ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

‘ঘুষ.সাইট’ খুলে সরকারি খাতের দুর্নীতির চিত্র ফুটিয়ে তুলছেন দুই তরুণ

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০১:০১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

সরকারি সেবা নিতে গিয়ে কোথায় কত টাকা ঘুষ চাওয়া হচ্ছে, সে তথ্য জানাতে তৈরি হয়েছে ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site)। ২১ আগস্ট চালু হওয়া এই ওয়েবসাইটে নাম-পরিচয় গোপন রেখে ঘুষ চাওয়ার অভিজ্ঞতা জানাতে পারছেন ভুক্তভোগীরা। ওয়েবসাইটে লেখা দপ্তরের নাম বলুন। দাবিকৃত টাকার কথা লিখুন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম-পরিচয় গোপন রাখুন’ এই বার্তা নিয়ে দেশে সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ঘুষ দাবির তথ্য বেনামে সংগ্রহের লক্ষ্যে চালু হয়েছে নতুন ওয়েবসাইট ‘ঘুষসাইট’।

এই প্ল্যাটফর্মে সেবাগ্রহীতারা কোনো অ্যাকাউন্ট খোলা ছাড়াই এবং নাম, ই-মেইল বা ফোন নম্বর না দিয়ে ঘুষ দাবির অভিজ্ঞতা জানাতে পারছেন। বাংলাদেশি দুই তরুণ উদ্যোক্তা সাইফ কবির ও সাহেদ শরীফ ওয়েবসাইটটি তৈরি করেছেন।

ওয়েবসাইটে ব্যবহারকারীরা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, আনুমানিক অবস্থান, দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ এবং ঘুষ দাবি বা লেনদেনের পর কী ঘটেছে এসব তথ্য প্রকাশ করতে পারেন। তবে কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তির নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।

নির্মাতারা বলছেন, এই প্ল্যাটফর্মের উদ্দেশ্য নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করা নয়। বরং সরকারি সেবা খাতে অনানুষ্ঠানিক অর্থ দাবি বা ঘুষের একটি উন্মুক্ত পাবলিক রেকর্ড বা ‘লেজার’ তৈরি করা, যার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়মের ধরন বা প্যাটার্ন উন্মোচন করবে।

ঘুষসাইটের অন্যতম নির্মাতা সাইফ কবির বলেন, বাংলাদেশের প্রত্যেকেই জানে যে ঘুষের অস্তিত্ব আছে। তবে যে তথ্যটি কারও কাছে নেই, তা হলো এর সুনির্দিষ্ট অঙ্ক বা হিসাব।

তিনি বলেন, সরকারি কোনো সেবা নিতে গিয়ে একজন মানুষ হয়তো জানতে পারেন পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স বা নামজারির জন্য কত টাকা ‘খরচ’ দিতে হবে। কিন্তু সেই ব্যক্তি বুঝতে পারেন না, দাবিকৃত টাকাটা (ঘুষের) স্বাভাবিক হার নাকি তার দ্বিগুণ। এই তথ্যের ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যেই আমরা উন্মুক্ত লেজার তৈরির উদ্যোগ নিয়েছি।

সাইফের ভাষ্য, পর্যাপ্তসংখ্যক মানুষ তাদের কাছে দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ জানালে পরবর্তীতে একই দপ্তরে সেবা নিতে যাওয়া অন্যরা আগে থেকেই সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাবেন।

ভারতের ‘bribes.fyi’ নামের একটি ওয়েবসাইট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এ উদ্যোগের চিন্তা আসে বলে জানান তিনি। তিনি ওয়েবসাইটটি দেখে তার বন্ধু ও সহ-নির্মাতা সাহেদ শরীফকে পাঠালে— তারা দুজন মিলে মাত্র একদিনের মধ্যে এর বাংলাদেশি সংস্করণটি তৈরি করে ফেলেন।

সাইটে জমা পড়া প্রাথমিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২৩ আগস্ট পর্যন্ত দেশের ৮টি বিভাগে জমা হওয়া ৪৫৮টি রিপোর্টে প্রায় ২.৪৫ কোটি টাকা ঘুষ দাবির তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৫৪টি রিপোর্ট ঢাকা বিভাগ থেকে, চট্টগ্রামে ৯৮টি, সিলেটে ২৪টি, রাজশাহী ও খুলনায় ২২টি করে, ময়মনসিংহে ১৬টি, রংপুরে ১৫টি এবং সর্বনিম্ন ৭টি রিপোর্ট জমা পড়েছে বরিশাল বিভাগ থেকে।

তবে এসব পরিসংখ্যান সম্পূর্ণভাবে ওয়েবসাইটটিতে ব্যবহারকারীদের নিজেদের দেওয়া ও অযাচাইকৃত (আনভেরিফাইড) তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তাই গড় পরিমাণকে একজন সাধারণ সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে চাওয়া টাকার (ঘুষের) স্বাভাবিক চিত্র হিসেবে বিবেচনা না করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন সাইফ।

সাইটে প্রকাশিত গড় ঘুষের দাবি ৩৩,৭৪৭ টাকা হলেও— জমি, কাস্টমস ও কর সংক্রান্ত এমন কয়েকটি বড় ঘটনার কারণে এই গড় কিছুটা বেড়েছিল, যেখানে দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল লাখ লাখ টাকা।

সাইফ বলেন, যেসব তথ্য এসেছে, যার মধ্যে বড় অঙ্কের দাবিগুলোও অন্তর্ভুক্ত, সেগুলো সবই ব্যবহারকারীদের নিজস্ব রিপোর্ট এবং অযাচাইকৃত।

আরও পড়ুন

কীভাবে কাজ করে
ওয়েবসাইটে অভিযোগ জানাতে ব্যবহারকারীকে দপ্তরের নাম, সেবার ধরন, এলাকা, ঘুষ হিসেবে দাবি করা অর্থের পরিমাণ এবং শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল—এই পাঁচ ধরনের তথ্য দিতে হয়। সঙ্গে ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। অভিযোগ জানাতে কোনো অ্যাকাউন্ট খোলার প্রয়োজন হয় না। পুরো প্রক্রিয়া দুই মিনিটেরও কম সময়ে শেষ করা যায়। তবে কোনো ব্যক্তির নাম, পদবি বা ফোন নম্বর উল্লেখ করা যায় না।

উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, এখানে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে চিহ্নিত করার চেয়ে কোন দপ্তর বা সরকারি সেবা ঘিরে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ বেশি আসছে, সেটি তুলে ধরাই মূল উদ্দেশ্য।

অভিযোগ জমা দেওয়ার পর সেটি সরাসরি ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয় না। প্রথমে মডারেশনের মাধ্যমে ব্যক্তিগত তথ্য সরানো হয়। আক্রমণাত্মক, অস্পষ্ট বা নীতিমালা ভঙ্গ করে—এমন অভিযোগও বাদ দেওয়া হয়। এরপর অভিযোগটি প্রকাশ করা হয়। সেখানে বিভাগ, দপ্তর, সেবার ধরন, চাওয়া অর্থের পরিমাণ ও ঘটনার ফলাফল অনুযায়ী তথ্য দেখা যায়।

এসব রিপোর্টে কী উঠে আসতে পারে?

সাইফের মতে, প্ল্যাটফর্মটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিচ্ছিন্ন অভিযোগের পরিবর্তে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়মের একটি ধারাবাহিক চিত্র বা প্যাটার্ন তুলে ধরা।

তিনি বলেন, কেউ যদি বলেন একটি লাইসেন্সের জন্য তার ১০ হাজার টাকা লেগেছে, তবে তা একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কিন্তু একই অফিসের ক্ষেত্রে ৪০ জন ব্যক্তি যখন কাছাকাছি অঙ্কের টাকার কথা জানান, তখন তা একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে রূপ নেয়।

আর এমন নিয়মিত চিত্র বা প্যাটার্নকে অস্বীকার করা কঠিন, বলেন তিনি।

তিনি এসব তথ্যের তিনটি সম্ভাব্য ব্যবহারের কথা তুলে ধরেন: প্রথমত, কোনো দপ্তরে যাওয়ার আগে সাধারণ মানুষ কী ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারেন তা বোঝা; দ্বিতীয়ত, সাংবাদিক, গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রাথমিক তথ্যের উৎস তৈরি করা; এবং তৃতীয়ত, যেসব অভিজ্ঞতা এ ধরনের সাইট না থাকলে আড়ালেই থেকে যেত, সেগুলোকে নথিবদ্ধ করতে মানুষকে উৎসাহিত করা।

অধিকাংশ মানুষ ঘুষ দিয়ে তা আর কাউকে বলেন না। বেনামে হলেও এটি প্রকাশ্যে লিখে রাখার মাধ্যমে সেই নীরবতা ভাঙে, বলেন সাইফ।

প্ল্যাটফর্মে জমা পড়া রিপোর্ট বিভাগ, দপ্তর, অর্থের পরিমাণ ও ফলাফলের ভিত্তিতে খোঁজা যায়।

উদাহরণ হিসেবে সাইটে প্রকাশিত একটি অযাচাইকৃত রিপোর্টে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষে (বিআরটিএ) ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ১৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। ওই ব্যবহারকারী লেখেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত অনানুষ্ঠানিক পথ ধরলাম, ততক্ষণ প্রতিবারই আমাকে ফেইল করানো হচ্ছিল।

আরেকটি অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মহাখালী অঞ্চলে জন্মনিবন্ধনের জন্য ১০,০০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। ব্যবহারকারীর দাবি, শুরুতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সেবা দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানালেও পরবর্তীতে ঘুষ দাবি করেন।

তবে এসব অভিযোগের কোনোটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি বলে আবারও সতর্ক করেছেন নির্মাতারা। সাইফ কবির বলেন, প্রতিবেদনে তথ্যগুলো অযাচাইকৃত—এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, আমি শুধু অনুরোধ করব যে প্রতিবেদনে যেন এটি স্পষ্ট থাকে যে তথ্যগুলো যাচাইকৃত নয়। এতে আমাদের সুরক্ষা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি তথ্য প্রদানকারী ব্যক্তিরাও সুরক্ষিত থাকবেন।

ওয়েবসাইটটি নির্মাতাদের নিজস্ব অর্থায়নে এবং আংশিকভাবে ইচ্ছুক ব্যবহারকারীদের অনুদানে পরিচালিত হচ্ছে। তবে কোনো রিপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য কোনো ফি বা অনুদান প্রয়োজন হয় না।

নির্মাতারা জানিয়েছেন, সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের বিকল্প হিসেবে এই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়নি। নতাদের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে জমা পড়া রিপোর্টের সংখ্যা যত বাড়বে, এই পাবলিক লেজারের মাধ্যমে দেশের সরকারি সেবাখাতগুলোতে অনানুষ্ঠানিক অর্থ দাবি বা ঘুষের প্রকৃত চিত্রও ততোটাই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে।

সূত্র- টিবিএস

আরটিভি/এমএ

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
পানির বাইরে ডাঙায়ও বেঁচে থাকে যেসব মাছ
সাধারণত মাছের বেঁচে থাকার জন্য পানি অপরিহার্য। তবে প্রকৃতিতে এমন কিছু মাছ রয়েছে, যারা পানির বাইরে ডাঙায় উঠে চলাফেরা করতে পারে
পানির বাইরে ডাঙায়ও বেঁচে থাকে যেসব মাছ
ট্রাকের পেছনে কেন লেখা থাকে ‘হর্ন ওকে প্লিজ’
সড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহনের পেছনে নানা ধরনের স্লোগান, উপদেশ ও মজার কথা লেখা দেখা যায়। কোথাও লেখা থাকে ‘মায়ের দোয়া’, কোথাও ‘ধাক্কা দিবেন না, আমি ছোট আমাকে মারবেন না’।
ট্রাকের পেছনে কেন লেখা থাকে ‘হর্ন ওকে প্লিজ’
অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে বিরল হ্যামারহেড হাঙরের দল, ড্রোনে মিলল নতুন তথ্য
অস্ট্রেলিয়ার পূর্ব উপকূলের জনপ্রিয় সৈকতগুলোর অগভীর পানিতে একসঙ্গে দেখা মিলেছে ডজন ডজন বিরল স্ক্যালপড হ্যামারহেড হাঙরের।
অস্ট্রেলিয়ার উপকূলে বিরল হ্যামারহেড হাঙরের দল, ড্রোনে মিলল নতুন তথ্য
আজকের দিনটি ব্যর্থদের জন্য
সব সময়তো শুনেছেন বা পত্রিকায় লেখা পড়েছেন ‘সফলতাকে উৎযাপন’ করার কথা।
আজকের দিনটি ব্যর্থদের জন্য
সমকামী পুরুষদের মধ্যে এইচআইভির ঝুঁকি বেশি কেন?
পায়ুপথে যৌনসম্পর্কের জৈবিক ঝুঁকি, কনডমের অনিয়মিত ব্যবহার ও সামাজিক বৈষম্য অন্যতম কারণ; প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে এইচআইভি বা হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। সময়মতো চিকিৎসা না নিলে সংক্রমণ গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছে এইডস হতে পারে। তবে আধুনিক চিকিৎসায় এইচআইভি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। নিয়মিত চিকিৎসা নিয়ে সংক্রমিত ব্যক্তিরাও দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পুরুষের সঙ্গে যৌনসম্পর্ক স্থাপনকারী পুরুষদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি। এর পেছনে রয়েছে কিছু জৈবিক কারণের পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্য, যৌনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতার অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবা পেতে নানা বাধা। তবে সমকামী হওয়া মানেই এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নিশ্চিতভাবে বেশি, এমন নয়। যৌন অভিমুখিতা নিজে সংক্রমণ ঘটায় না। বরং যৌনসম্পর্কের ধরন, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, সঙ্গীর এইচআইভি সংক্রমণের অবস্থা এবং চিকিৎসা গ্রহণের মতো বিষয়গুলো ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। পায়ুপথে যৌনসম্পর্কে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি সমকামী পুরুষদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ পায়ুপথে যৌনসম্পর্ক। পায়ুপথের ভেতরের আবরণ সংবেদনশীল হওয়ায় যৌনসম্পর্কের সময় সেখানে ক্ষুদ্র ক্ষত তৈরি হতে পারে। এর ফলে সংক্রমিত সঙ্গীর বীর্য বা মলদ্বারের তরলের মাধ্যমে ভাইরাস শরীরে প্রবেশের সুযোগ পায়। বিশেষ করে পায়ুপথে প্রবেশকারী যৌনাঙ্গ গ্রহণকারী সঙ্গীর সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। তবে অন্য সঙ্গীরও সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পায়ুপথে যৌনসম্পর্ক শুধু সমকামী পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; নারী-পুরুষের মধ্যেও এমন যৌনসম্পর্ক হতে পারে। সঙ্গীর সংক্রমণ সম্পর্কে অজ্ঞতা কোনো ব্যক্তির চেহারা বা শারীরিক অবস্থা দেখে তিনি এইচআইভিতে আক্রান্ত কি না, তা বোঝার উপায় নেই। অনেকের ক্ষেত্রে সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো লক্ষণও দেখা যায় না। ফলে পরীক্ষা না করালে একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন নিজের সংক্রমণ সম্পর্কে জানতে নাও পারেন। যে জনগোষ্ঠীতে এইচআইভির বিস্তার তুলনামূলক বেশি, সেখানে সংক্রমিত সঙ্গীর সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনাও বাড়তে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ওই জনগোষ্ঠীর প্রত্যেক সদস্যের সংক্রমণের ঝুঁকি সমান। নিয়মিত এইচআইভি পরীক্ষা, সঙ্গীর সঙ্গে যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। কনডম ব্যবহার না করা যৌনসম্পর্কের সময় কনডম ব্যবহার না করলে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে পায়ুপথে যৌনসম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিবার সঠিকভাবে কনডম ব্যবহার করা জরুরি। প্রতিবার নতুন কনডম ব্যবহার করতে হবে। পাশাপাশি কনডমের মেয়াদ ও প্যাকেটের অখণ্ডতা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কনডম ছিঁড়ে গেলে বা সরে গিয়ে সম্ভাব্য সংক্রমণের আশঙ্কা তৈরি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কনডম এইচআইভি ও অন্যান্য যৌনবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। তবে ঝুঁকি আরও কমাতে পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্যান্য প্রতিরোধব্যবস্থাও গ্রহণ করা যেতে পারে। একাধিক যৌনসঙ্গী ও অন্যান্য যৌনবাহিত সংক্রমণ একাধিক যৌনসঙ্গী থাকলেই এইচআইভি সংক্রমণ হবে, এমন নয়। তবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ছাড়া একাধিক সঙ্গীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক হলে সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। এ ছাড়া সিফিলিস, গনোরিয়া, ক্ল্যামাইডিয়া ও হারপিসের মতো যৌনবাহিত সংক্রমণ যৌনাঙ্গ বা আশপাশের টিস্যুতে প্রদাহ ও ক্ষত তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ক্ষত বা প্রদাহের কারণে কিছু পরিস্থিতিতে এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই যৌনস্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন থাকা, প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করানো এবং সংক্রমণ শনাক্ত হলে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। সামাজিক বৈষম্যও বাড়াতে পারে ঝুঁকি এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকির পেছনে সামাজিক কারণও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক দেশে সমকামী ও উভকামী পুরুষেরা যৌন অভিমুখিতার কারণে বৈষম্য, অপমান ও হয়রানির শিকার হওয়ার আশঙ্কা করেন। এ কারণে কেউ কেউ চিকিৎসকের সঙ্গে যৌনস্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে চান না। কেউ এইচআইভি পরীক্ষা করাতে দেরি করেন, আবার কেউ সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পরও চিকিৎসা শুরু করা বা নিয়মিত চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়েন। ফলে সংক্রমণ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে দেরি হতে পারে। তাই গোপনীয়তা রক্ষা করে বৈষম্যহীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এইচআইভি প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এইচআইভি প্রতিরোধে কী করবেন? এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে। কনডম ব্যবহার: প্রতিবার যৌনসম্পর্কে সঠিকভাবে কনডম ব্যবহার করলে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে। নিয়মিত পরীক্ষা: যৌনসম্পর্কের ধরন ও সম্ভাব্য ঝুঁকি অনুযায়ী এইচআইভি পরীক্ষা করানো উচিত। সম্ভাব্য সংক্রমণের পরপরই পরীক্ষা করলে সব ক্ষেত্রে সংক্রমণ শনাক্ত নাও হতে পারে। তাই পরীক্ষার উপযুক্ত সময় সম্পর্কে স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিতে হবে। PrEP গ্রহণ: প্রি-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস বা PrEP হলো এইচআইভি সংক্রমণের আগে ঝুঁকি কমানোর জন্য ব্যবহৃত ওষুধ। এইচআইভি নেই, এমন ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিরা চিকিৎসকের পরামর্শে এটি গ্রহণ করতে পারেন। PEP গ্রহণ: সম্ভাব্য সংক্রমণের ঝুঁকিপূর্ণ সংস্পর্শের পর পোস্ট-এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস বা PEP প্রয়োজন হতে পারে। এটি যত দ্রুত সম্ভব শুরু করতে হয়, সাধারণত ৭২ ঘণ্টার মধ্যে। চিকিৎসকের পরামর্শে নির্ধারিত কোর্স সম্পন্ন করা জরুরি। নিয়মিত চিকিৎসা: এইচআইভি শনাক্ত হলে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি বা ART নিয়মিত গ্রহণের মাধ্যমে ভাইরাসের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। চিকিৎসায় ভাইরাসের মাত্রা ধারাবাহিকভাবে শনাক্তকরণের সীমার নিচে থাকলে যৌনসম্পর্কের মাধ্যমে এইচআইভি ছড়ায় না। এটি ‘আনডিটেক্টেবল ইকুয়ালস আনট্রান্সমিটেবল’ বা U=U নামে পরিচিত। সাধারণ স্পর্শে কি এইচআইভি ছড়ায়? না। হাত মেলানো, আলিঙ্গন করা, একই টেবিলে খাওয়া, একই টয়লেট ব্যবহার করা কিংবা পাশাপাশি বসার মাধ্যমে এইচআইভি ছড়ায় না। সাধারণ চুম্বন, লালা, ঘাম বা মশার কামড়ের মাধ্যমেও ভাইরাসটি ছড়ায় না। সাধারণত সংক্রমিত রক্ত, বীর্য, মলদ্বারের তরল, যোনির তরল ও বুকের দুধের মাধ্যমে এইচআইভি ছড়াতে পারে। তবে সংক্রমণের ঝুঁকি নির্ভর করে এসব তরলের সংস্পর্শের ধরন ও পরিস্থিতির ওপর। তাই এইচআইভিতে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ না করে তাঁর চিকিৎসা, গোপনীয়তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি। সচেতনতাই প্রতিরোধের অন্যতম উপায় সমকামী পুরুষদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির পেছনে পায়ুপথে যৌনসম্পর্কের জৈবিক ঝুঁকি, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ঘাটতি, সংক্রমণ সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো একাধিক কারণ কাজ করতে পারে। তবে যৌন অভিমুখিতা দিয়ে কারও সংক্রমণের অবস্থা নির্ধারণ করা যায় না। নিয়মিত পরীক্ষা, কনডম ব্যবহার, প্রয়োজন অনুযায়ী PrEP বা PEP গ্রহণ এবং সংক্রমণ শনাক্ত হলে নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে এইচআইভির ঝুঁকি কমানো ও ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। সূত্র: ভেরি ওয়েল হেল্থ আরটিভি/এসকে
সমকামী পুরুষদের মধ্যে এইচআইভির ঝুঁকি বেশি কেন?
আরও পড়ুন
নজরুল কলেজে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত
স্কুলে ভর্তিতে বয়স নির্ধারণ, কোন শ্রেণিতে কত বছর হতে হবে
নজরুল কলেজে ‘শরৎ উৎসব ও নবীনবরণ’ অনুষ্ঠিত
সরকারি চাকরিতে থেকে এনসিপির কমিটিতে পদ, সেই কর্মকর্তাকে শোকজ