
ডেটে যাওয়ার আগে পরিচ্ছন্ন পোশাক, গোসল এবং সুগন্ধি এতদিন এটাই ছিল প্রচলিত প্রস্তুতি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নতুন এক প্রবণতা যেন সেই ধারণাকেই উল্টে দিয়েছে। নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফেরোমোন ম্যাক্সিং’। এই প্রবণতার অনুসারীদের দাবি, সুগন্ধি নয়, শরীরের স্বাভাবিক ঘামের গন্ধই নাকি বাড়াতে পারে যৌন আকর্ষণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কিছু পুরুষের মধ্যে এই প্রবণতা নিয়ে আলোচনা দেখা যাচ্ছে। ‘ফেরোমোন ম্যাক্সিং’-এর ধারণা অনুযায়ী, ডেটে যাওয়ার আগে গোসল না করা, সুগন্ধি ব্যবহার না করা কিংবা ঘামে ভেজা পোশাক পরার মতো পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে। এমনকি কিছু নেটপ্রভাবী আরও অদ্ভুত কিছু দাবি করেছেন নিজের প্রস্রাব পান করলেও নাকি ফেরোমোন বাড়তে পারে।
তবে এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
ফেরোমোন কী?
ফেরোমোন হলো এমন এক ধরনের রাসায়নিক সংকেত, যা প্রাণীরা নিজেদের শরীর থেকে পরিবেশে ছড়িয়ে দেয় এবং একই প্রজাতির অন্য প্রাণীর আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। পিঁপড়ার চলাচলের পথ নির্ধারণ কিংবা কিছু পতঙ্গের সঙ্গী খোঁজার ক্ষেত্রে এ ধরনের রাসায়নিক সংকেতের ভূমিকা রয়েছে।
তবে মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি এতটা সরল নয়। বিজ্ঞানীরা এখনো এমন কোনো নির্দিষ্ট রাসায়নিক যৌগ শনাক্ত করতে পারেননি, যাকে নিশ্চিতভাবে মানুষের ‘যৌন ফেরোমোন’ বলা যায়। মানুষের শরীর থেকে এমন কোনো পদার্থ নিঃসৃত হয়, যা অন্য মানুষকে নিশ্চিতভাবে যৌনভাবে আকৃষ্ট করে—এমন চূড়ান্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণও নেই।
কোথা থেকে এল এই ধারণা?
‘ফেরোমোন ম্যাক্সিং’-এর আলোচনায় প্রায়ই ১৯৯৫ সালের একটি গবেষণার কথা উল্লেখ করা হয়। ওই গবেষণায় কয়েকজন পুরুষের ঘামে ভেজা টি-শার্ট নারীদের শোঁকানো হয়েছিল। সেখানে কিছু নির্দিষ্ট পুরুষের শরীরের গন্ধ নারীদের তুলনামূলক বেশি পছন্দ হওয়ার বিষয়টি উঠে আসে। গবেষণায় জিনগত পার্থক্যের সম্ভাব্য ভূমিকার কথাও আলোচিত হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে আরও গবেষণা হয়েছে। ২০২০ সালের একটি গবেষণাসহ পরবর্তী গবেষণাগুলো মানুষের আকর্ষণকে কেবল শরীরের গন্ধ বা নির্দিষ্ট কোনো ‘ফেরোমোন’-এর মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
শরীরের গন্ধ কি আকর্ষণে ভূমিকা রাখে?
শরীরের স্বাভাবিক গন্ধ মানুষের পছন্দ-অপছন্দে কিছুটা ভূমিকা রাখতে পারে। পরিচিত কারও শরীরের গন্ধ ভালো লাগতে পারে, আবার কোনো গন্ধ অপছন্দও হতে পারে। গন্ধের সঙ্গে স্মৃতি ও আবেগের সম্পর্কও রয়েছে।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, গোসল না করা বা দীর্ঘ সময় অপরিচ্ছন্ন থাকার মাধ্যমে যৌন আকর্ষণ বাড়ানো সম্ভব। বরং ঘাম, মৃত ত্বক, ময়লা ও জীবাণু জমে শরীরে দুর্গন্ধ তৈরি হতে পারে। প্রথম সাক্ষাতে তা আকর্ষণের বদলে বিরক্তি বা অস্বস্তির কারণও হতে পারে।
আর নিজের প্রস্রাব পান করার মতো পরামর্শের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং প্রস্রাব শরীরের বর্জ্য পদার্থ ও অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়ার একটি উপায়। এটিকে যৌন আকর্ষণ বাড়ানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহার করার পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের প্রেম বা আকর্ষণ কোনো একটি রাসায়নিক সূত্রে নির্ধারিত হয় না। ব্যক্তিত্ব, আত্মবিশ্বাস, অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক যোগাযোগ, আচরণ, রসবোধ ও মানসিক সংযোগ সবকিছুই এতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই ফেরোমোন ম্যাক্সিং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যতই আলোচিত হোক, ডেটে যাওয়ার আগে ইচ্ছাকৃতভাবে গোসল না করা বা অপরিচ্ছন্ন থাকার পক্ষে বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। নিজের স্বাভাবিক গন্ধ থাকা স্বাভাবিক তবে পরিচ্ছন্নতা ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
আরটিভি/এসকে




