
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, ঋণ নেওয়া কিংবা ফেসবুকের মনিটাইজেশন সুবিধা চালু করতে অনেকেই ই-টিন সার্টিফিকেট করেছেন। তবে পরবর্তী সময়ে আয় বন্ধ হয়ে গেলেও কিংবা করযোগ্য আয় না থাকলেও টিন সার্টিফিকেটের কারণে আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে যেতে পারে। ফলে অনেকের কাছেই এখন এই সার্টিফিকেট বাড়তি ঝামেলার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে চাইলে টিন সার্টিফিকেট বাতিলের আবেদন করা যায়।
কেন টিন সার্টিফিকেট বাতিলের প্রয়োজন হয়?
অনেকেই প্রয়োজনের তাগিদে টিন সার্টিফিকেট করলেও পরে আর সেটি ব্যবহার করেন না। কারও ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে, কারও ফেসবুক থেকে আয় বন্ধ হয়েছে, আবার কেউ করযোগ্য আয় না থাকায় টিন সার্টিফিকেট রাখতে চান না।
কিন্তু টিআইএন নিবন্ধন থাকলে আইন অনুযায়ী নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। রিটার্ন দাখিল না করলে জরিমানা বা অন্যান্য জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই অপ্রয়োজনীয় টিন সার্টিফিকেট বাতিলের বিষয়ে আগ্রহ বাড়ছে।
কোন পরিস্থিতিতে টিন সার্টিফিকেট বাতিল করা যায়?
নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে টিন সার্টিফিকেট বাতিলের আবেদন করা যেতে পারে। যেমন-
১. ব্যবসা বা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে: কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলে টিআইএন বাতিলের আবেদন করা যেতে পারে।
২. একাধিক টিআইএন তৈরি হলে: ভুলবশত একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে একাধিক টিআইএন তৈরি হলে প্রয়োজনীয় একটি রেখে অন্যটি বাতিলের আবেদন করা যায়।
৩. টিআইএন ব্যবহারের প্রয়োজন না থাকলে: যে উদ্দেশ্যে টিন সার্টিফিকেট করা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেই প্রয়োজন না থাকলে নির্দিষ্ট শর্তে বাতিলের আবেদন করা সম্ভব।
৪. করযোগ্য আয় না থাকলে: আয় কমে গিয়ে করযোগ্য সীমার নিচে নেমে এলে এবং টিআইএন রাখার আর কোনো আইনগত প্রয়োজন না থাকলে বাতিলের আবেদন করা যেতে পারে।
৫. বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করলে: কোনো বাংলাদেশি নাগরিক দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করলে এবং বাংলাদেশে করযোগ্য আয় বা টিআইএন রাখার অন্য কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকলে আবেদন করতে পারেন।
৬. করদাতার মৃত্যু হলে: কোনো করদাতার মৃত্যু হলে উত্তরাধিকারীরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ টিআইএন বাতিলের আবেদন করতে পারেন।
তবে এসব ক্ষেত্রে আবেদন করলেই টিআইএন বাতিল হবে, এমন নয়। সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য আইন যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেবে।
টিন সার্টিফিকেট বাতিল করতে কোথায় যাবেন?
টিন সার্টিফিকেট বাতিল করতে হলে আপনার ই-টিআইএন নিবন্ধনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর অঞ্চল বা ট্যাক্সেস সার্কেল অফিসে যোগাযোগ করতে হবে।
আপনার ই-টিন সার্টিফিকেটে উল্লেখ করা ট্যাক্সেস সার্কেল ও কর অঞ্চলের তথ্য দেখে সংশ্লিষ্ট অফিসের ঠিকানা জানতে পারবেন। এরপর সংশ্লিষ্ট উপ-কর কমিশনার বরাবর লিখিত আবেদন জমা দিতে হবে।
অনলাইনে টিন বাতিলের সুযোগ ও প্রক্রিয়া সীমিত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি কর অফিসে গিয়ে আবেদন করাই প্রয়োজন হতে পারে।
যেভাবে বাতিল করবেন টিন সার্টিফিকেট
টিন সার্টিফিকেট বাতিলের জন্য কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে।
প্রথম ধাপ: প্রথমে আপনার আয়কর রিটার্নের অবস্থা যাচাই করুন। আগের কোনো বছরের রিটার্ন বকেয়া থাকলে তা নিষ্পত্তির প্রয়োজন হতে পারে। শূন্য আয় দেখিয়ে রিটার্ন দাখিলের বিষয়টি আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর অফিস থেকে জেনে নিন।
দ্বিতীয় ধাপ: আপনার এলাকার সংশ্লিষ্ট উপ-কর কমিশনার বরাবর টিআইএন বাতিলের জন্য লিখিত আবেদন করতে হবে।
তৃতীয় ধাপ: আবেদনে টিন সার্টিফিকেট কবে এবং কী উদ্দেশ্যে করেছিলেন, বর্তমানে কেন সেটি আর প্রয়োজন নেই এবং বাতিলের যৌক্তিক কারণ উল্লেখ করতে হবে।
চতুর্থ ধাপ: আবেদনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করে সংশ্লিষ্ট কর অফিসে জমা দিতে হবে।
যেসব কাগজপত্র লাগতে পারে
টিন সার্টিফিকেট বাতিলের আবেদনের সঙ্গে সাধারণত নিচের কাগজপত্রগুলো প্রয়োজন হতে পারে-
* ই-টিআইএন সার্টিফিকেটের ফটোকপি।
*জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ফটোকপি।
*আগের আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র বা প্রাপ্তি স্বীকারপত্র।
*ব্যবসা বন্ধ হয়ে থাকলে তার স্বপক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।
*করদাতার মৃত্যু হলে মৃত্যুসনদ ও উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র।
*বাতিলের কারণ সমর্থনে অন্যান্য প্রাসঙ্গিক দলিল।
আবেদন করার পর কী হবে?
আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষ আপনার দেওয়া তথ্য ও কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করবে। প্রয়োজন মনে করলে অতিরিক্ত তথ্য বা কাগজপত্রও চাইতে পারে।
সবকিছু যাচাই করে কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হলে টিআইএন বাতিলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। আবেদন জমা দিলেই টিন বাতিল হয়ে যায় না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে।
টিআইএন বাতিল হয়ে গেলে সেটি দিয়ে পরবর্তী সময়ে আর আয়কর-সংক্রান্ত কোনো কাজে সুবিধা নেওয়া যাবে না। ভবিষ্যতে আবার টিআইএন প্রয়োজন হলে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী নতুন করে নিবন্ধনের প্রয়োজন হতে পারে।
তাই শুধু আয় কমে যাওয়া বা বর্তমানে আয় না থাকার কারণে তাড়াহুড়ো করে টিন বাতিলের আবেদন না করে আগে সংশ্লিষ্ট কর অফিস থেকে নিজের পরিস্থিতি অনুযায়ী পরামর্শ নেওয়া ভালো।
টিআইএন বাতিলের নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অন্যান্য কর-সংক্রান্ত তথ্য জানতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওয়েবসাইটে ভিজিট করতে পারেন।
আরটিভি/এসকে


