
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের বদলে ছোট পরিসরে অনুষ্ঠান করছেন দম্পতিরা। অতিথির সংখ্যা কমানো, সংবর্ধনা পিছিয়ে দেওয়া ও সঞ্চয় ধরে রাখার প্রবণতায় চাপে পড়েছে বিয়েকেন্দ্রিক ব্যবসা।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিয়ের আয়োজনের ধরনে পরিবর্তন আসছে। আগে যেখানে শত শত কিংবা হাজারো অতিথি নিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের প্রচলন ছিল, সেখানে এখন ছোট পরিসরে বিয়ে সারছেন অনেক দম্পতি। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি ও আর্থিক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের বদলে যাওয়া দৃষ্টিভঙ্গিও এ প্রবণতার পেছনে ভূমিকা রাখছে।
জাপানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ার পেতালিং জায়ায় গত মাসে বিয়ে করেন ২৬ বছর বয়সী আম্মার হাজিক জুলকিফলি। মূল্যস্ফীতির কারণে খাবার সরবরাহের খরচ বেড়ে যাওয়ায় তিনি অতিথির তালিকা ছোট করেন। একই সঙ্গে অর্থ সাশ্রয়ের জন্য বিয়ের মূল আনুষ্ঠানিকতার পর সংবর্ধনা অনুষ্ঠান পিছিয়ে দেন।
আম্মারের ভাষ্য, বিয়ের মোট ব্যয় বৃদ্ধির অর্ধেকেরও বেশি এসেছে খাবারের খরচ থেকে। ফলে অতিথির সংখ্যা কমিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হয়েছে।
শুধু বিয়ের আয়োজন ছোট হওয়া নয়, কয়েকটি দেশে বিয়ের সংখ্যাও কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ায় ২০২৫ সালে বিয়ের সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ ৮০ হাজার। ১১ বছর আগে এ সংখ্যা ছিল ২১ লাখ।
ফিলিপাইনের পরিসংখ্যান সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে দেশটিতে নিবন্ধিত বিয়ের সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৫ শতাংশ কমেছে। গত মার্চে এই সংখ্যা কমেছে ৮৩ শতাংশ। তবে এ পতনের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত নয়।
অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে দেরিতে বিয়ে করা, অতিথির সংখ্যা সীমিত রাখা এবং নিজেদের সঞ্চয় অক্ষুণ্ন রাখার প্রবণতাও বিয়ের আয়োজনের ধরন বদলে দিচ্ছে।
থাইল্যান্ডের ক্রুংথাই কার্ড ও বিয়েবিষয়ক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সাবুইওয়েডিংয়ের এক গবেষণায় এ বছর ১৫ থেকে ৫০ জন অতিথি নিয়ে ছোট পরিসরে বিয়ের আয়োজনের প্রবণতার কথা উঠে এসেছে।
সিঙ্গাপুরের বিয়ের পোশাক প্রতিষ্ঠান দ্য অরোরা ওয়েডিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা জাস্টিন এনজি জানান, সেখানকার দম্পতিরা এখন জাঁকজমকের চেয়ে অতিথিদের স্বাচ্ছন্দ্য ও অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তার বাসিন্দা ২৮ বছর বয়সী আনাসা রিজকি কামালিনা গত ফেব্রুয়ারিতে স্থানীয় ধর্মীয় কার্যালয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। পরে বাড়ির উঠানে ছবি তুলে দিনটি স্মরণীয় করে রাখেন। তার বড় ভাইয়ের বিয়েতে ২০২০ সালে দুই হাজার অতিথি উপস্থিত থাকলেও তিনি বেছে নিয়েছেন ছোট পরিসরের আয়োজন।
বছরের শেষ দিকে ৩০০ আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুকে নিয়ে অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা রয়েছে আনাসা ও তার সঙ্গীর। এ জন্য তাদের বাজেট ১০ কোটি ইন্দোনেশীয় রুপিয়া, যা প্রায় ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকার সমান।
আনাসা বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তারা আইনগত ও ধর্মীয়ভাবে বিবাহিত। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ঋণ নিয়ে কিংবা সঞ্চয় শেষ করে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করাকে তিনি বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেন না।
দম্পতিদের ব্যয় সংকোচনের প্রভাব পড়ছে বিয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসায়। ক্যাটারিং, ফটোগ্রাফি, পোশাক ভাড়া ও ইভেন্ট ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলো আগের তুলনায় ছোট বাজেটের আয়োজন পাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে কিছু প্রতিষ্ঠান বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের বদলে করপোরেট অনুষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছে।
অন্যদিকে, ব্যয় সামলাতে বিকল্প পথও বেছে নিচ্ছেন অনেকে। ফিলিপাইনের এক দম্পতি আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সহযোগিতায় বিয়ের খরচ মেটাচ্ছেন। তাদের কেউ খাবারের ব্যয় বহন করছেন, আবার কেউ ফটোগ্রাফিতে ছাড় দিচ্ছেন। থাইল্যান্ডে অনেক দম্পতি ব্যয়বহুল শুভদিন এড়িয়ে তুলনামূলক সাশ্রয়ী তারিখে বিয়ে করছেন।
স্থানীয় বাজারে চাপ থাকলেও পর্যটননির্ভর বিয়ের আয়োজনের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। বিদেশি ধনাঢ্য দম্পতি ও পরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করে আয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম।
ভিয়েতনামের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ভিএনএর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির কুয়াংনিন প্রদেশে বছরের প্রথম চার মাসে ছয়টি ভারতীয় ধনাঢ্য পরিবারের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছে। এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন চলে কয়েক দিন ধরে এবং প্রতিটির বাজেট ছিল কয়েক মিলিয়ন ডলার।
সব মিলিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিয়ের আয়োজনের ধরন বদলাচ্ছে। একদিকে সাধারণ দম্পতিরা ব্যয় কমিয়ে আর্থিক নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, অন্যদিকে বিয়েকেন্দ্রিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন বাজার ও আয়ের পথ খুঁজছে। ফলে বিয়ের জাঁকজমক কমলেও এ শিল্পের ব্যবসায়িক কাঠামোতে পরিবর্তন আসছে।
আরটিভি/এসকে

