং টাইম বা দিবালোক সাশ্রয়ী সময়ের নিয়ম চালু রয়েছে, সেখানে ঘড়ির কাঁটা এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়ার ফলে পাওয়া অতিরিক্ত সময়টিকে নিজের জন্য কাজে লাগানোর ধারণা থেকেই এই দিনের প্রচলন। ‘জিরো টাস্কিং ডে’-র ধারণাটি সামনে আনেন লেখক ও জীবনযাপনবিষয়ক পরামর্শদাতা ন্যান্সি ক্রিস্টি। তার উদ্দেশ্য ছিল, মানুষ যেন কাজের তালিকা থেকে একের পর এক দায়িত্ব মেটানোর বাইরে নিজের সঙ্গে সময় কাটানোর গুরুত্বও বোঝে। মানসিক সুস্থতার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে মেন্টাল হেলথ আমেরিকাও দিনটির প্রচারে ভূমিকা রেখেছে। বর্তমান সময়ে একসঙ্গে একাধিক কাজ সামলানো যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কাজের চাপ, সময়ের অভাব এবং প্রতিনিয়ত উৎপাদনশীল থাকার তাগিদে অনেকেই বিশ্রাম নিতে অপরাধবোধ করেন। অথচ প্রয়োজনীয় বিরতি মানসিক চাপ কমাতে, সৃজনশীলতা বাড়াতে এবং কাজে মনোযোগ ফেরাতে সাহায্য করতে পারে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম শরীর ও মনকে নতুন করে চাঙা করে। দিনটি পালনের জন্য বিশেষ কোনও আয়োজনের প্রয়োজন নেই। সকালে একটু দেরি করে ঘুম থেকে ওঠা, পছন্দের বই পড়া, নিরিবিলি হাঁটতে বেরোনো কিংবা কিছুক্ষণ ধ্যান করাসহ যা ভালো লাগে, তা-ই করতে পারেন।  চাইলে বারান্দায় বসে আকাশ দেখতে পারেন, মনের মতো কোনও রান্না করতে পারেন, ছবি আঁকতে পারেন অথবা দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নিতে পারেন। এমনকি ফোন ও কাজের বার্তা থেকে দূরে থেকে নিজের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোও হতে পারে উদ্‌যাপনের অংশ। ‘জিরো টাস্কিং ডে’-র আসল শিক্ষা অবশ্য সারাদিন অলসভাবে কাটানো নয়। বরং প্রতিদিনের দায়িত্বের পাশাপাশি বিশ্রাম ও নিজের যত্নের জন্যও সময় রাখা জরুরি সেই কথাই মনে করিয়ে দেয় দিনটি। কারণ, সব সময় কাজের মধ্যে ডুবে থাকাই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হতে পারে না। কখনও কখনও কিছু না করাও নিজের জন্য প্রয়োজনীয়। আরটিভি/এসআর
কাজহীন দিবস আজ
আরও পড়ুন
উদ্বেগজনক নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা, শুধু অক্টোবরেই ধর্ষণের শিকার ৫১
শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় জড়িতের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে: প্রতিমন্ত্রী টুকু
মাঝনদীতে জন্ম নিলো ফুটফুটে কন্যাশিশু
বাড়ির পাশের খালে পড়ে ৩ বছরের শিশুর মৃত্যু