
প্রায় ১৬ কোটি বছর আগের সামুদ্রিক সরীসৃপের উগরে দেওয়া অপাচ্য খাদ্যাবশেষের জীবাশ্ম আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। নরওয়ের ট্রোল তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের গভীর কূপ থেকে তোলা পাথরের নমুনা পরীক্ষা করতে গিয়ে এই বিরল নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া যায়। গবেষকদের ধারণা, এসব জীবাশ্ম লম্বা গলার প্লেসিওসর গোত্রের সামুদ্রিক সরীসৃপের বমির অবশিষ্টাংশ।
ভূতাত্ত্বিক সাময়িকী জিওলজিক্যাল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত এক গবেষণায় এ তথ্য জানানো হয়েছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন নরওয়ের জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ইকুইনরের ভূতাত্ত্বিক ডির্ক নাউস্ট।
গবেষণায় দেখা যায়, জীবাশ্মে ভাঙা ও অক্ষত ঝিনুকের খোলস, সামুদ্রিক কৃমি এবং উদ্ভিদের টুকরো একসঙ্গে জমাট বেঁধে রয়েছে। প্রায় ১৫ থেকে ১৬ কোটি বছর আগের ভূতাত্ত্বিক স্তর থেকে পাওয়া এসব নমুনা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা ধারণা করেন, এগুলো স্রোত বা ঢেউয়ের মাধ্যমে জমে থাকা পলি নয়; বরং কোনো সামুদ্রিক প্রাণীর উগরে দেওয়া অপাচ্য খাবার।
গবেষক নাউস্ট ২০ থেকে ৩০টি এমন স্তূপ পরীক্ষা করেন। উচ্চ রেজল্যুশনের স্ক্যান ও কূপের ছবি বিশ্লেষণ করে তিনি দেখেন, উপাদানগুলো অনিয়মিতভাবে একসঙ্গে আটকে আছে। এগুলোর গঠন ও আংশিক পরিপাকের চিহ্ন থেকে গবেষকেরা এগুলোকে বমির জীবাশ্ম হিসেবে শনাক্ত করেন।
নিদর্শনগুলো পাওয়া গেছে প্রাচীন এক নদীবিধৌত ব-দ্বীপের সামনের অংশে, যেখানে মিঠাপানি ও সমুদ্রের লবণাক্ত পানি মিলিত হতো। কিন্তু স্তূপের মধ্যে থাকা কিছু সামুদ্রিক প্রাণী কেবল স্থিতিশীল লবণাক্ত পানিতে বসবাস করত। এ কারণে গবেষকদের ধারণা, অন্য কোনো প্রাণী সেগুলো খেয়ে ব-দ্বীপ এলাকায় এসে অপাচ্য অংশ উগরে দিয়েছিল।
প্রাথমিকভাবে হাঙরের প্রাচীন কোনো গোত্র, মাছ ও সামুদ্রিক সরীসৃপকে সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরে গবেষকেরা ক্রিপ্টোক্লিডিডি পরিবারের প্লেসিওসরদের ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। লম্বা গলা, ছোট মাথা ও সরু দাঁতবিশিষ্ট এসব সামুদ্রিক সরীসৃপ সমুদ্রতলের কাদা থেকে ঝিনুক, কৃমি, ক্রাস্টেশিয়ান ও সামুদ্রিক লিলির মতো প্রাণী খেত। জীবাশ্মে পাওয়া উপাদানের সঙ্গে তাদের খাদ্যাভ্যাসের মিল রয়েছে।
তবে স্তূপগুলো শনাক্ত করা সহজ ছিল না। এগুলো জীবাশ্মীভূত মল, ঝড়ের কারণে জমে থাকা খোলস কিংবা গর্তে আটকে থাকা উপাদানও হতে পারত। খোলসের অনিয়মিত মিশ্রণ, জমাট গঠন ও আংশিক পরিপাকের চিহ্ন বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বমির ব্যাখ্যাটিকেই বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন।
সমুদ্রের তলদেশে বসবাসকারী প্রাণী, স্রোত ও ঢেউয়ের কারণে অনেক স্তূপ আশপাশের পলির সঙ্গে মিশে গেছে। তবে কিছু স্তূপ দ্রুত পলির নিচে চাপা পড়ায় এবং পরবর্তী সময়ে খনিজ জমে শক্ত হয়ে যাওয়ায় জীবাশ্ম হিসেবে টিকে ছিল।
গবেষকেরা এসব নিদর্শনকে ‘ভোমিটাস’ নামে একটি স্বতন্ত্র ট্রেস জীবাশ্মের শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ট্রেস জীবাশ্ম বলতে প্রাণীর দেহাবশেষের পরিবর্তে তার আচরণ বা কার্যকলাপের প্রমাণ বহনকারী নিদর্শনকে বোঝায়।
এই আবিষ্কার জুরাসিক যুগের সামুদ্রিক সরীসৃপের খাদ্যাভ্যাস এবং তাদের বসবাসের পরিবেশ সম্পর্কে নতুন তথ্য দিচ্ছে। পাশাপাশি এটি দেখাচ্ছে, তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য সংগ্রহ করা পাথরের নমুনাও প্রাচীন পৃথিবীর জীবজগত ও পরিবেশের ইতিহাস উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আরটিভি/এসকে


